রমজানকে ঘিরে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ইতিমধ্যে নানা অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা চিনির দাম বাড়াতে শুরু করেছে। বেসরকারি চিনি ব্যবসায়ীরা যখন এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের গুদামেই চিনির পাহাড় জমে রয়েছে। অবিক্রিত গুদামজাত ওই চিনি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আর সরকারি চিনিকলগুলো তাদের উৎপাদিত চিনি নিয়ে সারাবছরই লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশজুড়ে রমজানে চিনির বাড়তি চাহিদার সময়ও তারা চিনি বিক্রির তেমন উদ্যোগ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি) ক্রমাগত লোকসানই গুনে চলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ৩ বছর ধরেই দেশের ১৫টি চিনিকলের গুদামে বিপুল পরিমাণ চিনি ¯তূপিকৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বাজার মূল্যের চেয়ে সরকারি চিনিকলের মিলগেটে দাম বেশি নির্ধারণ করায় গুদামজাত সরকারি চিনি কেনার কোনো ক্রেতা মিলছে না। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের উৎপাদিত ১ লাখ ৬৯ হাজার টন চিনি গুদামেই নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ এ পরিমাণ চিনি বিক্রি হলে সরকারের ৫শ কোটি টাকারও বেশি আয় হতো। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো ২০১২-১৩ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত উৎপাদিত চিনির পরিমাণ ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের একই সময়ে উৎপাদিত চিনির পরিমাণ ১ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন। এসব চিনি গুদামেই রাখা আছে। এর মধ্যে কিছু চিনি নষ্ট ও কিছু মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। সরকারি চিনিকলগুলোর চিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করা হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দাবিতে কিছু চিনি এর বাইরেও বিক্রি করা হয়। সরকারি চিনিকলগুলোতে উৎপাদিত চিনির পাইকারি দাম বেসরকারি কারখানায় উৎপাদিত চিনির পাইকারি দামের চেয়ে প্রতি কেজিতে গড়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় ৪ হাজার ডিলারের মাধ্যমে বিএসএফআইসির চিনি বিক্রির কথা। কিন্তু সরকারি চিনিকলের চিনির দাম বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি থাকায় ডিলাররা দীর্ঘসময়েও চিনি উত্তোলন করছে না। আর শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ৪ হাজার ডিলারের মাধ্যমে সরকারি কারখানার চিনি সরবরাহ করা হলেও তারা পাইকারি মূল্যে কিনে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়। গত ২০১২ সালে বাজারে বেসরকারি কারখানার চিনির দর থেকে সরকারি কারখানার চিনির দর কেজিপ্রতি গড়ে ৪ থেকে ৫ টাকা বাড়িয়ে রাখা হয়। এতে ডিলাররা বড় অংকের লোকসান দিয়ে চিনি কিনে তা খোলাবাজারে বিক্রি করতে রাজি হয়নি। আর ডিলাররা চিনি না কেনায় বাজারে বেসরকারি চিনি ব্যবসায়ীরা একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ পেয়ে যায়। এতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের ডিলাররা এমনিতেই লোকসানে থাকা সরকারি চিনি বিক্রি না করায় আয়বঞ্চিত হচ্ছে। একই সাথে বেড়ে চলেছে বিএসএফআইসির লোকসানের পরিমাণও। সরকারি চিনিকলগুলোর চিনির বর্তমান পাইকারি দর ৪০ টাকা নির্ধারণ থাকলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান টিসিবির সরবরাহকৃত চিনির দর ৩৮ টাকা। সরকারি চিনিকলের চিনির দাম কার স্বার্থে বাড়িয়ে রাখা হয় এখন এ প্রশ্ন তুলেছে ডিলার ও সাধারণ মানুষ। ডিলারদের মতে- সরকারি চিনিকলগুলোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিলেই অবশ্যই এসব চিনিকল লাভের মুখ দেখবে। ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোতে প্রতি অর্থবছরে গড়ে ৯শ কোটি টাকারও বেশি লোকসান দিতে হচ্ছে সরকারকে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে চালু হয়ে ফেব্র“য়ারি-মার্চ পর্যন্ত উৎপাদনে থাকে। বছরের বাকি সময় কলগুলো বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ খরচসহ সব ধরনের খরচ সরকারি তহবিল থেকেই চালিয়ে নেয়া হয়। আবার প্রায় ৬ মাস বন্ধ থাকার পর যখন কলগুলো উৎপাদন শুরু করে, তখন যন্ত্রপাতি মেরামতে বড় অংকের অর্থ খরচ করতে হয়। আয় না থাকলেও লোকসানে পিছিয়ে নেই এসব রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো।এদিকে বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে র চিনি থেকে পরিশোধিত চিনি উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়। আবার চিনিকলের বয়লার ব্যবহারে বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও উদ্যোগ নেয়া হয়। আখের বিকল্প হিসাবে সুগার বিট ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে। চিনিকলগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনোটাই বাস্তবায়িত হয়নি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য