shaheb pic 20-10-14সাহেব, দিনাজপুরঃ ‘বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ ভেঙ্গে যায় গ্রাম, নদীও শুকনো ধহৃ ধহৃ / খেলার বয়স পেরুলেও একা ঘরে/ বারবার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু’। পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’ কবিতা থেকে সেখানকার শিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র এ গান গাইবার আগেই বাংলাদেশের দিনাজপুরে বন্ধু সংসদ নামের সংগঠনটির ভ্রƒণ প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছিল। দিনাজপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮৪ সালে যারা এসএসসি পাশ করেছিলেন তাদের কয়েকজন মিলে ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যাচ ’৮৪ নামে একটি সংগঠন। সেই সংগঠনটিই এখন বন্ধু সংসদ নামে পরিচিতি পেয়েছে এবং শুধু জিলা স্কুল নয়, দিনাজপুরের সব স্কুল-কলেজের ১৯৮৪ সালের এসএসসি ও ১৯৮৬ সালের এইচএসসি শিক্ষার্থীরা সংসদের সদস্য হতে পারছে। ‘যদি বন্ধু হও হাত বাড়াও’ বন্ধু সংসদের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনপ্রতিনিধি, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিল্পউদ্যোক্তা, শিল্পী থেকে সাধারণ মুদি দোকানি পর্যন্ত এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন। এভাবেই বন্ধু সংসদ গোটা দিনাজপুরে বন্ধুদের একসঙ্গে চলার ব্যতিক্রমধর্মী উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যটা খুবই সরল ছিল বলে জানালেন বন্ধু সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আমাদের বন্ধুদের কাউকে যেন হারিয়ে না ফেলি। সবাই যেন একত্র হতে পারি। তবে সংগঠন করতে গিয়ে দেখতে পাই, আমাদের বন্ধুদেরই কারো কারো অনেক সংকট-সমস্যা রয়েছে। কারোর বাচ্চা হয়তো খুবই ভালো ছাত্র, কিšøু অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারছে না। কেউ হয়তো নিজেই ভীষণ অসুস্থ। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছে না। আমরা বন্ধুরা তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছি।’

তবে এখন শুধু বন্ধুকৃত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বন্ধু সংসদÑজানালেন সংসদের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম। গত ১৭ নভেম্বর দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ি এলাকায় গ্রিনভিউ কনভেনশন সেন্টারে তার সঙ্গে কথা হয়। তাদের সঙ্গে যখন আলাপ হয়, তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। মাত্র শেষ হয়েছে বন্ধু সংসদের বার্ষিক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। প্রায় দুই দশক ধরে ঈদুল আজহার দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দিনে বন্ধু সংসদ আয়োজন করে আসছে এই অনুষ্ঠান। প্রতি বছর বেড়েই চলেছে এই অনুষ্ঠানে বন্ধুদের উপস্থিতির সংখ্যা। স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের নিয়ে এবার ৬২ জন বন্ধু উপস্থিত হয়েছিলেন। প্রায় শ তিনেক মানুষের একটি মিলন মেলা বসেছিল সেখানে। অনুষ্ঠানটি ছিল সাদামাটা। কিন্তু আন্তরিকতায় ভরপুর। ডা. আশিকা আকবর তৃষা সহৃত্রপাত করেন অনুষ্ঠানের। তবে অনুষ্ঠান পরিচালনার মহৃল দায়িত্বে ছিলেন ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান হৃপম। সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্য, শোক প্রস্তাব গ্রহণ এবং সঙ্গীতাষ্ঠানের ফাঁকে চলে স্মৃতিচারণ, চা-পান ও রাতের খাবার।

খাবারের পর শুরু হয় বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান। বন্ধুদের সন্তানদের মধ্যে যারা পিএস সি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পায় তাদের সবাইকে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে গত তিন বছর ধরে। প্রকাশ্য  বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানের বাইরেও রয়েছে তাদের কিছু গোপন কর্মসুচী। সেটা করা হয় বন্ধুদের মধ্যে যাদের কিছুটা আর্থিক অসচ্ছলতা আছে তাদের সন্তানদেরও শিক্ষা সহায়ক বৃত্তি প্রদান করা হয়।

