আরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা থেকেঃ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্রতম জেলাগুলোর মধ্যে গাইবান্ধা জেলা অন্যতম। এই জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের পিছিয়ে পড়াগ্রাম কাতুলী হরিচানপুর। ওই গ্রামে অনেক লোকের বসবাস। তাদেরই একজন হলেন বাবলু মিয়া। ছোটবেবলা থেকে স্বপ্ন দেখেন বড় হয়ে অনেক টাকার মালিক হবেন। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু অর্থের অভাবে তার স্বপ্ন পুরন হবে কিভাবে? নিজের কোন ভিটামাটি নেই। অন্যের জমিতে ভাঙ্গা চুড়া কুঁড়ে ঘর তৈরী করে এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বসবাস  করেন বাবলু মিয়া। বেশির ভাগ সময়ই অন্যের জমিতে কামলা দিয়ে কষ্টে-শিষ্টে দিনাতিপাত করতে থাকেন। কিন্তু তাও বেশী দিন থাকতনা, তখন তিনি ভাড়ায় ভ্যান চালাতেন। দৈনিক ১’শ টাকা থেকে ১’শ ৫০ টাকা আয় হতো। কিন্তু তা দিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটতনা, বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে অন্যের বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করাতেন। ভালো কাপড়-চোপর পরতে পারতেন না। দু- এক বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতেন। টিউবওয়েলের পানি পান ও স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে না পেরে প্রায়ই রোগব্যাধি লেগেই থাকতো। পরিবারের মৌলিক চাহিদা পুরনে ব্যর্থ হয়ে কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন বাবলু মিয়া। ভাবেন কিভাবে সংসার চালাবেন, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া কিভাবে চলবে। এসব নানা চিন্তায় সে যার পর নাই ভেঙ্গে পড়েন। এমতাবস্থায় ২০১০ সালে বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় ‘সিঁড়ি’র ব্যবস্থাপনা ও কেয়ার বাংলাদেশের কারিগরী সহযোগিতায় সাউথ এশিয়া পার্টনারশিপ-বাংলাদেশ সেতু প্রকল্প-এ কাজ ওই পাড়ায় শুরু করে। পাড়ার সামাজিক মানচিত্র ও সচ্ছলতার শ্রেণী বিন্যাসে বাবলু মিয়া সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হয়। অতঃপর ২০১২ সালের আগষ্ট মাসে সেতু প্রকল্প থেকে বাবলু মিয়া ঝাঁল মুড়ির ব্যবসা করার জন্য ৭ হাজার ৭’শ ৩০ টাকা পায়। টাকা পাওয়ায় আনন্দে তাঁর মন ভরে যায়, নতুন উদ্যমে ব্যবসা শুরু করেন । গ্রামের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে , বাজার ও স্কুলে স্কুলে ব্যবসাটি সুন্দর ভাবে চালাতে থাকেন । বাবলু মিয়া বলেন,বর্তমানে এ ব্যবসা শুরু করে যেমন ভালো আয় হচ্ছে  তেমনি স্কুলের ছেলে-মেয়েরা যখন আঙ্কেল বলে ডাকে তখন আমার বুক আনন্দে ভরে উঠে। বর্তমানে ব্যবসা থেকে দৈনিক ৩’শ ৫০ থেকে ৪’শ টাকা লাভ হয়। লাভের ৭ হাজার ৫’শ টাকা দিয়ে তিনি ৩ শতাংশ বাড়ির ভিটা জমি ক্রয় করেছেন। ১ টি গাভী ক্রয় করেছেন ১৮ হাজার টাকায় । টিনের ১ টি ঘর  দিয়েছেন ও ঘরের আসবাবপত্র কিনেছেন অনেক। তিনি এখন বাড়িতে টিউবওয়েল বসিয়েছেন এবং রিং ও স্লাব দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন করেছেন। বর্তমানে পরিবারের সকলে ভালো জামা কাপড় পরতে পারে। স্ত্রীকে এখন আর অন্যের বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করতে হয়না। নিজের সংসার ও হাঁস-মুরগী পালনের কাজে ব্যস্ত থাকেন। বর্তমানে তার মেয়ে স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। এখন তিনি তিন বেলা খেয়ে পড়ে সুখে স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন।  তাঁর পরিবারে আর কোন অভাব নেই। তিনি এখন স্বাবলম্বী। তাই তিনি মনে করেন ছোটবেলার স্বপ্ন আজ সত্যিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য