একটা সমাজ বা দেশকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার জন্য নাগরিকদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সমাজে বা একটা দেশে যারা বাস করেন তাদের সকলের কিছু না কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য থাকেই। শুধু আইন করে কিংবা পুলিশ দিয়ে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো যায় না। আইনের প্রতি সম্মান দেখাবার মানসিকতা নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত না হলে চাপিয়ে দিয়ে তার সুফল ষোল আনা পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। সত্যিকার অর্থে আমাদের এদেশে নাগরিক সচেতনতা কোনও কোনও ক্ষেত্রে যেমন বেড়েছে, তেমনই কোনও কোনও ক্ষেত্রে তার চরম অবনতিও ঘটেছে। ঈদ-পর্বের মতো দিনগুলোতে ট্রেনে, লঞ্চে বা বাসে যেভাবে মানুষ চলাচল করে তা পৃথিবীর উন্নত দেশে কল্পনাও করা যায় না।

এবার ঈদে অতিরিক্ত ট্রেন, লঞ্চ চালাবার ব্যবস্থা করা হবে বলে সরকারি তরফ থেকে বারবার প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। এবার কালোবাজারে ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করেও পায়নি হাজার হাজার যাত্রী ট্রেনের টিকিট। কিন্তু কালোবাজারে তা পাওয়া গেছে ঠিকই। এছাড়া কমলাপুর থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতে মানুষ যেভাবে উঠেছে তা দেখে আতংকিত না হয়ে উপায় ছিল না। ঢাকার কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোকে সাধারণ ট্রেন নয় ‘মানবট্রেন’ বলেই আমাদের মনে হয়েছে। ট্রেনে কেন এভাবে মানুষ ওঠে? যারা ওঠেন তাদের কি জীবনের মায়া নেই? দায়িত্ববোধ নেই? আর যারা ওঠান, তারা কী করেন? যারা এসব দেখভালের দায়িত্বে আছেন, তারাই বা কী দেখেন? নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বলতে কি কারুরই কিছু নেই? আলোচ্য ‘মানবট্রেন” যদি কোনওভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয় তাহলে কী ভয়াবহ পরিণতি ঘটতে পারে তা কি কারুরই ভাবনায় আসে না? আসলে আমাদের সবারই যেন গা ছাড়া ভাব লক্ষণীয়। কারুর মধ্যেই সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ কাজ করে না। সবাই যেন নিজের মতো চলতে চাই।

আইন আছে। ট্রেন, বাস, লঞ্চ এসব যানবাহন চলাচলের, যাত্রী পরিবহনের নিয়মনীতিও আছে। কিন্তু তা কেউ যেন মানতেই চাই না। যাত্রী, চালক, মালিক কারুরই আইন মানবার মানসিকতা নেই। ফলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। মূল্যবান জীবনের বিনাশ ঘটে। অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবনের জন্য। অথচ আইন মানলে সচরাচর অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। কে বলে আমাদের ড্রাইভার কিংবা সাধারণ মানুষ আইন মানতে আগ্রহী নন? বিদেশে গিয়ে আমাদের ড্রাইভার কিংবা সাধারণ শ্রমিকরা কী চমৎকারভাবে বিদেশের আইন কানুন মেনে চলে গাড়ি চালান, কলকারখানায় চাকরি করেন, এতো আমরা সবাই জানি। তাহলে নিজ দেশে আমরা এতোটা আইনের প্রতি অনুগত নই কেন?

আসলে আইন ওপর থেকে চাপিয়ে দিলেই হয় না। মানতেও হয় ওপর থেকেই। আইন যদি মন্ত্রী সাহেব মানেন তাহলে, সচিব, উপ-সচিব, কেরানি সবাই তা মানতে বাধ্য হবেন। আর যদি নিচের লোকেরা দেখেন যে, ওপরের বসই আইনের তোয়াক্কা করছেন না, তাহলে তারা মানবেন কোন দুঃখে? আইন না মানবার প্রবণতা এভাবেই আমাদের দেশে প্রবল হয়ে উঠেছে। ফলে সবখানেই আইন হচ্ছে উপেক্ষিত। এ প্রবণতা থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সবার মাঝে দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। নাগরিক সচেতনতা সৃষ্টি না হলে সমাজ ও দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা অনেক কঠিন কাজ বৈকি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য