বাঙালি জাতিসত্ত্বার মহাসম্মিলন বাংলা নববর্ষ। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এককাতারে এসে সামিল হয়, আনন্দ ভাগাভাগি করে। বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারন করে, পালন করে। বাঙালির মাঝে বাঙালি হারিয়ে যায়, আড্ডায় মশগুল আর বাড়িতে বাড়িতে বৈশাখের গন্ধের আমেজ বাতাসে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকে।

এবারের ১৪২২ বাংলা বর্ষবরণ ছিল একটু অন্য রকম। ৯২ দিনের রাজনৈতিক হিংসা প্রতিহিংসার অসহ্য যন্ত্রণা থেকে বাঙালি জাতি একটু প্রশান্তির স্পর্শ অনুভব করেছে, প্রাণখুলে আনন্দ-উৎসব উদযাপন করার সুযোগ পেয়েছে। সকল ভয়-উৎকন্ঠা কাটিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে এখান থেকে সেখানে, সাথে নিয়েছে আদরের ছোট্ট সোনামণিকেও।

কিন্তু সেটাকেও মলিন করে দিয়েছে ক’একটি কুচক্রি ব্যক্তি ও মহল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে নারীর শ্লীনতাহানী, অশুভ আচরণ যা বর্বর পশুকেও হার মানিয়েছে। আবার অন্যদিকে জগন্নাথ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গাতেও নারী শ্লীলতাহনী ঘটিয়েছে কতিপয় মানুষ নামের বর্বর পশু।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর টিএসসিতে নারীদের অর্ধনগ্ন করার সময় আশে পাশের মানুষ সহ সবার চিৎকার যাতে না শুনা যায় সেখানে পরিকল্পিত ভাবে ক’একজন মিলে বিকট শব্দে ভুভুজেলা বাজিয়েছে বলে মিডিয়াতে প্রকাশ পায়।

কি এই ভুভুজেলা? কার সংস্কৃতি আর বাঙালি জাতি কিভাবে তা আয়ত্ব করেছে তা হয়’ত অনেকের কাছেই পরিস্কার নয়।

ভুভুজেলা! নামেও কেমন জানি অদ্ভুত অদ্ভুত মনে হয়। তবে এই অদ্ভুত যন্ত্রটি ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপে প্রথম দেখা যায়। নানান রঙে তৈরি করা বিরাটাকার এই বাঁশিটি সকল দর্শকদের আনন্দের খোড়াক হিসেবে তখন ব্যবহার শুরু হয়েছিল। বিকট আওয়াজ। গ্যালারীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আওয়াজ প্রতিধ্বনি হত আর এতেই দর্শক তাদের আনন্দের পূর্ণতা খুজে পেত।

বাঙালি জাতি বিশ্বের অন্যতম একটি অদ্ভুত জাতি বলে আমি মনেকরি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাউকে চাঁদে পাঠাতে পারে আবার সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা বানিয়ে ফেলাও মামুলি ব্যাপার।

আর হয়’ত এই কারনেই জনশ্রুতি আছে, সকল সম্ভাবনাময় বাঙালি জাতির আমিও একজন।

বাংলাদেশে ২০১১ সালে ব্যাপক আকারে এই ভুভুজেলা নামক অদ্ভুত যন্ত্রটির ব্যবহার দেখা যায়।

স্বাগতিক বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজিত ক্রিকেট বিশ্বকাপে এই ভুভুজেলা যন্ত্রটি সবার কাছে এক ধরনের প্রিয় হয়ে উঠে। ক্রিকেট ভক্তদের হাত বদল করে আস্তে আস্তে দখল করে নেয় ছোট-বড় সকল উৎসব। এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংস্কৃতির উৎসব বাংলা বর্ষবরণেও এই অদ্ভুত যন্ত্র ভুভুজেলা নিজের জায়গাটি দখল করে নিতে বেশী সময় ব্যয় করতে হয়নি, বাঙালিদের আয়ত্ব করাতে বেশী যাদুমন্ত্র পড়াতেও হয়নি।

বাংলা বর্ষবরণ কিংবা ১লা বৈশাখ বাঙালিদের নিজেস্ব উৎসব। বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য লালণ-পালন ও ধারণ করা পরস্পরের প্রতি পরস্পরের সৌহার্ধ-সম্প্রীতি সেতুবন্ধন তৈরি করা এক মহোৎসব। রাজনৈতিক হানাহানি, অর্থনৈতিক মুনাফা, নাগরিক জীবনের ব্যস্থতা আর যান্ত্রিকতার অস্থিরতা খানিকা ভুলে গিয়ে আমরা চেষ্ঠা করি একটু প্রশান্তি জীবন উপভোগ করতে। ছুটে চলি শেকড় থেকে শেকড়ের টানে। উপভোগ করি- আমি বাঙালি, স্পর্শ করি বাঙালির ঐতিহ্য, গর্ব করে ধারণ করি আমার ইতিহাস আর পরম্পনা।

