Dinajpur pic 04শাহারিয়ার হিরু, দিনাজপুরঃ দিনাজপুর শহর, শহরতলী এবং আশেপাশের গ্রামাঞ্চল নিয়ে গঠিত দিনাজপুর সদর উপজেলার ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান নিতান্ত কম নয়। এর কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী নিম্নে দেয়া হলো।
রাজবাড়ীঃ- দিনাজপুর শহর হতে  কিলোমিটার উত্তরপূর্বে হিন্দু, মুসলিম এবং ইংরেজ এই তিন যুগের স্থাপত্যের বৈশিষ্ঠ্য ধারণ করে দিনাজপুর রাজবংশের ঐতিহ্যের নিদর্শন ঐতিহাসিক রাজবাড়ী অবস্থিত। দিনাজপুরের রাজবাড়ী কোন একক রাজার কীর্তি নয়। দিনাজপুরের রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হতে শুরু করে মহারাজা জগদীশনাথ পর্যন্ত প্রায় ৪’শ বছর ধরে ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠেছিল এই রাজবাড়ী। পরিখা এবং প্রকার বেষ্টিত মূল রাজবাড়ীর আয়তন ছিল মাত্র ১৬ একর। বহু সংখ্যক প্রকোষ্ঠ, প্রাসাদ, মহল দেউড়ী, চত্বর এবং অলিগলি সম্বলিত রাজবাড়ি তিনটি ভাগে বিভক্ত আয়না মহল, রানী মহল এবং ঠকুরবাড়ী মহল। তা’ছাড়া ফুলবাগ, হীরাবাগ, সব্জীবাগ, পীলখানা, দাতব্য চিকিৎসালয়, অতিথি ভবন, কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা এবং কয়েকটি বিশাল দীঘি মিলে বৃহত্তর রাজবাড়ীর আয়তন প্রায় ১৬৬ একর বা ৬৭ হেক্টর। ২২ী২২ মিটার চারকোনা চত্বরের চারদিক ঘেরা দোতলা আয়না মহল অবস্থিত। মার্বেল ও স্ফটিকমন্ডিত দরবার গৃহ, জলসা ঘর, তোষখানা, পাঠাগার প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো এই মহলে অবস্থিত। আয়না মহলের উত্তরদিকে রানীর দেউড়ী পেরিয়ে রানীমহল। ত্রিশের দশকে এই মহলটি ভেঙ্গে দোতলা ভবন নির্মান করা হয়েছে। সেটি বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত শিশু পরিবারের আবাসস্থল মহল। এ মহলে অবস্থিত মন্দিরের নাম কালিয়াকান্তের মন্দির। যা হিন্দু দর্শনার্থীদের চমৎকৃত করে। মন্দিরে স্থাপতি শিলালিপি হতে জানা যায়, এই সুদর্শন মন্দিরটি নির্মাণ করান রাজা বৈদ্যনাথ। প্রাসাদের অভ্যন্তরে ছিল রাজা সেজেস্তা, পূজা মন্ডপ, দীঘি, ফুল বাগান, চিড়িয়াখানা, টেনিস কোর্ড ও কুমার মহল। পশ্চিম গেটের সামনে দুটি বৃহৎ কামান সংস্থাপতি ছিল।
১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর রাজাবংশের অবস্থান হয়। ফলে পরিত্যাক্ত হয় রাজবাড়ী। এখন শুধু কালের সাক্ষী হিসেবে বিশাল মৌনতায় দাড়িয়ে আছে রাজবাড়ী।
রামসাগরঃ- অপার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার রামসাগর দিনাজপুর তথা উত্তরবঙ্গের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। ক্লান্তিকর যান্ত্রিক জীবনের একঘেঁয়েমী কাটাতে পর্যটকেরা ছুটে আসেন রামসাগরে। প্রাকৃতিক সীমাহীন সৌন্দর্য সমুদ্রে অবগাহন করে জ্বালা জুড়ান ক্লান্তির।
দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিনে লাল গৈরিক ও স্ফীতিময় খিয়ার মাটির উপর সগর্বে দাড়িয়ে আছে রামসাগর। চারদিকে সু-উচ্চ মাটির গড়, মাঝেখানে দৃষ্টিনন্দন দীঘির সুনীল জলরাশির জন্য এই দীঘির নামে সাগর শব্দটি জুড়ে দিয়ে নামকরন করা হয়েছে রামসাগর। পাড়ভূমিসহ এ দীঘির মোট আয়তন ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪১২ বর্গমিটার। এর জলভাগ ১ হাজার ৩১ মিটার দীর্ঘ এবং ৩৬৪ মিটার প্রশস্ত। দীঘির মাঝখানের গভীরতা ৯ মিটার। সর্বোচ্চ পাড়ের উচ্চতা ১৩ দশমিক ৫৩ মিটার। দিনাজপুরের রাজা রামনাথ রায় প্রজাদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এ দীঘি খনন করান। সে সময়ের ৩৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৫ লাখ শ্রমের বিনিময়ে এই দিঘির প্রতিষ্ঠা কাজ খনন শুরুর পর ৫ বছরের মাথায় ১৭৫৫ সালে সম্পন্ন হয়। রাজা রামনাথের নাম অনুষারে এ দীঘির নামকরন করা হয় রামসাগর।
