05হোয়াইট হাউস থেকে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট সর্বত্রই আরও একবার চালানো হচ্ছিল ইউটিউবে সদ্য আপলোড করা ভিডিওটা৷ কয়েক জন ইরাকি সেনার মুন্ডু কেটে নেওয়ার পর ক্যামেরার সামনে এলেন ইসলামিক স্টেটের এক মুখ ঢাকা মুখপাত্র৷ ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল -মালিকিকে ‘অন্তর্বাস বিক্রেতা ‘ বলে সম্বোধন করে হুমকি দিলেন , ‘বাগদাদ দখল করেই শেষ হবে না তাদের অভিযান , কারবালা ও নজফের শিয়া ধর্মীয় স্থানগুলিকে মাটিতে মেশাতে পারলে তবেই পূর্ণ হবে তাদের মহান ব্রত৷সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ গত আট বছর এরই অপেক্ষায় ছিলেন৷ ইরাকি প্রধানমন্ত্রী তার কাছে শুরু থেকেই ইরানের দালাল৷আল -মালিকির জমানার ইরাকে সৌদি রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত পাঠাননি আবদুল্লাহ৷ গাল্ফ কো -অপারেশন কাউন্সিল (জিএসসি ) অর্থাৎ তার তাবেদার কুয়েত , বাহরাইন , কাতার , ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাত কর্তাকেও একই নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ ২০১১ -তে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে যখন সবার অলক্ষ্যে বাড়ছিল ইসলামিক স্টেট , তখন একবারও সৌদি কর্তাদের সদুপদেশ দেননি মার্কিন রাজনীতিবিদরা৷ আসলে , সদুপদেশ দেওয়া মার্কিনদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য এমন কথা তাদের ধামাধারী বৃটিশরাও হলফ করে বলতে পারবেন না৷ তাই সৌদি রাজপরিবার পশ্চিম এশিয়ায় ইরান তথা শিয়া প্রতিপত্তি খর্ব করার জন্য আল -কায়দা ও তালিবানের নলচে আড়াল দিয়ে সুন্নি কট্টরপন্থা ছড়াতে যা কিছু করেছে , তার সবটাই না দেখার ভান করেছিল আমেরিকা৷ এই তো বছর দশেক আগে , কান্দাহারে ‘বন্ধু’ মোল্লা মহম্মদ ওমরের কুশল সংবাদ নিতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন সৌদি রাজপরিবারের সদস্য তথা গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল -ফয়সল৷ তখন না মার্কিন সিআইএ, না বৃটিশ এমআই -৬ কেউ একবারও জানতে চায়নি ডনের মতো নিজেকে বেবাক লুকিয়ে ফেলা এই তালিবানকর্তার ঠিকানা সৌদি রাজকুমার কী ভাবে পান, আর তাদের ‘বন্ধুত্বের’ কারণটাই বা ঠিক কী ?

