তাজমহল কি হিন্দুমন্দির, হিন্দুত্ববাদীদের দাবি নিয়ে বিতর্ক

তাজমহল কি হিন্দুমন্দির, হিন্দুত্ববাদীদের দাবি নিয়ে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক

আগ্রায় যমুনার তীরে বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল আবার বিতর্কের কেন্দ্রে। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, তাজ আদতে হিন্দু মন্দির।

যমুনার তীরে ৪২ একর জমির উপর তাজমহলের নির্মাণ শুরু হয় ১৬৩২ সালে। তা প্রাথমিকভাবে শেষ হয় ১৬৪৩ সালে। পুরো শেষ হতে আরো দশ বছর সময় লাগে। সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় মমতাজ মহলের সমাধি। মুঘল নির্মাণশৈলির অন্যতম সেরা নিদর্শন। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন, কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল। সেই তাজমহল নিয়ে আবার বিতর্ক।

হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, তাজমহল আসলে একটি হিন্দু মন্দির। তার নাম ছিল তেজো মহালয়া। শাহজাহান সেই মন্দিরের উপরই তাজমহল বানিয়েছেন। বেশ কিছু বছর আগে পি এন ওক একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, তাজমহল আসলে হিন্দু মন্দির। সেই দাবি আবার করেছেন হিন্দুত্ববাদীরা।

বিজেপি সাংসদ ও জয়পুর রাজপরিবারের সদস্য দিয়া কুমারীর দাবি, তাজের জমি ছিল জয়পুরের রাজপরিবারের। সেই জমি শাহজাহান নিয়ে নেন। সেই জমির অধিকার দাবি করেছেন তিনি। দিয়া কুমারী জানিয়েছেন, রাজপরিবারের কাছে কাগজপত্রও আছে। তাজের থেকে কিছুটা দূরে জয়পুরের রাজপরিবারের পুরনো নির্মাণও আছে। ইতিহাসবিদেরা বলেন, রাজা মানসিংহ ছিলেন মুঘলদের মনসবদার। মনসবদারের কাছ থেকে সম্রাট জমি নেবেন, তা সেই যুগে স্বাভাবিক ঘটনা ছিল।

তাজের বেসমেন্টে ২২টি কামরা আছে। সেগুলি তালাবন্ধ। বিজেপি-র নেতা সেই তালা খোলার দাবি নিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। তার ও অন্য বিজেপি নেতাদের দাবি ছিল, তালা খুললে সত্য প্রকাশ পাবে। আদালত তার আর্জি খারিজ করে দিয়েছে।

পুরাতত্ত্ব বিভাগ ২২টি কামরার ছবি প্রকাশ করে বলেছে, এগুলি একেবারেই সাধারণ ঘর। সংরক্ষণের জন্য তা বন্ধ রাখা হয়েছে। এর পিছনে কোনো রহস্য নেই। ইতিহাসবিদেরা বলেন, সম্রাট শাহজাহান আগ্রা কেল্লা থেকে নৌকায় যমুনা পার হয়ে তাজমহলের সামনে নামতেন। তারপর নীচের কামরায় একটু বিশ্রাম নিয়ে উপরে যেতেন।

তাজের ঠিক উল্টো দিকে যমুনার অন্য তীরে কালো পাথরের আরেকটি তাজমহল বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন শাহজাহান। তার ভিত তৈরির কাজও হয়েছিল। তারপর আর কাজ এগোয়নি। আওরঙ্গজেব সেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই কৃষ্ণ তাজ নিয়ে অবশ্য কোনো বিতর্ক নেই। অন্তত সেখানে হিন্দু মন্দির ছিল এমন কোনো দাবি ওঠেনি।

হিন্দুত্ববাদীদের এই দাবি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগ্রা, দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সরাসরি এই বিতর্ক ছায়াপাত করেছে। সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই তাজমহলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ। তাজকে ঘিরেও বিভাজন তৈরি হচ্ছে। তাজের গাইড ববি শর্মা, গাড়ির চালক রবির মতো অনেকেরই দাবি, সত্য প্রকাশ হওয়া খুবই জরুরি।

এর আগে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন পি এন ওক। সর্বোচ্চ আদালত তা খারিজ করে দেয়। ২২টি ঘর খোলার দাবিও এলাহাবাদ হাইকোর্টে বাতিল হয়ে গেছে।

ইতিহাসের শিক্ষক ও ইতিহাসবিদ সায়ন্তন দাসের বক্তব্য, তাজমহল নিয়ে যা চলছে, তা পুরো ভিত্তিহীন। তবে তাজকে আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। চেষ্টা চলছে, সুলতানি ও মুঘল ইতিহাসকে মুছে ফেলার। সমস্যা হলো, ভারতীয় ইতিহাসের এবং ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই স্থাপত্যগুলি। একে উপেক্ষা করে ভারতের ইতিহাস সম্ভব নয়। বর্তমান শাসক সেই বিষয়টি গুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।