৪ বছর সংসার করার পর স্ত্রীর মর্যাদা দাবি

রাজশাহী

শরিয়ত মোতাবেক বিয়ের পর চার বছর সংসার করেও কাবিন রেজিস্ট্রি না থাকায় স্ত্রীর মর্যাদা পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এক নারী। সেই সঙ্গে সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে কৌশলে হত্যার চেষ্টা চলছে এমন অভিযোগ তুলে পুলিশের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন ওই নারী।

নাদিরা খাতুন (২৫) নামে ওই নারীর বাড়ি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার অষ্টমনিষা ইউনিয়নের হঠাৎপাড়া নামক স্থানে। অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম শফি (৪৫) একই ইউনিয়নের সাহানগর গ্রামের মৃত রেফাত প্রামাণিকের ছেলে।

১৫ দিন আগে পুলিশে লিখিত অভিযোগের পর ইউনিয়ন পরিষদেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নাদিরা।

পুলিশে দেওয়া লিখিত অভিযোগ ও অভিযোগকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে উপজেলার একটি ইটভাটা মালিক শফিকুল ইসলাম শফি বিয়ে করেন তার ভাটা শ্রমিক নাদিরা খাতুনকে। শফির আগের স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকলেও দ্বিতীয় বিয়ে করেন নাদিরাকে।

তার সঙ্গে বিয়ের আগে নাদিরারও আগে একটি বিয়ে হয়েছিল এবং একটি মেয়ে রয়েছে তার। সেই স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর মেয়েকে নিয়ে থাকতেন নাদিরা। পরে শফিকুল ইসলামের সঙ্গে বিবাহের সময় মুসলিম শরিয়া মোতাবেক কালেমা পড়ানো হলেও হয়নি কাবিন রেজিস্ট্রি। কাবিন রেজিস্ট্রি করতে আসা ওই এলাকার কাজী বজলুর রশিদ গফুর তাদের বিয়ের কালেমা পড়ান।

তবে বিয়ে রেজিস্ট্রি না করানোর বিষয়টি ওই সময়ই নাদিরা শফিকে জানালে শফি বলেন, আগের স্ত্রীর ঝামেলা এড়াতে রেজিস্ট্রি হচ্ছে না। পরে কাবিন রেজিস্ট্রি করে নেবে। নাদিরার মা নিজেও শফির ইটভাটায় কাজ করায় সরল বিশ্বাসে মেয়েকে কাবিন ছাড়াই বিয়ে দেন।

বিয়ের পর নাদিরাকে নিজ বাড়িতে না নিলেও নাদিরার বাড়িতে নিয়মিত যাওয়া-আসা করতেন শফি। এভাবেই গোপনে তিন বছর দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করেন শফি। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে নাদিরা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে শফি অনাগত সন্তানকে নষ্টের জন্য নাদিরাকে চাপ দেন। এতে রাজি না হলে শফি তাকে সন্তান নষ্টের শর্তে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। তাতেও নাদিরা রাজি না হলে শফি তার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এমনকি তার ভরণপোষণও বন্ধ করে দেন।

দরিদ্র বাবার বাড়িতে অন্তঃসত্ত্বা নাদিরার কেটে যায় আরও আট মাস। গত এপ্রিল মাসে তৃতীয় সপ্তাহে নাদিরা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ায় লোক মারফত শফিকে জানালেও তিনি কোনো খোঁজ নেননি। বাধ্য হয়ে নাদিরার মা তাকে ডাক্তার দেখাতে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতাল ‘ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড’-এ নিয়ে যায়।

যাওয়ার পথে শফিকে পুরো বিষয়টি তাকে জানায় নাদিরার মা। এর পরে নাদিরাকে শফির ইটভাটা পার্টনার আব্দুল জব্বারের পরিচালিত ওই হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার নার্সরা নাদিরাকে সরাসরি অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গিয়ে তাকে সিজার করা হবে বলে জানান।

যেহেতু হাসপাতালের পরিচালক শফির ব্যবসায়িক পার্টনার, সেহেতু অনাগত সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করে নাদিরা ও তার মা সিজারে বাধা দেন। কিন্তু হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ জোর করে তাকে সিজার করান।

