আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কঠোর হাতে ১০ বছর শ্রীলঙ্কাকে শাসন করে আসা মাহিন্দা রাজাপাকসের সর্বশেষ ভোটে পরাজয়ের পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর ইন্ধনের অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা ও রাজনীতিক সূত্রগুলো বলছে, এই মাসে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে রাজাপাকসেরই এক সময়ের মন্ত্রী মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করাতে কলকাঠি নেড়েছিলেন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কলম্বো স্টেশনের প্রধান। আর এই অভিযোগ ওঠার পর নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে শ্রীলঙ্কা ‘র’ এর ওই কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে বলে কলম্বোর সংবাদপত্রগুলোর খবর। ‘র’-এর কলম্বোর ‘স্টেশন চিফ’কে সরিয়ে আনার কথা স্বীকার করলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, অন্য কোনো কারণ নেই, ওটা ছিল চাকরির নিয়মিত বদলির অংশ।

তবে কলম্বো এবং নয়া দিল্লির সূত্রগুলো বলছে, এক মাস আগে গত ডিসেম্বরে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে সরাতে বলেছিল শ্রীলঙ্কা সরকার। এরপর তাকে সরিয়ে আনা হয়।

শ্রীলঙ্কার দৈনিক সানডে টাইমস গত ২৮ ডিসেম্বর খবর ছাপিয়েছিল, সম্মিলিত বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দাম দিলেন ‘র’ এর কলম্বোর স্টেশন চিফ। ওই সময় প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকা রাজাপাকসে রয়টার্সের জিজ্ঞাসায় বলেছেন, তিনি সব কিছু ভালোভাবে জানেন না। অন্যদিকে গত ৮ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্ট সিরেসেনা নেতৃত্বাধীন সরকারের ভাষ্য হচ্ছে, বিষয়টি তারা নিশ্চিত নয়, তবে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর তাদের চোখে পড়েছে। প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আগে থেকেই ভূমিকা রেখে আসছিল ভারত। তামিল বিদ্রোহীদের দমনে শ্রীলঙ্কা সরকারকে সহযোগিতায় ১৯৮৭ সালে সৈন্যও পাঠিয়েছিল ভারত। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও শ্রীলঙ্কার ঘটনা রেখাপাত ফেলে, কারণ শ্রীলঙ্কার মতো ভারতের একটি রাজ্যও তামিলদের আবাস। শ্রীলঙ্কায় সৈন্য পাঠানোর প্রতিক্রিয়ায় তামিল হামলায় মরতে হয়েছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীকেও।

সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী সম্প্রদায়ের রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতা নেয়ার পর তামিল টাইগারদের উৎখাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ভারতীয় তামিলসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধিতা উপেক্ষা করেই তিনি তামিল বিদ্রোহীদের সংগঠন এলটিটিইকে সমূলে উৎখাত করেন। দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পর এবার রাজাপাকসের অপ্রত্যাশিত পরাজয় শ্রীলঙ্কার বিষয়ে ভারতের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে। কেননা রাজাপাকসের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়াকে ভালো চোখে দেখছিল না নয়া দিল্লি।

গত বছর নয়াদিল্লিকে কিছু না জানিয়ে রাজাপাকসে চীনের দুটি সাবমেরিনকে শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দিলে সতর্ক হয়ে উঠে ভারত। বিদ্যমান একটি চুক্তির আলোকে এ বিষয়ে নয়া দিল্লিকে জানানোর কথা ছিল শ্রীলঙ্কা সরকারের, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলে জানিয়েছেন সূত্রগুলো।

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা জানিয়েছেন, আগামি মাসে প্রথম বিদেশ সফরে নয়া দিল্লি যাবেন তিনি। তার বৈদেশিক নীতিতে অগ্রাধিকার ভারতকেই। ভারতীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বন্দ্বে লিপ্ত বিরোধী দলগুলোকে একত্র করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন এমন অভিযোগ পাওয়ার পর ‘র’-এর ওই প্রতিনিধিকে ডেকে পাঠানো হয়।
তার বিরুদ্ধে সিরিসেনাসহ বেশ কয়েকজন আইন প্রণেতাকে রাজাপাকসের দল ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে বৈঠক করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়, জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা; যাদের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় প্রধান নেতা রনিল বিক্রমাসিংহে যেন না দাঁড়ান এবং নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবেন এমন কারও পক্ষে থাকেন, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতেও প্রভাব রাখেন ভারতের ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

“তারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, রনিলের সঙ্গে কথা বলেছেন, এসব বিষয় সংগঠিত করেছেন, চন্দ্রিকার সঙ্গেও কথা বলেছেন,” বলেন শ্রীলঙ্কার এক আইনপ্রণেতা। অভিযোগ রয়েছে, ‘র’-এর ওই কর্মকর্তা শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন, কুমারাতুঙ্গা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে সিরিসেনাকে রাজি করাতে অন্যতম প্রধানে ভূমিকা পালন করেন।

সিরিসেনার নতুন সরকারে প্রধানমন্ত্রীর পদ পাওয়া বিক্রমাসিংহে নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে ভারতীয় ওই গোয়েন্দার সঙ্গে দুই থেকে তিন বার বৈঠক করেন বলে ওই আইনপ্রণেতা জানান। তবে তার দাবি, ওই গোয়েন্দাকে তখন ভারতীয় দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা হিসেবেই জানতেন তিনি। বিক্রমাসিংহের মুখপাত্র ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের কথা স্বীকার করলেও বলেছেন, ভারতীয়রা কোনো পরামর্শ দেয়নি। “ওই ভারতীয় কূটনীতিক (র-এর স্টেশন চিফ) অন্য রাজনীতিবিদদের পরামর্শ দিয়েছিলেন কি না, তা আমি জানি না না।” বৈদেশিক মিশনে থাকার সময় ‘র’-এর কর্মকর্তাদের সাধারণত কূটনীতিক পদ দেওয়া হয়। ভারতের এই তৎপরতার বিষয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট কুমারাতুঙ্গা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। রাজাপাকসে নিজে ভারতীয় গোয়েন্দার এই তৎপরতার বিষয়ে ‘কিছু জানেন না’ বললেও তার ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, এই ভোটে বিদেশি কিছু খেলার ইঙ্গিত তো আছেই।



 
 
 



 

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য