Parbatitpu (Dinajpur) Photo 5-2-15.3

মিলন পারভেজ, পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ উত্তরের হিমেল বাতাস ও হাড়কাপা প্রচন্ড শীতে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মোস্তাফাপুর ইউনিয়নের হাবিবপুর আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সবচেয়ে দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে শিশু ও বয়স্ক শ্রেনীর লোকেরা। কনকনে শীতে খোলা আকাশের নিচে অতিকেষ্ট অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। ১৩দিন পরও আতংক কাটেনি ফলে এখনও আদিবাসি যুবতী ও পুরুষ গ্রামে ফিরতে পারেনি। গত ২৪ জানুযারী জহরুল হকের অনুসারীরা মারধর করে আদিবাসী নারী-পুরুষকে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে ৯টি বাড়ীতে। হামলাকারীরা ভাংচুর করে গ্রামের বিষ্ণু মন্দিরের মুর্তি ও এনজিও পরিচালিত কারিতাস ও ব্র্যাক স্কুল। বন্ধ হয়ে অর্ধশতাধিক ছাত্র-ছাত্রীর লেখাপড়া।
আগুনে সর্বশান্ত হয়ে যাওয়া পরিবারগুলো মধ্যে উত্তর চিড়াকুটা সাঁওতাল গ্রামের কালুস সরেনের স্ত্রী প্রমিলা মুরমু বলেন, দাদা আমাদের সাথে তাদের কোন বিরোধ ছিল না। এখন আমি বাড়ীসহ আসবাবপত্র পুড়ে যাওয়ায় ছেলে-মেয়ে পরিবার পরিজন খোলা আকাশের নিচে এই শীতে দিনাতিপাত করছি। সরেন মুরমু’র স্ত্রী ফুলমতি হাসদা অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার বরর্ণা দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। হত্যা মামলায় প্রতিবিন্ধ ছেলে শ্রী মন মুরমু ও স্বামী কে গ্রেফতার করে। ধানচাল টাকা পয়সা লুটপাট হওয়ায় অভাব দেখা দিয়েছে। বর্তমানে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে। ইলি জাবেদ টুডুর স্ত্রী ময়েশ টুডু বলেন, তার ২টি গরু ও ৫টি ছাগল সহ সব কিছু লুটপাট করে বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করেছে হামলা কারীরা। চ্যাল চিউস হেমরম এর স্ত্রী সুরজ জোয়ানি বলেন, লুটপাট করে বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে হামলাকারীরা গ্রামের সব টিউবয়েল খুলে নিয়ে যাওয়ায় পানি পর্যন্ত খেতে পারছেন না। এসটেফান টুডু’র স্ত্রী এলিজাবেদ মুরমু বলেন, বাড়ী ঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানোর সময় এমন কি পাতিলের ভাত-তরকারী মাটিতে ঢেলে ফেলে দিয়ে হাঁড়ি পাতিলও নিয়ে যায়। নরেন মার্ডি’র স্ত্রী সাবিনা হাসদা বলেন, আমার বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে যাওয়ার সময় বাড়ীর টিউবওয়েল খুলে নিয়ে যাওয়ায় পানি পর্যন্ত খেতে পারি না।
আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের হাবিবপুর উত্তর চিড়াকুঠা, দক্ষিণ চিড়াকুঠা ও পূর্ব চিড়াকুঠা আদিবাসী পাড়া গ্রামের দুরদর্শা চিত্র। চারপাশের বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী আদিবাসী পাড়ার অর্ধশত বাড়ীতে লুটপাট চালায়। হামলাকারীরা আাদিবাসীদের দেড় শতাধিক গরু, অর্ধ শতাধিক ছাগল, হাস, মুরগি, ধান-চাল, টাকা-পয়সা ৬৮টি বাড়ীর টিউবওয়েলও খুলে নিয়ে যায়। গ্রামটি ঘুরে প্রতিটি বাড়ীতে তান্ডবের নারকীয় দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে গ্রামটিতে কোন যুবতী ও পুরুষ আদিবাসীর তেমন একটা দেখা মেলেনি। শুধু নারী আদিবাসীদের করুন আর্তনাদ চোখে পড়ে।
