সৈয়দপুরে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ আর্থিক সংকটে আটকা পড়ে আছে। প্রায় ১০০ শতক (এক একর) জমির ওপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ গত অর্থ বছর শুরু হয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে এলাকার এমপি ও বিরোধীদলীয় হুইপ আলহাজ শওকত চৌধুরী গত বছরের ১৩ জুন স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নির্মাণ কাজ তদারকি করতে গঠন করা হয় আহবায়ক কমিটি। শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রাজকুমার পোদ্দার স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কমিটির আহবায়ক নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে কাজও শুরু হয় জোরেশোরে। ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ও হয়েছে। স্মৃতিসৌধের কাজ সম্পন্ন করতে প্রাক্কালন ব্যয় ধরা হয় এক কোটি টাকা। যার সিংহভাগ টাকার যোগান দেয়ার কথা সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু সরকারিভাবে এ কাজে এ পর্যন্ত সহায়তা মিলেছে মাত্র তিন মেট্রিক টন গম ও নগদ আট হাজার টাকা। এ যাবত স্মৃতিসৌধ নির্মাণে ব্যয়িত অর্থের সিংহভাগ টাকা সমাজের বিত্তবানরা যোগান দিয়েছেন। তবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে সরকারি সহায়তা মেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে দেশ বিজয়ের ৪২ বছর পর শুরু হওয়া বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের নির্মাণ কাজ আতুর ঘরেই বন্ধ হতে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে ১৩ জুন শহরের ৩৩৮ জন মাড়োয়ারী ও হিন্দু সম্প্রদাযের মানুষকে এদিন হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর অবাঙালিরা (উর্দুভাষী) তাদেরকে নীলফামারীর চিলাহাটি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে জড়ো করে। পরে তাদের একটি বিশেষ ট্রেনে তোলা হয়। রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ওই বিশেষ ট্রেনটি দুই কিলোমিটার দূরে গিয়ে শহরের নির্জন এলাকায় গোলাহাট নামক স্থানে থামানো হয়। এরপর ট্রেনের দরজা জানালা বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। ট্রেনের বগিতে আটকা থাকা অবস্থায় এক এক করে নারী, পুরুষ ও শিশুদের বের করে নাঙ্গা তলোয়ার ও বেয়নট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয়। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুও এদিন তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। নির্মম হত্যাযজ্ঞ থেকে ট্রেনের বগির জানালা ভেঙে পালিয়ে রক্ষা পেয়েছিলেন মাত্র তিনজন। ইতোধ্যে তাদের দুইজন স্বর্গীয় হয়েছেন। বর্তমানে একমাত্র বেঁচে আছেন কালঠু দাস। সেইদিনের স্মৃতি মনে করতে গিয়ে আঁতকে উঠেন তিনি। ওই হত্যাযজ্ঞের নির্মমতা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে। মুক্তিযদ্ধের শুরু থেকে বিজয়ের একদিন পরও তথা ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত অবাঙালিরা শহরের আটকাপড়া বাঙালিদের নিধন করে। সারাদেশে বিজয়ের পতাকা ১৬ ডিসেম্বর উড়লেও সৈয়দপুরে বিজয়ের পতাকা উড়ে ১৮ ডিসেম্বর। এদিনও হানাদারদের দোসর অবাঙালি রাজাকারদের গ্রেনেড হামলায় নিহত হন স্বাধীনতাকামী ডা. মোবারক আলী। সৈয়দপুর শত্রুমুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর। সবমিলে সৈয়দপুর শহরে প্রায় দুই হাজার বাঙালিকে হত্যা করে পাকিস্তানি দোসর অবাঙালিরা। সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে ১৩ জুন শহরের গোলাহাট এলাকায়। এদিন গোলাহাটে হিন্দু ও মাড়োয়ারী সম্প্রদায়ের ৩৩৮ জন নারী পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। সে কারণে বিজয়ের ৪২ বছর ধরে গোলাহাট বধ্যভূমিতে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে হিন্দু সম্প্রদায়সহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষরা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে। বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গত বছর ১৩ জুন গোলাহাট বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ শুরু হয়। স্মৃতিসৌধের পাশে মন্দির, পার্ক, পুকুর, রেস্ট হাউস নির্মাণেরও সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য ব্যয় ধরা হয় এক কোটি টাকা। কিন্তু সাধের ঘরে সাধ্যের বাতি নিভে যেতে বসেছে। সরকারের আর্থিক সহায়তা না মেলায় শুরুতেই স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ আটকা পড়ে গেছে। জানতে চাইলে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কমিটির আহবায় রাজকুমার পোদ্দার আর্থিক দৈন্যতার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সুদৃষ্টি দিলে হয়তো স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য