যুগান্তরের হাতে থাকা হাসপাতালের ছাড়পত্র থেকে জানা যায়, ওই দিন তার সিজারের অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করেন হাসপাতালের আবাসিক ডাক্তার তুহিনুর রহমান এবং সিজার সম্পন্ন করে ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হালিমা খানম লিমা।

নাদিরা অভিযোগ করেন, সিজারের সময় তাকে না জানিয়ে পরবর্তী সময় গর্ভধারণ রোধে তার ডিম্বাশয়ের নালি কেটে ফেলা হয়েছে এবং উত্তরাধিকার রোধে শফির পরামর্শে ও পরিচালক জব্বারের নির্দেশে সদ্য জন্ম নেওয়া পুত্রসন্তানকে অযত্ন করে মেরে ফেলা হয়েছে। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলেও তাকে সিজার করা হয় রাত ১টায়।

এর আগের সময়ে তাকে স্যালাইন লাগিয়ে অপারেশন থিয়েটারের এক কোনে ফেলে রেখে জোর করে একটি ওষুধ মুখে সেবন করানো হয়। তার দাবি, ওই ওষুধের কারণেই তার সন্তান পেটের ভেতরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সিজারের ১২ ঘণ্টা পর মারা যায়।

সিজারের আগে নাদিরার আল্ট্রাসনোগ্রাফ করানো ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের আবাসিক মেডিকেল অফিসার তুহিনুর রহমান বলেন, আমি শুধু আল্ট্রাসনোগ্রাম করেছি। কোনো জটিলতা আছে কিনা তা গাইনি ডাক্তার বলতে পারবেন।

কী কারণে নাদিরাকে সিজার করতে হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হয় ডা. হালিমা খানমকে। তিনি জানান, সম্ভবত ওই নারীর পানি ভেঙে গিয়েছিল, তাই সিজার করতে হয়েছিল।

এর পরে নাদিরার ডিম্বনালির পথ কেটে ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিজারের আগেই এ বিষয়ে রোগীর সম্মতিপত্র নেওয়া হয়। যদি সম্মতিপত্রে বিষয়টি উল্লেখ থাকে তা হলে তা করা হয়েছে। তবে তার সম্মতিপত্র দেখতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে দেখাবেন বলে জানান।

অষ্টমনিষা ইউপি চেয়ারম্যান সুলতানা জাহান বকুল অভিযোগ প্রাপ্তির কথা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে শফি ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার মোমিনুল হকের সঙ্গে কথা বললে শফি নাদিরাকে শরিয়া অনুযায়ী বিয়ের কথা স্বীকার করেন এবং কাবিন রেজিস্ট্রি হয়নি বলে জানান। তবে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মোমিনুল হক ২০ হাজার টাকা ওই নারীকে দেওয়ার প্রস্তাব করলে আমি তাতে অসম্মতি জানাই, পরে তারা এক লাখ টাকা দিতে চাইলে আমি সমাধানের লক্ষ্যে মেয়েপক্ষকে ডাকলে তারা টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানালে বিষয়টি সেখানেই আটকে যায়।

অভিযোগে উল্লিখিত সাক্ষী তিনজনের প্রথম জন মূলত বিয়ে পড়ানো কাজী বজলুর রশিদ গফুর। নাদিরার বিয়ের বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নাদিরার মা তার চালের মিলে কাজ করত। সে সুবাদে তাদের পরিবারের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। দরিদ্র ওই নারীর ঘর না থাকায় শফি নিজ জিম্মায় বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বাকিতে পণ্য কিনে ঘর করে দেন। এর পর তারা বাকির টাকা দিতে না পারলে শফিকুল তা শোধ করে দেন। পরে সেই টাকা ফেরত চাওয়ার কারণেই এই অপপ্রচার চালাচ্ছেন। প্রকৃত ঘটনা জানতে তিনি ওই মৃত বাচ্চার লাশ তুলে ফরেনসিকে পাঠানোরও দাবি করেন।

ভাঙ্গুড়া থানার এসআই মুরাদ হাসান জানান, বিয়ের বিষয়টি শফিকুল ইসলাম শফি অস্বীকার করলেও এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে তারা বিবাহিত। ঘটনার তদন্ত চলছে, তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।