09_N__FNS-13.02.13বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে ‘ধনী দেশ’ হয়ে উঠবে- এমন আশার কথা জানিয়ে নতুন ‘লাগসই’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও জনসাধারণকে ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ করে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  গতকাল বৃহস্পতিবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ২০৪১ সালে আমরা ধনী দেশ হিসাবে স্থান করে নেব। সেই লক্ষ্য মাথায় রেখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘লাগসই প্রযুক্তি’ উদ্ভাবনের জন্য গবেষকদের তাগিদ দেন তিনি। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা প্রকল্পে বিশেষ অনুদান, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ এবং এনএসটি ফেলোশিপের চেক তুলে দেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করতে পারলেই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এজন্য আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বব্যাপী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানাই।
উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে গবেষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়। তারপরও দেশের সাধারণ নাগরিকদের দেয়া করের টাকায় গবেষণা খাতে অনুদান ও ফেলোশিপ দিচ্ছে সরকার।
এ সহায়তা আমাদের ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে যাতে সহায়ক হয় সে বিষয়ে গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ শ্রম ও দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করার জন্য আমি অনুরোধ জানাই। মানব ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকেই জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত করেছে। দারিদ্র্য (মাথাপিছু আয়), মানবোন্নয়ন (পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার বিবেচনায়) এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য- এই তিনটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে দশ বছর পরপর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা হালনাগাদ করা হয়।
বর্তমানে আরো ৪৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও এ তালিকায় রয়েছে। এই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকার গতবছর অগাস্টে একটি ‘কর্মপরিকল্পনা’ অনুমোদন করেছে। অর্থনীতির বিচারে ‘ধনী’ দেশের কোনো তালিকা না থাকলে যেসব দেশ আগেই শিল্পায়নে উৎকর্ষ পেয়েছে এবং যাদের অর্থনীতির বেশিরভাগের যোগান দেয় সেবা খাত- সেসব দেশকেই বলা হয় ‘উন্নত রাষ্ট্র’।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করতে চাই যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা উন্নয়নে আমাদের জাতির পিতা সদ্য স্বাধীন দেশে যেভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সে পথ অনুসরণ করে আমাদের সরকারও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদানসহ সকল প্রকার সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা হবে। যারা গবেষণায় যুক্ত, তাদের অবসরের বয়সসীমা শিথিল করার সিদ্ধান্তও সরকারের রয়েছে বলে জানান তিনি।
লন্ডনের কিংস কলেজে অর্থোপেডিক টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণায় থাকা চিকিৎসক মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন মাহমুদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব কাজী কামরুন্নাহার এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিমা মোস্তফার হাতে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপের চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
আর এনএসটি ফেলোশিপের চেক পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগের এনএসটি ফেলো ইসরাত শারমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের এনএসটি ফেলো নাসিব সাইয়িদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের এনএসটি ফেলো মাহবুবা রহমান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের এনএসটি ফেলো সজীব কুমার সাহা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিয়েক সার্জন অসীত বরণ অধিকারী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহকারী অধ্যাপক হামিদা গুলশান প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে গবেষণার জন্য বিশেষ অনুদানের চেক নেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ অন সায়েন্স অ্যান্ড আইসিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ ও বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষক তৈরিই এ প্রকল্পের লক্ষ্য।
বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ ছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে এমফিল, পিএইচডি ও পিএইচডি পরবর্তী পর্যায়ের শিক্ষর্থী ও গবেষকদের মধ্যে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ দেয়া হয়। এর আওতায় ২০০৯-১০ অর্থ বছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩৩ জন শিক্ষর্থী ১৭ কোটি ২ লাখ টাকা পেয়েছেন। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ১০০১ জন শিক্ষর্থী ও গবেষককে ৬ কোটি ২৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা দেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বস্তরে বিজ্ঞান শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষাসূচি চালু করে বিশ্বমানের আধুনিক মানুষ গড়ার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, অপপ্রচার ও গুজবনির্ভরতা এবং সব ধরনের অন্ধত্ব ও গোঁড়ামী থেকে মুক্ত হয়ে প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ জীবন যাপনের পথ উন্মুক্ত হয়। এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী বিজ্ঞান শিক্ষা থেকে দূরে রেখে সাধারণ মানুষকে যেভাবে তাদের ক্রীড়নক বাণীয়ে রেখেছিল, এখন থেকে তা আর সম্ভব হবে না।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ভারপ্রাপ্ত সচিব এ কে এম আমির হোসেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য