–মোশাররফ হোসেন মুসা
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে কোনো অপরাধমূলক ঘটনায় হুকুমদাতা ও হুকুমপালনকারীদের সমান অপরাধী হিসেবে শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের নামে পেট্টোল বোমা হামলা ঠেকাতে হলে বোমাহামলাকারী ও তাদের হুকুমদাতাদের একইসঙ্গে বিচারে কাঠগড়ায় নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সরকার হুকুমদাতাদের আইনের আওতায় আনার জন্য কঠোর মনোভাব দেখালেও হুকুমপালনকারীদের বেলায় শিথিলতা প্রদর্শন করছে। সরকারের এই দ্বিমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভয়াবহ বোমা হামলার আশংকা রয়েছে।
যাত্রাবাড়ি ও কুমিল্লার যাত্রীবাহী বাসে পেট্টোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামী করা হয়েছে। এর আগে রাজশাহীতে বাস ও ট্রাকে বোমা হামলার ঘটনায় সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুকে হুকুমের আসামী করা হয়েছে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বোমা হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দকে হুকুমের আসামী করা হয়েছে। এসব মামলার বিষয়ে বিএনপি নেতৃবৃন্দের বক্তব্য হলো- ‘বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। তারা কোনোক্রমেই এসব বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত নন। আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা নিজেরাই বোমা মেরে তাদের উপর দোষ চাপাচ্ছে।’ উল্লেখ্য, অবরোধের ৩১ দিনে ( ৫ জানুয়ারী থেকে ৫,ফেব্রুয়ারী’১৫ ) ৫১৯ গাড়িতে অগ্নিসংেেযাগ ও ৮১৭ টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। এসব নাশকতায় ৬২ জনের প্রাণহানী ঘটেছে এবং শতাধিক ব্যক্তি শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে বিকৃত চেহারা নিয়ে বাকী জীবন বেঁচে থাকবেন। বিএনপি- জামায়াত  যতই বলুক তারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন- এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।  কারণ অবরোধের আগে এরকম পেট্টোল বোমা হামলার ঘটনা ঘটেনি। অনুরূপ নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘোষণার পর। লক্ষ্য করার বিষয়, এ জাতীয় সহিংস ঘটনা ঘটার পর বিএনপি- জামায়াতের পক্ষ থেকে কখনও বলা হয়নি- ‘ যারা এসব নাশকতার কাজে জড়িত তারা দুর্বৃত্ত। তারা তাদের দলের কেউ নন।’ তাছাড়া দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারের দাবীতে তারা এখন পর্যন্ত কোনো মানববন্ধন, জনসভা, সেমিনার ইত্যাদি করেনি। তাদের পক্ষের বুদ্ধিজীবীরা প্রায়শই বলেন- ‘বিএনপি জামায়াতকে শান্তিপূর্ণ ভাবে সভা-সেমিনার করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে তারা সহিংস আচরণ করছে।’ তাঁরা ভুলে যান যে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সহিংস কর্মকা-ের পরিসর খুবই কম। তবে সরকার ও সরকারি দল হুকুমপালনকারীদের শাস্তি দিতে আন্তরিক কি না প্রশ্ন করা যেতে পারে। পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে- গ্রেফতারকৃত বোমাবাজদের জামিনের জন্য আওয়ামীলীগের নেতারা আসামীদের পক্ষে সৎ ও মেধাবী হিসেবে প্রত্যয়ন দিচ্ছেন। যেমন- মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ছাত্র মোঃ রেজাউল ইসলামকে পেট্রোল বোমাসহ হাতে- নাতে গ্রেফতার করেছিল । এ আসামীর পক্ষে পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ মোশাররফ হোসেন প্রত্যয়ন দেন- ‘আসামী রেজাউল ইসলাম আওয়ামীলীগের সদস্য। সে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত নন। ’ এ রকম শতশত প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে গ্রেফতার হওয়া আসামীদের ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৬ ফেব্রুয়ারী’১৫)। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকারও চাচ্ছে না বোমা হামলা বন্ধ হোক। কারণ বোমা হামলা দীর্ঘায়িত হলে জনগণ বিএনপি- জামায়াতের বিরুদ্ধে চলে যাবে। বিশেষজ্ঞরা  বহু আগে থেকেই বলে আসছেন- গত বছরের বোমা হামলা কারীদের বিচার সম্পন্ন হলে এ বছর এভাবে বোমা হামলা করার সাহস কেউ পেত না।
সে কারণে ভবিষ্যতে এ জাতীয় নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে হুকুমদাতা ও হুকুমপালনকারীদের বিচার একইসঙ্গে করতে হবে। সেসঙ্গে বিএনপি সহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলগুলোকে সভা-সেমিনার করার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা প্রয়োজন, এদেশে তৃতীয় কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল না থাকায়  জনগণ এখনও দু’দলের ক্ষমতায় থাকার এবং ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

লেখক : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য