এর বাইরেও বন্ধু সংসদের বন্ধুরা অদম্য মেধাবীদের শিক্ষা ব্যয় কিছুটা হলেও জোগানোর চেষ্টা করে বলে জানালেন সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক মুন্তাফিজুর রহমান হৃপম। তিনি বলেন, এ খাতে এখনো তাদের আলাদা কোনো তহবিল নেই। তবে কেউ তাদের কাছে এমন কোনো সাহায্যের আবেদন নিয়ে এলে এবং আবেদনটিতে সাড়া দেওয়া প্রয়োজন মনে হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধু সংসদের বন্ধুরা চাঁদা তুলে কিছু একটা ব্যবস্থা করেন। যেমন তাদের অর্থ সহায়তায় হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহিদের ভর্তি ফি জোগান দিয়েছেন কয়েকজন বন্ধু। স্মৃতির এইচএসসির পরীক্ষা ফি ও শফির উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার খরচের অনেকাংশই দিচ্ছে বন্ধু সংসদের কয়েকজন বন্ধু।

বন্ধু সংসদের সহযোগিতা নিয়ে ২০১২ তাদেরই এক বন্ধু শাকিব রানা প্রতিষ্ঠা করেছেন ছোটদের ছবি আঁকা শেখার একটি প্রতিষ্ঠান, যার নাম ড্রইং স্কুল। বর্তমানে সেখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২৪০। ড্রইং স্কুলের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত গিুদের জন্য চালু করা হয়েছে আরেকটি প্রকল্প, নাম কালার চাইল্ড, যেখানে ওই গিুদের শেখানো হয় ছবি আঁকা, কবিতা আবৃত্তি। দেওয়া হয় স্বাস্থ্য শিক্ষা।  ছবির প্রয়োজনীয় উপকরণ
তাদের মাঝে সরবরাহ করা হয় নিয়মিতÑএই কাজে ভাবনা নামে একটি বেসরকারি উšুয়ন সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া হয়ে থাকে।

শীত কালে দিনাজপুরে শীতের তীব্রতা থাকে অনেক। বন্ধু সংসদ তখন দরিদ্র শীতার্তদের মধ্যে বিতরণ করে শীত বস্ত্র ও কম্বল। গত কয়েক বছর ধরে বন্ধু সংসদের কয়েকজন বন্ধু মিলে অনায়াসেই ব্যবস্থা করে ফেলে কয়েশ শীতবস্ত্র ও কম্বল এবং সেগুলো সঠিক মানুষ বেছে বিতরণ করা হয় নিভৃতে।

তবে বন্ধু সংসদের সভাপতি মামুন হাসান চৌধুরী বলেন, জনহিতকর কাজে এখনো যথেষ্ট গুরুত্বপহৃর্ণ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। এখনো সংগঠনটি সদস্য বন্ধুদের আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বন্ধুদের আনন্দ-বেদনার যে কোন খবর সব সদস্যের কাছে পৌঁছে যায় অতি দ্রুত। একাজে সিদ্ধহস্থ সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর। তার মোবাইল ফোনে সব ব্যবস্থা করে রাখা আছে। কারো আত্মীয় স্বজন মারা গেলে, কেউ বিপদে পড়লে সেখানে গিয়ে দ্র“ত উপস্থিত হয়ে যায় একদল বন্ধু- বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার হাত। এভাবেই তারা বন্ধু সংসদের ‘আমার বন্ধু, আমার শক্তি’ স্লোগানটিকে সার্থক প্রমাণ করেছে।

বন্ধু সংসদকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন রয়েছে বলে জানালেন সংগঠনটির নেতৃস্থানীয়রা। তারা জানান, সংগঠনের পথচলাটা সবসময় সমান ছিল না। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মুরশেদুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে চলে সংগঠন একটু গতি হারিয়েছিল। বছর দুয়েক পর ছুটিতে দেশে এলে আবার নতুন কমিটি গঠিত হয় এবং সেই কমিটিতে  জার্জিস আনম সভাপতি এবং বেলাল সিকদার সাধারণ সম্পাদক হন। তারা ২০১১ সাল পর্যšø সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে আবার মুরশেদ দেশে ফিরলে গঠন করা হয় বর্তমান কমিটি। এই কমিটির উদ্যোগেই গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও অনুমোদন করা হয়। নিবন্ধন নেওয়া হয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্টøর থেকে।

বন্ধু সংসদের নেতারা জানান, শুরুতে তারা সংগঠনের কোনো তহবিল না রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাদের অনাগ্রহ সত্ত্বেও বিদেশে অবস্থানরত বন্ধুরা অনুদান গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়ায় ব্যাংকে তাদের একটা স্থায়ী আমানত হয়ে গেছে। এখন অবশ্য তারা স্থানীয় বন্ধুদের কাছ থেকে অনুদান নিচ্ছেন। বন্ধু সংসদের সদস্য দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমসহ আরো অনেকেই বিভিন্ন সময় সংগঠনের স্থায়ী আমানত বৃদ্ধির জন্য অনুদান দিয়েছেন। তাদের বিশ^াস আর্থিকভাবে আরেকটু সবল হয়ে তারা আরো অনেক সামাজিক কর্মকাফ্ফে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য