জোসেপ টুডুর বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী মারিয়া হেমরম (৪৫) কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় তার স্বামী বাড়ি ছাড়া। ধানচাল টাকা পয়সা লুটপাট হওয়ায় চলমান ইরি-বোরো চাষাবাদ করার মতো টাকা পয়সার অভাব দেখা দিয়েছে। চাষাবাদ করতে না পারলে সারা বছর অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হবে।
রংপুর কারমাইকেল কলেজের অনার্স ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী দিপালী টুডু বলেন, তার ইন্টারমেডিয়েট প্রথম বর্ষে অধ্যায়নরত মেজ ভাই এমোলিউস টুডু ও এসএসসি পরীক্ষার্থী ছোট ভাই এন্টানিউস টুডুকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
প্রশাসন ও এনজিও গুলো হাড়ি পাতিল ও শীত নিবারনের জন্য কম্বল বিতরন করেন। অথচ নারী ও পুরুষ এর পরনের কোন কাপড় চোপর না থাকায় ব্যবহারিক এক কাপড়ে পরে থাকতে হচ্ছে। এমন হচ্ছে ভিজা কাপড় এদিকে শুকাচ্ছে আর এক দিকে পরছে। নারী ও পুরুষের ব্যবহারিক কাপড় চোপর হামালাকারীরা নিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। আদিবাসী পল্লীর উত্তর চিড়াকুঠা গ্রামের প্যাড গ্রুফ সমিতির সভানেত্রী বিমলা টুডু বলেন, শতশত গ্রামবাসী তাদের পল্লীতে হামলা চালায়। বাড়ী ঘরে অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট চালায় তারা। এমনকি পাতিলের ভাত-তরকারী মাটিতে ঢেলে ফেলে দিয়ে হাঁড়ি পাতিলও নিয়ে যায়। হামলা চালিয়ে নগদ ১লাখ টাকা, ৫টি গরু, দুই ড্রাম চাউল, সমিতির ভ্যান, ১৭ ইঞ্চি কালার টিভি, শ্যালো মেশিন, ভাতের পাতিলসহ ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে যায়। সিলানুস এর স্ত্রী বামিজা নয়ন বলেন, তান্ডবকারীরা তার বাড়ীর ১টি গরু টিউবওয়েল, শ্যালো মেশিন স্বার্নাল্কংার নিয়ে চলে গেছে। অথচ তাদের সাথে আমাদের জমি নিয়ে কোন বিরোধ ছিল না। শাইডি টুডু (৪০) বলেন, আমার গলার চেইন, নাকের ফুল ও ৩টি গরু নিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, গত ২৪ জানুয়ারী শনিবার দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মোস্তফাপুর ইউনিয়নের হাবিবপুরে ১৪ একর জমি নিয়ে আদিবাসী সাঁওতালদের সাথে বড়দল সরকার পাড়া গ্রামের জহুরুল হকের লোকজনের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে তীর বিদ্ধ হয়ে জহুরুল হকের ছেলে শাফিউল ইসলাম সোহাগ মারা যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জহুরুল হকের অনুসারীরাসহ চারপাশের গ্রামের হাজারো মানুষ সাঁওতাল পল্লীতে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ করে। এতে অর্ধশত বাড়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লুটপাট করা হয় সাঁওতালদের দেড় শতাধিক গরুসহ পরিবারের সব কিছুই।
এব্যাপারে চিড়াকুটা সাঁওতাল পল্লীতে অস্থায়ী ক্যাম্প ইনচার্জ পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল আলম জানান, খোয়া যাওয়া গরু, ছাগল, ভেড়া, চাল, ধান, সেলাই মেশিন, শ্যালো মেশিন, রিকশা ভ্যান ও বাইসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় পুলিশ ফোর্স রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয় পর্যন্ত তারা এখানে অবস্থান করবেন বলে জানান।


 




 

 


মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য