সংসদে দলীয় প্রশংসা বেড়েছে ৩ গুণনবম জাতীয় সংসদের তুলনায় দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দলীয় প্রশংসা বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। সরকারি দলের গুণগাণের পাশাপাশি প্রতিপক্ষ বা সাবেক বিরোধী দলের সমালোচনাও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।

দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা দলের প্রশংসা করেছেন ৮৫৬ বার। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে যা ছিল ২৫১ বার। একইসঙ্গে দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রাক্তন বিরোধী দলের সমালোচনা করা হয়েছে ৫৩১ বার। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে যা ছিল ৩৪২ বার।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘পার্লামেন্টওয়াচ: দশম জাতীয় সংসদ প্রথম অধিবেশন’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোরশেদা আক্তার।

প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিক হাসান।

গড়ে ২৮ মিনিট কোরাম সংকটে নষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সংসদে কোরাম সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা কিছুটা কমে এলেও দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতির ঘাটতির কারণে কোরাম সংকট এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। দৈনিক গড়ে ২৮ মিনিট কোরাম সংকটের কারণে নষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের অংশ হয়েও বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির পরিচিতির প্রচেষ্টা সংসদকে একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতার উপস্থিতি ছিল ৮৮.৮৮ শতাংশ (৩২ দিন) এবং বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি ছিল ৩৮.৮৮ শতাংশ (১৪ দিন)। দশম সংসদের ইতিবাচক দিক হল, প্রধান বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেনি। তবে জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দৃশ্যমান ছিল না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দশম সংসদের একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধান বিরোধী দল এবং সরকারের মন্ত্রিপরিষদে সহাবস্থানকে কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিবন্ধক হিসেবে উপস্থাপন করেন। সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অসংসদীয় ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে নবম সংসদের বিরোধী দলের সমালোচনার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।

বিরোধী দলের কাউকে কমিটির সভাপতি করা হয়নি

দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সকল সংসদীয় (৫১টি) কমিটি গঠিত হলেও বিরোধী দলের কোনো সদস্যকে কমিটির সভাপতি হিসেবে অšর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে কমিটিগুলোতে সদস্যদের সার্বিক গড় ইতিবাচক উপস্থিতি ছিল ৭৮ শতাংশ। নবম সংসদের কয়েকজন মন্ত্রীকে দশম সংসদে একই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে অšর্ভুক্তির ফলে নবম সংসদের কোনো অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন ও তদšের ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

নবম ও দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে দলীয় প্রশংসা হয়েছে ৮৫৬ বার ও প্রাক্তন বিরোধী দলের সমালোচনা করা হয় ৫৩১ বার, যেখানে নবম সংসদে প্রতিপক্ষ দলের সমালোচনা করা হয়েছিল ৩৪২ বার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে মোট কোরাম সংকট হয়েছে ১৭ ঘন্টা ৭ মিনিট যার অনুমিত অর্থমূল্য প্রায় ৮ কোটি ১ লাখ টাকা। অধিবেশনে আইন প্রণয়নে মোট সময়ের মাত্র ১.৮ শতাংশ ব্যয়িত হয়েছে। অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি সংক্রাš আইন ২০১০ এবং সংসদের স্থায়ী কমিটি (সাক্ষ্যগ্রহণ ও দলিলপত্র দাখিল) আইন-২০১১ নামে একটি বিলের খসড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তৈরি করলেও পাসের জন্য তা প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত হয়নি।

জনগুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেই বিরোধী দল

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা কার্যক্রেমর আওতায় কার্যপ্রণালী বিধি ৭১-ক বিধিতে মোট ৭১টি জনগুরুত্ব সম্পন্ন নোটিসের ওপর আলোচনা করা হয়। বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতি সংক্রাš ৫টি মূলতবি প্রস্তাব অন্য পর্বে আলোচিত হবে এ মর্মে প্রত্যাখ্যাত হলেও পরে তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

নিয়োগ ও বোর্ডের প্রশ্নপত্র ফাঁস, মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা ক্রেস্টের জালিয়াতি, উপঢৌকন নিয়ে চিফ হুইপের বক্তব্য, পৌর মেয়র পদে বহাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, হলফনামায় দেওয়া তথ্যের বাইরে অপ্রদর্শিত সম্পদ আহরণের অভিযোগ ইত্যাদি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলকে কোনো গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সংসদের মূল কাজ জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন করা। অথচ সংসদের কার্যাবলীর মধ্যে আইন প্রণয়নের হার ২ শতাংশেও পৌঁছায় না। এর কারণ, ব্যবসায়ী অধ্যূষিত সংসদ। আর সেজন্যই জনগণের স্বার্থের বিষয়গুলো প্রাধান্য পায় না এবং জনস্বার্থে আইন প্রণয়নে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। অথচ ব্যবসায়িক স্বার্থের আইনগুলো অত্যš দ্রুত পাস হয়।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদে বিরোধী দল তাদের মৌলিক পরিচয় থেকে দূরে আছে। বিরোধী দল আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছে। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৩ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট উপস্থিত ছিল বিরোধী দল। কিন্তু দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলের উপস্থিতি কমেছে। তারা এ অধিবেশনে উপস্থিত ছিল ৩ ঘণ্টা ৯ মিনিট। যা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি আগের বারের চেয়ে কমেছে। গত সংসদে সদস্যদের উপস্থিতি ছিল ৬৮ শতাংশ, এবার তা কমে এসেছে ৬৪ শতাংশে। যা সংসদ কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভালো লক্ষণ নয় বলে মšব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, সংসদ নেতার উপস্থিতি গতবার ছিল ৭৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৮৮ দশমিক ৮৮ শতাংশে। বিরোধী দলের নেতার উপস্থিতি গতবার ৭ দশমিক ৬৯ থেকে বেড়ে ৩৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ হয়েছে। যদিও সংসদ নেতা ও বিরোধী দলের নেতার উপস্থিতির অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তা যথার্থ নয় বলে মনে করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রতিবেদনে দেখা যায়, দশম জাতীয় সংসদে সরকার দলীয় প্রশংসা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। যা উদ্বেগজনক।

সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখার আশা ব্যক্ত করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংসদে বিরোধী দলকে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। কিন্তু তারা প্রথম অধিবেশনে ওই ধরনের কোনো প্রশ্ন সংসদে রাখেননি।

তিনি বলেন, সরকারি বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির মধ্যে গতবার তিনটি কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে রাখা ছিল। কিন্তু এবার বিরোধী দল থেকে কোনো সদস্যকে ওই ধরনের কমিটির সভাপতি করা হয়নি।

প্রতিবেদনে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ় করা, সংসদকে কার্যকর করা ও সর্বোপরি সংসদকে জবাবদিহিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে সদস্যদের উপস্থিতি, তাদের গণতান্ত্রিক আচরণ ও অংশগ্রহণ, সংসদীয় কমিটি কার্যকর করা এবং তথ্য প্রকাশ সংক্রাš ১৮ দফা সুপারিশ করা হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য