Care Picureআরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা থেকেঃ “মোর কষ্টের কথা কি কইম ভাই, অভাবের তাড়োনায় যখন ছেলে-মেয়েকে ঠিকমত খাবার দিতে পারছিলুম না সংসার ও ভালোভাবে চালাতে সম্ভব হচ্ছিল না। মানুষ মোকে দেখলে পালাতো, কারও কাছে মুই কোন কিছু চাইতে পাইতাম না। ঠিক তখনি মোর  পাশে এসে দাঁড়ায় স্যাপ-সেতু প্রকল্প। কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার নয়নপুর গ্রামের মধ্যপাড়ার হতদরিদ্র মফছেল মিয়া।” পলাশবাড়ী উপজেলা সদর থেকে তার গ্রামের বাড়ীর দুরুত্ব প্রায় ১২ কিঃ মিঃ। তার পিতা মৃত ইজারত আলী। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন। নিজের জায়গা জমি বলে কিছুই নাই। এমনকি বসতবাড়ীর ভিটা টুকুও নাই। বসতভিটায় যে কুড়ে ঘরটি ছিল তাতে রাতে জোসনা এসে সবাইকে আলোকিত করতো। ভাঙ্গা বেড়া দিয়ে অনায়াসে কুকুর শিয়াল যাতায়াত করতে পারতো। সেই ১টি কুড়ে ঘরে বসবাস করতে হতো বিয়ের উপযুক্ত দুই মেয়েকে নিয়ে। জীবন বাঁচার তাগিদে দিন মজুরী ও আগাম শ্রম বিক্রি করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। এমনো দিন কোন কাজও মিলে নাই। স্বামীর আয় দিয়ে সংসার চালাতে না পারায় তার স্ত্রী মানুষের বাড়ীতে কাজ করতেন। নিজের বাড়ীতে কোন নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ছিলনা। অন্যের বাড়ী থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হতো। যার জন্য তাদের অনেক কথা শুনতে হতো। তিনবেলা যে ঠিকভাবে খাবেন এমন পরিস্থিতি তার ছিল না। কোন রকমে একবেলা-আধাবেলা-না খেয়েও দিন কাটাতে হয়েছে। এভাবেই চলছিল তাদের জীবনযাপন। ব্রিটিশ সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় সিঁড়ির ব্যবস্থাপনায় কেয়ার বাংলাদেশের কারিগরী সহযোগিতায়, স্যাপ-বাংলাদেশ। ২০১২ সালে সেতু প্রকল্পের কাজ শুরু করে নয়নপুর মধ্যপাড়া  গ্রামে। খানা জরিপের মাধ্যমে মফছেল মিয়া সেতু প্রকল্পের উপকারভোগীর তালিকায় অর্ন্তভূক্ত হন। এক পর্যায়ে তার দক্ষতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় মনোহরি ব্যবসা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে তার। এরই উপর ভিত্তি করে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে সেতু প্রকল্প থেকে মনোহরি দোকান করার জন্য তাকে ৭ হাজার ৬শ’ ৬০ টাকা প্রদান করা হয়। তিনি মনে করেন এই টাকা দিয়ে দোকান করেই ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তারপর তিনি নয়নপুর মধ্যপাড়া গ্রামে রাস্তার ধারে মনোহরি দোকান শুরু করেন। দৈনিক গড়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা আয় করেন। বর্তমানে আয় থেকে তার সংসারের সকল খরচসহ তিনবেলা খাবারের চিন্তা করতে হয় না। ইতিমধ্যে তিনি দোকানের আয় থেকে দুই মেয়েকে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে মফছেল বলেন, আমার যদি আগের অবস্থা থাকতো তাহলে আমি আমার মেয়ে দুইটিকে ভালো ঘরে বিয়ে দিতে পারতাম না। বর্তমানে  তিনি দোকান থেকে ৫০ হাজার টাকা করে জমি বন্ধক নিয়েছেন। নিজের বাড়ীতে চারচালা ১টি ঘর ও নিরাপদ পানির জন্য টিউবয়েলসহ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন করেছেন। তাছাড়াও একটি গাভী কিনেছেন যার মূল্য ১৮ হাজার টাকা। বর্তমানে তার দোকানে ১৫ হাজার টাকার মালামাল আছে। এখন তিনি প্রতি মাসে ১’শ টাকা করে ডিপিএস এ জমা করেন। মফছেল মিয়া মনে করেন সেতু প্রকল্পের কারণে আজ তার অনেক উন্নতি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আগে সমাজের মানুষের কাছে তার কোন মূল্যায়ন ছিল না। সমাজে কোন অনুষ্ঠান হলে তাকে দাওয়াত জানানো হতো না। কিন্তু এখন তাকে সমাজের সবাই মূল্যায়ন করে। সমাজের যে কোন অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াত জানানো হয়। মফছেল মিয়া বলেন সেতু প্রকল্পেরমত অন্যান্য সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় তাহলে তাদেরমত অতিদরিদ্র পরিবার গুলো আর অতিদরিদ্র থাকবে না। তাদের কাঙ্খিত উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। তিনি আরও বলেন, আমি এখন আর কারো কাছে আর্থিক সহযোগিতা চাইনা। আর্থিকভাবে আমি স্বচ্ছল। আমার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। তাই আমার আশা, আমার মত অত্রলাকার অন্যান্য অতিদরিদ্র পরিবারের পাশেও স্যাপ-বাংলাদেশ সেতু প্রকল্প দাঁড়াবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য