বিষাক্ত লাচ্ছা সেমাই Semai-0003শাহ্ আলম শাহী,দিনাজপুর থেকেঃ পবিত্র ঈদ উল ফিতরকে সামনে রেখে দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানা। বিএসটিআই’র অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ওসব অস্থায়ী কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে লাচ্ছা সেমাই। ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত তেল ও রং ছাড়াও মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান। স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালিয়েও প্রতিকার হচ্ছে না তাতে।

আকর্ষনীয় মোড়কে মোড়ানো, দেখতে সুন্দর লাচ্ছা দেখে বোঝার উপায় নেই, এসবে ব্যবহার হচ্ছে বিষাক্ত তেল ও রং ছাড়াও মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান। দিনাজপুরের দক্ষিণ কোতয়ালীর সিকদারহাট,বিরল,ফুলবাড়ী,বিরামপুর.হাকিমপুর-হিলি,পার্বতীপুরসহ সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানাগুলোতে লাচ্ছা উৎপাদনের নামে চলছে, জনস্বাস্থ্য ধবংসের তৎপরতা।সেমাই তৈরীতে যে ময়দা,তেল,রং মেশানো হচ্ছে, তা সব কিছুতেই বিষাক্ত উপাদান। ময়দা মাখানো খমিড়ের কাজ চলছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পা দিয়ে মাড়িয়ে এভাবেই।

এ সব কারখার অধিকাংশই নেই বিএসটিআই’র অনুমোদন। কারখানার বাইরে থেকে প্রবেশ নিষেধ সাইনবোড ঝুলিয়ে অথবা গেটে তালা ঝুলিয়ে বা গেট বন্ধ করে চলছে লাচ্ছা সেমাই তৈরীর কাজ। দিনাজপুর দক্ষিণ কোতয়ালীর সিকদার হাট এলাকায় রজজব লাচ্ছা সেমাই তৈরীর কারখানায় দিয়ে দেখা যায়, বেহাল দশা। এই কারখানার নেই কোনো ধরনেরই লাইসেন্স। অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে চলছে লাচ্ছা তৈরির কাজ। শুধু রজ্জব লাচ্ছা নয়, দিনাজপুরের অধিকাংশ কারখাকায় পা দিয়ে মাড়িয়ে লাচ্ছার খমির মাখানোর কাজ চলছে। তবে এ ব্যাপারে বেকারী মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, সনাতন পদ্ধতিতে পা দিয়ে মাড়িয়ে লাচ্ছা তৈরী হয়ে আসছে। আমরা এসব বর্জন করতে চাই। তাই অনেকে এখন মেশিন দিয়ে স্বাস্থ্য সম্মত লাচ্ছা সেমাই তৈরী করছে।
Lachchha-03
সাইফুল্লাহ জানায়, দিনাজপুর বিরল  জঙ্গীপীর বাজারে সরল ফুড লাচ্ছা,বটের হাটে জাকিরুল ফুড লাচ্ছা,বুনিয়াতপুরে মলি বেকারী লাচ্ছা,পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া মহেশপুরে হিদু ফুড লাচ্ছা,ভাগলপুরে ফয়সল ফুড লাচ্ছা, ফুলবাড়ী উপজেলার গড় ইসলামপুর জলাপাড়া এলাকায় বাসার ফুড লাচ্ছা,চিকা বাবু ফুড লাচ্ছা,খোকন ফুড লাচ্ছা,মাদিলা হাটে মাদিলা বেকারী,শিমুল বেকারী, কাজীপাড়া রোডে খতিবর ফুড লাচ্ছা,বিরামপুরের চন্ডিপুরে সাত ভাই বেকারী,কাটলা স্বাধীন বেকারী,হাকিমপুর-হিলিতে মানিক বেকারী,পাবনা বেকারী,ডাঙ্গাপাড়ায় রজনী বেকারী,নবাবগঞ্জের দাউদপুরে সেলিম বেকারী, শহরের কাঞ্চন ঘাট এলাকায়(হঠাৎপাড়া) আলী চানাচুর,গফ্ফার চানাচুর, ৪ নং উপশহরে মধু চানাচুর,মুন্না চানাচুর,সুইহারী এলাকায় গাজী চানাচুর,দক্ষিণ কোতয়ালীর কমলপুরবাজারে হাকিম মৌলভী ফুড লাচ্ছা,ফুলতলা বাজারে রোস্তম ফুড লাচ্ছা, জাফর ফুড লাচ্ছা,সদর উপজেলার জামতলী মোড়ের পূর্ব পার্শে হ্যাপী বেকারী,গোপালগঞ্জ তেলিপাড়ায় মেঘনা বেকারী সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে চলছে। এদের কোন লাইসেন্স নাই।
Dinajpur-Vejal Semai-_0002
তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা তৈরী ও বাজারজাত করছে। যারা বিএসটিআই’র অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা তৈরী করছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর হস্তক্ষেপ নেক এটা আমরাও চাই। এ ব্যাপারে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা চাই। যাতে অবৈধ লাচ্ছা সেমাই তৈরীর কারখানাগুলো বন্ধ হয়। আমি এই তালিকা জেলা প্রশাসক সাহেবকে দিয়েছি।

এদিকে এই তালিকা অনুযায়ী সরজমিনে তদন্ত করে দেখা গেছে, এই তালিকার অধিকাংশ বেকারী বা লাচ্ছা সেমাই তৈরী কারখানার অস্তিত্ব নেই। তবে এই তালিকা ছাড়াও  আরও বেশ কিছু অবৈধ লাচ্ছা তৈরী কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। যাদের কোন লাইসেন্সে নেই। এসব অবৈধ কারখানার মালিকরা দাবী করেছেন,তারা বেকারী মালিক সমিতির সাথে জড়িত। মালিক সমিতি’র কতিপয় নেতাকে তারা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে আসছে।

অবৈধ এসব কারখানায় ক্ষতিকর উপাদান দিয়ে তৈরী এসব লাচ্ছা প্রাণঘাতি বলে জানিয়েছেন, দিনাজপুর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মাসতুরা বেগম জানান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে,বিষাক্ত তেল ও রং ছাড়াও মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি এসব লাচ্ছা সেমাই খেয়ে মানুষ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব লাচ্ছা খেয়ে পেটের পীড়া থেকে শুরু করে গেষ্টিক,আলসার,ক্যানসার থেকে শুরু করে কিডনী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
Lachchha-02
ভাম্যমান আদালতকে ফাঁকি দিতে রাতের আধারে ময়দা খামিরের কাজ করছে শ্রমিকরা। আর সারাদিন চলছে লাচ্ছা তৈরী ও ভাজার কাজ। তবে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা বাঁচতে চাই। তাই চাই, বিষ মুক্ত খাবার। এ জন্য আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। প্রতিরোধ গড়তে হবে বিষ যুক্ত খাবারের বিরুদ্ধে।

ঈদ ও মেহমানদ্বারিত্বের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে, এই লাচ্ছা সেমাই। তাই শুধু লোক দেখানো ভেজাল বিরোধী অভিযান নয়, স্বাস্থ্য সম্মত লাচ্ছা সেমাই তৈরী ও বাজারজাত করণে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর হস্তক্ষেপ নিবেন,এমটাই প্রত্যাশা করছেন, ভোক্তা ও সাধারণ মানুষ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য