রাষ্ট্রায়ত্ত ভোগ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) দেয়া সরকারি ভর্তুকির টাকার বড় অংশই খরচ হয়ে যাচ্ছে চড়া সুদ, সার্ভিস চার্জ ও কর পরিশোধে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে টিসিবি পণ্যের দাম। তা নাহলে টিসিবি আরো কম দামে ভোগ্যপণ্য সাধারণ মানুষকে সরবরাহ করতে পারতো বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। কিন্তু চড়া সুদ, সার্ভিস চার্জ ও করের চাপে টিসিবি বেশি দামে পণ্য বিক্রির পরও লোকসানের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য বিক্রির জন্য সরকার টিসিবিকে ৬৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু এ টাকার বড় অংশই চলে যাচ্ছে সুদ, সার্ভিস চার্জ ও কর পরিশোধে। ফলে একদিকে যেমন টিসিবির পণ্যের দাম বেশি পড়ছে, অন্যদিকে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করায় প্রতিষ্ঠানটির লোকসানও বাড়ছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজার থেকেই পণ্য কেনার ক্ষেত্রে টিসিবিকে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, ব্যাংক ঋণের সুদ ১৫ শতাংশ। আর ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সুদ যোগ হয়ে বছর শেষে তা দাঁড়ায় ২০ শতাংশ। তাছাড়া ঋণপত্র খোলায় এলসি কমিশন, এলসি এডভাইস ফি ও ব্যাংকিং লেনদেনে মাত্রাতিরিক্ত সার্ভিস চার্জের কারণেও টিসিবির অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। পাশাপাশি টিসিবি ছোট ছোট আকারে পণ্য কেনায় খচর বেশি পড়ছে। বর্তমানে পণ্য বিক্রির পর অর্জিত মুনাফা থেকে টিসিবিকে সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর্পোরেট কর দিতে হচ্ছে। অথচ বেসরকারি খাত প্রতিযোগিতামূলকভাবে পণ্য কিনছে বা আমদানি করছে। একই সাথে তারা বেশি পরিমাণে পণ্য কিনে। কম সময়ে পণ্য কিনে তা দ্রুত বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ শোধ করে তারা। তাছাড়া নিয়মিত একই ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করায় ওসব ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকেও বিশেষ ছাড় পাচ্ছে। ফলে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের পণ্যের খরচ কম পড়ছে। আর তাদেরকে অগ্রিম আয়করও দিতে হয় না। ফলে তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছে। টিসিবির ভর্তুকির টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ইতিমধ্যে অর্থ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে জানানো হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এ ব্যাপারে চিঠি চালাচালির মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। বাস্তবে জোরালো কোনো উদ্যোগ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অথচ বাজারে দ্রব্যমূল্য গেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রায়ত প্রতিষ্ঠান টিসিবির মাধ্যমেই বাজারে হস্তক্সেপ করা হয়। টিসিবির কর্পোরেট কর সাড়ে ৩৭ শতাংশ প্রত্যাহারের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়, টিসিবি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়।টিসিবি বেশি দামে পণ্য কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি বছরই লোকসান গুনছে। আর লোকসানের কারণে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। এর আগের বছরে সংস্থাটি ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ৫৯ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ৭৮ কোটি এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ভর্তুকি দিয়েছে ৬৯ কোটি টাকা।এ প্রসঙ্গে টিসিবির তথ্য কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, কর্পোরেট কর দিতে গিয়ে টিসিবির প্রশাসনিক খরচ বাড়ছে। পণ্য কেনার শুরুতে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হচ্ছে। টিসিবির পুরো টাকাই নেয়া হয় ব্যাংক থেকে। এর বিপরীতে গড়ে ২০ শতাংশ সুদ দিতে হয়। ফলে ১শ টাকার পণ্যেল দাম বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১২৫ টাকা। এর সাথে যোগ হচ্ছে ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ, এলসি কমিশন। ফলে টিসিবি পণ্যের দাম আরো বেড়ে যায়। তাছাড়া রয়েছে পরিবহন খরচ, গুদাম ভাড়াসহ আরো অন্যান্য খরচ। অথচ বেসরকারি ব্যবসায়ীরা একই পণ্য ১শ টাকায় কিনছে। তাদের কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হয় না। শুধু প্রতি বস্তায় ৮ টাকা এবং প্রতি কেজিতে ১৬ পয়সা লেবার খরচ গুনতে হয়। এসব কারণে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের তুলনায় টিসিবির পণ্যমূল্য বেশি হচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য