ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি : ‘পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে পাকিস্তনি সেনা ও রাজাকাররা ইচ্ছামতো নির্যাতন করত। সবার কথা চিন্তা করে সব মুখ বুজে সহ্য করেছি। আমি পাকিস্তানি সেনাদের বারবার আমাকে মেরে ফেলার জন্য আকুতি করলেও তারা তা করেনি। আত্মহত্যা করে জীবন বিপন্ন করতে চাইনি।

বলিদ্বারা গ্রামের টেপরি রানী। যুদ্ধের কিছুদিন আগে ১৬ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় শিয়ালডাঙ্গী গ্রামের মাটাং রায়ের সঙ্গে। একাত্তরের মে মাসে রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে তাঁকে ধরে নিয়ে যায় শিয়ালডাঙ্গী ক্যাম্পে। সেখানে তারা তিন দিন আটকে রেখে নির্যাতনের পর তাঁকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু তখনও তাঁর দুর্বিষহ জীবনের দুর্দশা শেষ হয়নি। মাসখানেক পর ফের তিনি আটক হন এবং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ১০-১২ বার শিয়ালডাঙ্গীসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে নিয়ে তাঁকে অসংখ্যবার নির্যাতন করে পাকিস্তানি সেনারা।

টেপরি রানী বলেন, পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা ইচ্ছামতো নির্যাতন করত। সবার কথা চিন্তা করে সব মুখ বুজে সহ্য করেছি। আমি পাকিস্তানি সেনাদের বারবার আমাকে মেরে ফেলার জন্য আকুতি করলেও তারা তা করেনি। আত্মহত্যা করে জীবন বিপন্ন করতে চাইনি। সংগ্রাম করেই বাঁচতে চেয়েছিলাম। নির্যাতনের কথা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বলিদ্বারা গ্রামে আবার বসবাস শুরু করি। কিন্তু নির্যাতিত হওয়ায় আমাদের পরিবারকে প্রায় দুই বছর একঘরে করে রাখে স্থানীয় লোকজন। আমাদের সঙ্গে কেউ লেনদেন করত না, কথা পর্যন্ত বলত না। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে আমার স্বামী মাটাং রায় অসুখে মারা যান। তারপর থেকে আমার দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে অতিকষ্টে দিন কাটাচ্ছি। ছেলে সুধীর ভ্যানচালক।

টেপরি রানীর আকুতি, সুধীরের বড় মেয়ে (তাঁর নাতনি) জনতা রায়কে যেন সরকার একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়।’ জনতা রায় এবার রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে।
টেপরি রানীর মতো এ অঞ্চলে আরো অনেক বীর নারী রয়েছেন। তাঁরা হলেন: কেউটান গ্রামের ঝরনা রানী মুল, তীর্থবালা পাল; রাউতনগর গ্রামের আসমা বেগম, হাফেজা বেগম, মুনি কিস্কুু, সীতা হেমব্রোম, সুবি বাসুগি, জবেদা বেওয়া, হনুফা বেওয়া, সাজেদা বেগম, রওশন বেওয়া; শিদলী গ্রামের নিহার রানী দৈবা; ফাড়াবাড়ি গ্রামের হাসিনা বেগম, হালিমা বেগম; ভারা গ্রামের চানমনি; লেহেম্বা গ্রামের ঝড়ূ বালা; পকম্বা গ্রামের নুরজাহান বেগম; পদমপুর গ্রামের হাসিনা বেগম; গোগর গ্রামের মালেকা বেগম; শামাডাঙ্গী গ্রামের জমেলা বেওয়া; নিয়ানপুর গ্রামের তিন বোন মালেকা বেগম, আমেনা বেগম ও মোকলেছা বেগম।

ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক আলহাজ ফজলুল করিম বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার জন্য এই বীর কন্যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা তাঁদের সন্মান জানাতে না পারলেও জনগণের মনে তাঁদের স্বীকৃতি সব সময় আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা জানানো উচিত। আশা করি, সরকার এই নারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাঁদের স্বীকৃতি দেবে।’

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য