গোয়েন্দাদের সঙ্কোচের পেছনে অবশ্য মার্কিন বা বৃটিশ বিদেশনীতি জড়িত৷ কিন্ত্ত লজ্জা , ঘেন্না ও ভয় জয় করা সাংবাদিকরা, বিশেষ করে বিবিসি -র মতো সংস্থার সাংবাদিকরাও যে ক ‘বার আল -ফয়সলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তার কোনোবারই অস্বস্তিকর এই প্রশ্নের জবাব তারা জানতে চাননি৷পশ্চিম এশিয়া এবং ইরাকের রাজনীতিতে শিয়া -সুন্নি দ্বন্দ্ব বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে৷ ১৯২০ -র দশকের একেবারে শেষের দিকে বৃটিশরা জন্ম দিয়েছিল আজকের ইরাকের৷ এর জন্য মেসোপটেমিয়া ও বসরার সঙ্গে মেশানো হয়েছিল উত্তরের কুর্দি জনগোষ্ঠীর বাসভূমিও৷ বিদ্রোহী কুর্দিদের পৃথক ‘হোমল্যান্ডের ‘ দাবি নস্যাত্ করেই৷ সেই থেকে ইরাকের দখলদারি নিয়ে শিয়া -সুন্নির দ্বন্দ্বের সূত্রপাত৷ বাগদাদ ও সংলগ্ন অঞ্চলে সুন্নি অধ্যুষিত আরবরা সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ আর বসরা ও দক্ষিণ -পূর্বের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল শিয়া আরবদের প্রাধান্য৷ শিয়াদের চাপে রাখতে ও ইরাকের নতুন শাসক মক্কার শরিফ হুসেন বিন আলির তৃতীয় পুত্র এবং হাশেমি বংশীয় ফয়সলকে ভরসা দিতেই আরব না হওয়া সত্ত্বেও সুন্নি কুর্দিদের জোর করে ইরাকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল৷১৯৫৮ সালে ইরাকে বাথ পার্টির উত্থান ঘটল হাশেমিদের বংশ নাশ করে৷ শোনা গেল , তরুণ এক বাথ সদস্য সাদ্দাম হুসেনের নাম৷ ১৯৭৯ -তে এই সাদ্দামই ইরাকের মসনদে বসলেন৷ তিকরিত গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান সাদ্দাম সৌদি রাজপরিবারের পাত্তা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না , কিন্ত্ত বিধি বাম৷ ইরানে মার্কিনপন্থী রেজা শাহর শাসনের অবসান ঘটল আয়াতোল্লা খোমেনির নেতৃত্বে৷কিছুদিন পরই ইরানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের টানা ৪৪৪ দিন বন্দি রাখল খোমেনির অনুগতরা৷ ১৯৮৩ সালে ইরান প্রভাবিত শিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী হিজবুল্লার বৈরুত মার্কিন সেনাছাউনিতে হামলায় ২৪১ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু সৌদি রাজপরিবার ও তার ঘনিষ্ঠ সখা মার্কিন প্রশাসনের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছিল৷না -থাক পেডিগ্রি , শিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানকে থামাতে মরিয়া পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে তখন সাদ্দামই সম্বল৷ অন্য দিকে , পশ্চিম এশিয়ায় সৌদি রাজপরিবারের দাপট কমাতে উঠেপড়ে লেগেছিল তেহরানের ধর্মীয় নেতাদের প্রশাসনও৷ সিরিয়ায় আর এক শিয়াপন্থী হাফিজ আল -আসাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় একধাক্কায় ইরানের ক্ষমতা বেড়ে গেল অনেকটাই৷ ইরান -ইরাক যুদ্ধ শুরু হতেই সন্ত্রস্ত আমেরিকা সাদ্দামকে সমর্থন করতে একটুও দ্বিধা করেনি তাই৷১৯৯১ -এর উপসাগরীয় যুদ্ধ সাদ্দাম হুসেনের কোমর ভেঙে দিল৷ ২০০৩ সালে সাদ্দাম ক্ষমতাচ্যুত হলে পুরোনো ভয় ফের পেয়ে বসল সৌদি রাজ পরিবারকে৷ ময়দান সাফ দেখে ছক সাজাতে শুরু করল ইরানও৷ এমন পরিস্থিতিতে ইরাকের শাসনক্ষমতা শিয়াপন্থী নুরি আল -মালিকির হাতে আসায় পশ্চিম এশিয়ায় ফের অ্যাডভান্টেজ ইরান৷ ৯০ পার করা সৌদি বাদশাহ আবদ্ল্লুার স্মরণকালে এমন ‘দুর্দিন ‘ আর আসেনি৷ এতদিন ছিল ইরান আর সিরিয়া , এবার ইরাকও সেই শিবিরে ! ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শাসনক্ষমতা ছিল সুন্নিদের হাতেই৷ কিন্ত্ত এখন আরব দুনিয়ার দু’টি দেশ তো বকলমে শিয়া ইরানেরই হাতে !দুশ্চিন্তায় হিতাহিত জ্ঞান হারানো আবদুল্লাহ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিরোধীদের অর্থ ও অস্ত্র জোগাতে শুরু করলেন৷ জন্ম নিল কট্টরপন্থী সুন্নি সংগঠন ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইসিস )৷ উদ্দেশ্য , আরবভূমি থেকে শিয়াদের সমূলে বিনষ্ট করা৷অতীতে একাধিকবার এমন ধর্মীয় উস্কানির সাহায্য নিয়েছে সৌদি রাজপরিবার৷ ১৯২৫ -এ বর্তমান শাসক আবদুল্লার পিতা ইবনে সাউদ মিশরের আল -ইখওয়ান গোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে হাশেমিদের থেকে আরবকে নিজের অধিকারে এনেছিলেন৷ পরে , আল -ইখওয়ানের পিছু ছাড়াতে বৃটিশের সাহায্য নিয়েছিলেন সেবিল্লার যুদ্ধে৷ ইবনে সাউদের ইচ্ছায় আল -ইখওয়ানের উপর বিমান থেকে মেশিনগান চালিয়েছিল বৃটিশ সেনা৷ সে দিনের আল -ইখওয়ান আজ পরিচিত মুসলিম ব্রাদারহুড নামে৷

৭০ বছর পর ফের এমন ধর্মীয় উস্কানির সাহায্য নিয়ে তালিবান ও আল -কায়দা নামে দুই গোষ্ঠীকে বিশ্বের দরবারে পেশ করে এই সৌদি রাজপরিবারই৷ এবার পশ্চিম এশিয়া দখলের লড়াইয়ে তাদের বাজি ইসলামিক স্টেট৷ একা সৌদি রাজপরিবারই নয় , আরব দুনিয়াকে কিছুটা নড়বড়ে দেখে ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে পশ্চিম এশিয়ার সুযোগসন্ধানী রাষ্ট্র কাতারও৷ গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় আমির তামিম বিন হামাদ আল -থানির কাতারের বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ক্রমশ বেড়েছে৷ ২০১১ থেকেই মাথাপিছু আয়ের নিরিখে কাতার বিশ্বের ধনীতম দেশ৷ এবার আরব বিশ্বের তিন হর্তা কর্তা বিধাতা সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ , মিশরের আবেদল ফাতা এল সিসি এবং আবু ধাবির মহম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল -নাইহানকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন তামিম৷গত দু’বছরে কাতারেই তৈরি হয়েছে আল -কায়দা ও তালিবানের দু’টি দপ্তর৷ ধনী কাতারি আরবরা প্রকাশ্যে একাধিক জঙ্গি সংগঠনকে অর্থসাহায্য করে ধর্মাচরণের সুখ পেতে শুরু করেছেন৷ তাদের আটকানোর উপায় এখনও অধরাই৷ ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা৷ ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুতে অবসান হয়নি জঙ্গিবাদের৷ সন্ত্রাসের সংস্কৃতির চরমতম উদ্বর্তন দেখছে আজকের দুনিয়া৷ পূর্বে পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে আফ্রিকা পর্যন্ত ছবিটা একেবারে এক৷ করাচির জিন্না আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তালিবান হামলা , আফগানিস্তানে ভোটদাতাদের আঙুল কেটে জঙ্গি আস্ফালন , আইএসের সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল , ইয়েমেনে হাসপাতালকর্মীদের বাসে আল -কায়দার গুলি , আল -শাবাবের হাতে কেনিয়ায় ৪৮ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু , নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম জঙ্গিদের হাতে অপহূত ৩৭৬ জন স্কুলছাত্রী …৷ এই সব ঘটনাই মনে করায় এক আন্তবাক্যকে – বলশালীদের ক্লীবতাই সভ্যতার সবচেয়ে বড় সঙ্কট ডেকে আনে৷- ওয়েবসাইট।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য