প্রতি বছরই বাড়ছে এডিপির আকার, কিন্তু বাড়ছে না অর্থ ব্যয়ের দক্ষতা ও প্রকল্পের মান। অনেক সময় ঋণ নিয়ে এডিপি বাস্তবায়ন করা হয়। এ অর্থ সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হয়। ফলে এর সর্বোচ্চ ব্যবহারে নজর দেওয়া আবশ্যক। চলতি অর্থবছরের অবশিষ্ট তিন মাসে ৫৭ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে বাস্তবায়ন হার হতে হবে ১৯ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অসম্ভব নয় এটি। আগেও অর্থবছরের শেষ তিন মাসে ৫০ শতাংশের বেশি কাজ করার রেকর্ড রয়েছে। তবে তাতে কাজের মান যে সন্তোষজনক হয় না, তা কারো অজানা নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ত্রুটি-বিচ্যুতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অদক্ষতা ও অবহেলা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সময়মতো অর্থ ছাড় না করা, সর্বোপরি দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে প্রকল্পগুলো অর্ধসমাপ্ত অথবা অসমাপ্ত থেকে যায়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার এক বড় কারণ দলীয় বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ। মূলত স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন হওয়ায় এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় বেশি। ফলে এডিপির আকার বড় হয়; কিন্তু সময়মতো বাস্তবায়ন হয় না। এডিপির সিংহভাগ বরাদ্দ দেওয়া হয় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের এলাকার উন্নয়নে। সে ক্ষেত্রে অন্য এলাকাগুলো বঞ্ছিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। স্বভাবতই এতে দেশে সৃষ্টি হয় উন্নয়নবৈষম্য।
এ সময় যেনতেনভাবে অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হয়, মানসম্পন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথম দফায় অর্থাৎ ২০০৮ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছিল সরকার। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনেও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিই হয়নি। পরিকল্পনা কমিশন থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে নির্দেশনা। এতেও তেমন সুফল মেলেনি। অনেকে দুর্নীতি, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও সংশ্লিষ্টদের দক্ষতার অভাবকে দায়ী করছেন এর জন্য। এ অবস্থায় যেভাবে এডিপি বাস্তবায়ন হচ্ছে, তাতে দ্রুত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করা যায় না।
প্রায় প্রতি বছরই এডিপি কাটছাঁট করা হয়। মূলত বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর অদক্ষতার কারণে এটি করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। দক্ষ জনবল তৈরি ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়াও জরুরি। বাস্তবায়ন কম হওয়ার ফলে বৈদেশিক সাহায্যের ছাড়ও কমে যায়। এ বাস্তবতায় এডিপির অর্থায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নেয়া প্রকল্পগুলোয় মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। দরকার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগ দেয়া। সন্দেহ নেই, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এডিপির যথাযথ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। অর্থনৈতিক অগ্রগতি অনেকাংশে এডিপি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি খাতকে সহযোগিতা করতে এটি সরকারের বিনিয়োগ। তা ছাড়া আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা চরম। রাজনীতিক অস্থিরতা আর দুর্বল অবকাঠামোর জন্য আমরা কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছি। কাজেই সরকার এডিপি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে তা দূর করার উদ্যোগ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য