পান্থা-ইলিশ, মুড়ি-মুড়কি, বাঁশের বাঁশি, একতারা-দোতারা, ডুগডুগি, নাগরদোলা, মাটির গান, লোকজ গান, মাটি-বাঁশ-বেত দিয়ে বাঙালির হাতে তৈরি শখের জিনিস পত্র এবং শাড়ি-পাঞ্জাবি’র বাহারি সাঁজে এখানে-সেখানে এ বাড়িতে-সেবাড়িতে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন আনন্দ ভাগাভাগি বাঙালি জাতির বর্ষবরণের অংশ বিশেষ।

কিন্তু মাটি ও মানুষের সেতু বন্ধনের মাঝখানে অসহ্য, যন্ত্রণাদায়ক এই ভুভুজেলার জায়গা দখল করা সত্যিই আরেকটি যন্ত্রনা ও বিরক্তিকর।

বাঙালির অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত এই উৎসবে ভুভুজেলা নামক যন্ত্রটি কতিপয় মানুষের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আবার অন্য দিকে গ্রাস করে ফেলছে আমাদের প্রাণের উৎসবের আমেজ।

বর্ষবরণ সহ সকল আনন্দ আয়োজনকে যেমন করছে যন্ত্রনাদায়ক, অসহ্য-বিরক্তিকর তেমনি ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনাও।

বিকট শব্দে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি করা এই ভুভুজেলার যন্ত্রণায় মানুষ অনেক সময় দিশেহারা হয়ে উঠে। কানে হাত দিয়ে ভুভুজেলার যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে গিয়ে অনেক সময় রিক্সার সাথে গিয়ে ধাক্কা খেতে হয়েছে অনেক মানুষকে। আবার অন্য দিকে চিন্তা করলে, বড় ধরনের দূর্ঘটনারও শিকার হবার সম্ভবনা কম নয়।

স্বাভাবিক চলাফেরা, কথাবার্তা, আড্ডার চেয়ে ভুভুজেলার যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিরাপদ স্থান খুজে পাওয়াটাই যেন মশকিল হয়ে পড়ে।

অন্যদের মতন আমিও মনেকরি, আনন্দ উৎসবে একটু-আকটু হৈ-হুল্লোড় হবেই, উচ্চমাত্রায় শব্দাচ্চারণ হবেই। আর এই হৈ-হুল্লোড় না হলেও উৎসব-উৎসব আমেজ ভাব আসে না। মনে হয় না এখানে কোনো আয়োজন হয়েছে, আনন্দ-উৎসব হচ্ছে!

তার মানে এই নয় যে বিকট আওয়াজ তুলতে হবে। অপরের ক্ষতিসাধণ করতে হবে। বিকট শব্দ তুলে নারীর শ্লীলতাহানী ঘটাতে হবে, নারীকে অর্ধনগ্ন করতে হবে!

যে কোনো আনন্দ উৎসবে শব্দ ঐ উৎসবকে মুখড়িত করে তুলে, আনন্দ-উৎসবের খবর জানান দেয়।

সবাইকে মাতিয়ে রাখার জন্য শব্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে তা হওয়া দরকার বাঁশের বাঁশি, ডোল-তবলা, ডুগডুগি, গান কিংবা লোকজ সংগীত শব্দের মাধ্যমে। আর আমাদের একান্ত ইতিহাস-ঐতিহ্যের এইসব শখের যন্ত্রাদি ব্যবহার করে বর্ষবরণ কিংবা অন্য সব উৎসব পালন নষ্ট হবার কথা নয়।

বিদেশী সংস্কৃতির এই ভুভুজেলা যখন ছিলো না তখনও আনন্দ-উৎসব ছিলো, বাঙালি জাতি তার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে লালন-পালন ও ধারণ করতে পেরেছে।

অন্যদিকে এই ভুভুজেলার শব্দ পরিবেশকে যেমন নষ্ট করে অন্যদিকে অনেকগুলো ভুভুজেলা একসাথে বেজে উঠলে মানুষের শ্রবন শক্তিতে গিয়ে আঘাত করে যা ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণও।

আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিতেও এই ভুভুজেলা বিকট শব্দ মারাত্মক ক্ষতির কারন প্রতিয়মান।

ভুভুজেলার উচ্চতর শব্দের কারনে মানবজীবনে হৃদযন্ত্রের সমস্যা, স্নায়ূ দূর্বলতা সহ নানাধিক জটিল সমস্যার আবির্ভাব ঘটতে পারে বলেও আশাঙ্কা করা যায়।

আমি মনেকরি, এই বিরক্তিকর ভুভুজেলা নামক অসহ্য যন্ত্রণাকর যন্ত্রটি প্রশাসন বন্ধ বা বাতিল করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং সেই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর টিএসসি, জগন্নাথ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর উপর বর্বর কর্মকান্ড সংঘটিত করা পশুদের খুজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থার মাধ্যমে আগামীর আয়োজিত আনন্দ-উৎসবকে আরও আনন্দময় নিরাপদ করারও দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

কবীর চৌধুরী তন্ময়
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম-বোয়াফ

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য