মীর আব্দুল আলীম
অতিত নিকটে ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। এটি বর্তমান সরকারের কুটনৈতিক সফলতার ফসল। ভারত বাংলাদেশের ভালবাসার নিদর্শনও বটে! এ কথা অত্যুক্তি নয় যে, সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নের মধ্যে দু’দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলো। দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও নিবিড় করতে ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের সফরে আগামী ঢাকায় আসছেন। এটি তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। তার এ সফর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই প্রত্যাশিত। মোদির এ সফরকে আমরা স্বাগত জানাই। তাঁর এ সফরে তিস্তা চুক্তিসহ দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আমরা আশা করছি।
আমরা লক্ষ করছি যে, দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্ককে আরও জোরালো অর্থনৈতিক ভিত্তি দেওয়ার ওপর জোর দিতে চায় দুই দেশ। এরই অংশ হিসেবে নতুন একটি ঋণচুক্তি সইয়ের কথা রয়েছে। ঋণচুক্তির আওতায় যোগাযোগ অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়ন খাতের প্রকল্প গ্রহণের ওপর জোর দেবে বাংলাদেশ। ঋণচুক্তির পরিমাণ কত হবে, সেটি চুড়ান্ত না হলেও তা দেড়শ’ কোটি টাকার মতো হতে পারে। বর্তমানে এশিয়ায় অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান ও বিকাশ ঘটেছে। এই অবস্থায় আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও আন্তরিক। আমরা আশা করছি, দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব বাড়বে। দুই দেশের জনগণের শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করতে হবে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে উভয়েরই লাভবান হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ সফরে তিস্তা চুক্তি সই না হলেও শিগগিরই চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়ে যাবেন মোদি। আমরা আশা করব, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনের বিষয়ে ভারত দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেবে।
নরেন্দ্র মোদি আসবেন, প্রায়াত দুই নেতা ইন্দিরা-মুজিব তিস্তা পানিবন্টন চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন এটাই বাঙ্গালী জাতীয় এখন কায়মনে চায়। পানির অভিাবে কৃষকের ক্রন্দনে বাংলাদেশের বহু এলাকার বাতাস ভারী হয়ে আছে। বেকার সমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অসহায় মানুষ পানির পিপাশায় কাতর, জীব-জানোয়ার, পশু-পাখি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মৎস্য বিলীন হবার পথে। কৃষিখাত যুদ্ধ মোকাবেলায় রত। ছিন্নমূল হতভাগাদের সংখ্যা গণনার বাইরে চলে যাচ্ছে। রোগবালাই ওদের ঘিরে ধরেছে। খালি পা, উলঙ্গ শরীর, উচকু ফুচকু চুল, মলিন চেহারা, খালি পেটে শিশু-কিশোরদের চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা দু’তীরের চরাঞ্চলের বালুতে বসবাসরত অসহায় সন্তানদের পিতা-মাতা দিশেহারা। এত কিছুর পরও নতুন বাতাসে বাংলাদেশের জনগণ আশাবাদী ভারতবর্ষের সরকারপ্রধান নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে আসবেন। ভালোবাসা বিনিময় করবেন। যুক্তিতর্ক পরিহার করে মানবতাকে মেনে নিয়ে হিমালয় থেকে নেমে আসা বড় বড় নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদানে দ্বিধা করবেন না। ইন্দিরা-মুজিব তিস্তা পানিবন্টন চুক্তির প্রতি মোদি সম্মান প্রদর্শন করে জাবেন এটাই আমরা আশা করছি।
আমরা দেখেছি, ভারতের রাজ্য ও লোকসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি বিল পাস হয়েছে।এটি মোদির সদইচ্ছারই ফসল। এতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় সংক্রান্ত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পথ অবারিত হলো। দেশজুড়ে এ কারণে আনন্দের জোয়ার বইছে। ছিটমহলবাসী চুক্তি বাস্তবায়নে অধীর আগ্রহভরে অপেক্ষা করছে। আমরা চাই সংবিধান সংশোধন-পরবর্তী ছিটমহল বিনিময় প্রক্রিয়া যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। ছিটমহলবাসী যেন মানবিক জীবনের নিশ্চয়তা পায়। ছিটমহল বিনিময় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দূর হবে ছিটমহলবাসীর দীর্ঘদিনের সংকট ও বঞ্চনা। বঞ্চিতজনরা ফিরে পাবে তাদের নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পর বাংলাদেশ দ্রুতই সংবিধান সংশোধন করে এবং বেরুবাড়ী হস্তান্তর করে। কিন্তু ভারতের তরফে একের পর এক বাধা আসতে থাকে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় ছিটমহল হস্তান্তর প্রক্রিয়া। ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি বিল পাস করেছে এবং এখন আমরা আশা করব দ্রুতই তা বাস্তবায়ন হবে। এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ মোটেও সমীচীন হবে না। নয়াদিলি¬র কাছে সবার প্রত্যাশা, তারা এমন কিছু করবে না যাতে চুক্তি বাস্তবায়নে আর কোনো রকম বিলম্ব ঘটে। ছিটমহলবাসী দীর্ঘদিন ধরে বড় কষ্টে ছিলো। ওদের কোনো দেশ ও ঠিকানা ছিলোনা। ওরা নিজ দেশেই পরবাসী। অবস্থানগত পরিচয়ে ছিটমহলবাসী বাংলাদেশের মানুষ। অথচ দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় তাদের থাকতে হয়েছে ভারতের ভেতর। একই দশা ছিল ভারতের মানুষগুলোরও। তারা এতকাল ধরে থাকছেন বাংলাদেশের ভেতর। বাস্তবে এরা দেশহীন, নাগরিকত্বহীন। এদের পরিচয় ‘ছিটের মানুষ’। আবদ্ধ জীবনযাপনের কষ্ট, যাতায়াত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কষ্ট, নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার কষ্ট, সব মিলে হাহাকারের এক জীবন তাদের। সীমান্ত বিল সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়ায় শেষ হতে চলেছে তাদের দীর্ঘশ্বাসে ভরা জীবনের মর্মন্তুদ অধ্যায়। আনন্দ এখন সঙ্গতই উথলে পড়ছে। ওরা এখন গর্বের সঙ্গে, বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে ওদেরও দেশের নাম। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিবাদ মেটাতে ইন্দিরা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সেই চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ জমি আদান-প্রদান করে সমস্যা মেটানোর কথা উলে¬খ আছে। বাংলাদেশ সেই চুক্তির দায় প্রায় তাৎক্ষণিক মিটিয়ে দিলেও গত ৪১ বছরেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। চলতি বছরের ৭ মে ভারত সরকারের সুদৃষ্টি পড়েছে ছিটমহলবাসীর প্রতি। এ জন্য ভারত সরকারকে আমাদের অভিনন্দন।
আমরা মনে করি, সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন দু’দেশের সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। একাত্তরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যে উচ্চতায় উঠেছিল, এই বিল পাস হওয়ার পর সম্পর্ক আবার সেই উচ্চতায় পৌঁছল। সীমান্তে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে এ চুক্তি এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। দু’দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরো বেশি মানবিক ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে দু’দেশ আরো এগিয়ে যেতে পারবে। ইতিপূর্বে সমুদ্রসীমানা নিয়ে বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে। পানিবণ্টনের বিষয়েও একই ধরনের ফায়সালা হলে দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় ভিত্তি পাবে। এ জন্য দরকার দু’দেশের সরকারের নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও তৎপরতা।  আমরা আগত মোদির কাছে তিসতার পানি চুক্তিসহ সকল অমিমাংসিত সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করছি। আমরা জানি যে, নরেন্দ্র মোদি সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়ন ও তিস্তাচুক্তি সইয়ের মতো অমীমাংসিত সমস্যার সুরাহা না করে তিনি ঢাকায় আসতে চাইছিলেন না। এ মাসের শুরুতে সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়ায় তার ঢাকা সফর নিশ্চিত হয়। তিস্তাচুক্তিও হবে এ আশাবাদ আমরা করছি। নরেন্দ্র মোদির সফরে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি, দ্বিপীয় বাণিজ্যচুক্তি নবায়ন, অভ্যন্তরীণ নৌ প্রটোকল নবায়ন, সামুদ্রিক অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিা, সংস্কৃতি, দুই দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার প্রস্তুতিও চলছে বলে আমরা পত্রিকায় জানতে পেরেছি।  এ দুক্তিগুলোও দুদেশের সম্পর্কে মদুরতা তৈরি করবে বলে ধরানা করা যায়।

লেখক-মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক ।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য