রামসাগরের চারপাশে রয়েছে অর্নিবাচনীয় প্রকৃতির অকৃপন সৌন্দর্য। প্রকৃতির এই লীলা বৈচিত্রের মাঝে মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে পিকনিক কর্ণার। দীঘির পশ্চিমে অবস্থিত ডাক বাংলোর পাশে গড়ে তোলা হয়েছে শিশু পার্ক, ক্ষুদ্রাকৃতির কৃত্রিম চিড়িয়াখানা। তার পাশেই মাথা তুলে দাড়িয়ে আছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।
রামসাগরের সবচেয়ে বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, আড়াইশ বছরের নির্যাতন সয়েও অবিচল স্থানে আছে এই দীঘি। এ কি কোন অলৌকিক কারনে? না, এর খনন পদ্ধতিই একে দীর্ঘ স্থায়ীত্ব এনে দিয়েছে। আসলে রামসাগর কোন একক দীঘি নয়, ১২টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুকুরের সমষ্টিমাত্র। কোন ভাবে যদি পাড়ভূমিধ্বসে পড়ে তাহলে কাছের পুকুরটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তা আংশিকভাবে। কেননা, দীঘির চারপাশে রয়েছে সু উচ্চ গড়। এসব গড় অতিক্রম করে বৃষ্টি বিধৌত কাদা বা ধুলো দীঘির পানিতে নিপতিত হতে পারে না। মায়া সভ্যতার আমলে দক্ষিন আমেরিকার বড় বড় দীঘি এ পদ্ধতিতে খনন করা হতো।
চেহেলগাজী মাযারঃ- দিনাজপুর শহর হতে ৫ কিলোমিটার উত্তরে দুহসহ গ্রামে এই মাজারটি অবস্থিত। এই মাজারের পাশে যে মসজিদটি রয়েছে সেটি ১৪৬০ সালে নির্মাণ করেন সুলতান রুকুনউদ্দীন বরবক শাহ্। মসজিদটিতে যে শিলালিপি উৎকীর্ণ ছিল (বর্তমানে দিনাজপুর যাদুঘরে সংরক্ষিত) তাতে একটি পুরাতন মাযার সংষ্কারের কথা আছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই মসজিদটি নির্মাণের প্রায় শত বর্ষ আগে চেহেলগাজী মাযারটি নির্মিত হয়।
৬.৫ মিটার লম্বা চেহেলগাজী মাযার কোন একক পীরের বলে জনশ্র“তি থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দের কিছু পরে ৪০ জন সুফী দরবেশের আগমন ঘটে। স্থানীয় রাজা গোপাল চন্দ্রের সাথে তাদের যুদ্ধ হয়। পর পর দুটি যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তারা গাজী খেতাবে তৃতীয় খেতাবে যুদ্ধে তাদের পরাজয় ঘটে এবং তারা শাহাদত বরণ করেন। বর্তমানে যেখানে মাযার শরীফ রয়েছে সেখানেই তাদেরকে গণ কবরে শায়িত করা হয়। চল্লিশ জন গাজীর মাযার বলেই অভিহিত করা হয়েছে চেহেলগাজী মাযার।
এই চেহেলগাজী মাযারের চত্বরে রয়েছে বিশাল আকৃতির শহীদ মিনার। মূল ফটকের পাশে রয়েছে ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারী মহারাজা হাইস্কুলে মাইন বিষ্ফোরনে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের গণ কবর। এসব সংযুক্তি চেহেলগাজী মাযারে এনে দিয়েছে বহুমাত্রিক গুরুত্ব।
দিনাজপুর সদরের অন্যান্য দর্শণীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে আনন্দ সাগর, মাতা সাগর, জুলুম সাগর, সুখ সাগর প্রভৃতি।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য