পঞ্চগড় সীমান্তে গ্রামে কালের স্বাক্ষী হিসেবে ঠায় দাড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক জামে মসজিদ

পঞ্চগড় সীমান্তে গ্রামে কালের স্বাক্ষী হিসেবে ঠায় দাড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক জামে মসজিদ

রংপুর

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড়ঃ বিশাল এলাকা জুড়ে ছোট-বড় বাঁশঝাড়। সাথে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ ও বনজবৃক্ষ। আর পাশের ফাঁকা জমিতে নানান ফসলের ক্ষেত। ক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলে গেছে একটি গেয়ো পথ। কৃষি কাজে নিয়োজিত কিছু মানুষ এই পথটি ব্যবহার করছে। এর পাশেই ভারতের বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে বেশ বড় কয়েকটি চা বাগান। সবুজ প্রকৃতির সুনসান নিরবতায় মোহবিষ্ট করে সীমান্তের এপার-ওপার উড়ে চলা হরেক রকম পাখির কলকাকলিতে মুখরিত গোটা এলাকা। এ যেন সবুজ প্রকৃতি আর প্রতিবেশি দু’দেশের একসাথে পাশাপাশি চলার একটি ছবির মতোই দৃশ্য।

জনবসতিহীন সবুজ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এ দৃশ্যটি পঞ্চগড় সদর উপজেলার গরিনাবাড়ি ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে ওঠা দুই দশক আগে বিলুপ্ত হওয়া চান্দাপাড়া গ্রামের। গত দুই দশক আগেও গ্রামটিতে বংশ পরম্পরায় কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবিসহ বিভিন্ন পেশার প্রায় ৭০টি পরিবার বাস করতো। বিভিন্ন উৎসবে হতো নানান আয়োজন। গ্রামের সবাই ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়ায় গ্রামের ঠিক মাঝ বরাবর নির্মাণ করা হয় একটি জামে মসজিদ। স্থানীয়দের মতে, আশপাশের কয়েক গ্রামের মধ্যে এটিই প্রথম আধাপাকা মসজিদ। মসজিদটি প্রাত্যহিক নামাজের পাশাপাশি শিশুদের আরবী শিক্ষার জন্য মক্তব হিসেবেও প্রসিদ্ধ ছিল। মসজিদটি ঠিক কবে কে নির্মাণ করেছেন সে সম্পর্কে পাশ্ববর্তী এলাকার লোকজনদের কাছে সুনির্দিষ্ট তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গ্রামের কোন জনবসতি না থাকলেও এখনও কালের স্বাক্ষী হিসেবে নিজের অবস্থানেই রয়ে গেছে চান্দাপাড়ার সেই আধাপাকা জামে মসজিদটি।

ওই গ্রামে এক সময় বাস করত বয়ঃবৃদ্ধ আফাজউদ্দীন (৯০)। তিনি বলেন, ২০০০ সালের কথা। হঠাৎই সবুজ গাছপালা আর কৃষি ক্ষেতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গ্রামটি ভারতীয় গরু চোর ও ডাকাতদের রোষানলের শিকারে পরিণত হয়। সন্ধ্যা নামতেই ভারতীয় চোর-ডাকাতের দল গ্রামটিতে হানা দিত। লুটে নিয়ে যেত গ্রামের গরু, মহিষসহ সর্বস্ব। কখনও কখনও নারীদের ওপরও চালাতো বর্বরতা। ওই সময়ই জমি নিয়ে গ্রামবাসীর দ’ুপক্ষের সংঘর্ষে আব্দুস সালাম নামে এক ব্যক্তি নিহত হলে গ্রামে বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

যে কারণে স্থানীয়রা যে যার মতো পাশ্ববর্তী গ্রামে ঠাঁই খুঁজে নেয়। একই কথা জানালেন ওই গ্রাম ছেড়ে যাওয়া মানিক হোসেন ও আলেমা বেগম। তারা জানান, গ্রামটিতে বংশ পরম্পরায় তারা বেশ সুখে দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু ভারতীয় চোর-ডাকাতের অত্যাচার আর গ্রামে ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডের পর সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে পাশ্বর্তী গ্রামের সাথে লাগানো চান্দাপাড়া গ্রামের প্রান্ত সীমায় কয়েকটি পরিবার বসতি স্থাপন করলেও অধিকাংশ পরিবারই অন্যত্র চলে যাওয়ায় চান্দাপাড়া গ্রাম বলতে কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে সেই এলাকায় কোন জনবসতিই নেই।

পাশ্ববর্তী মীরগড় গ্রামের স্কুল শিক্ষক নূর আজম ও শাহাজুল ইসলাম জানান, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় কাপড় সেলাই করার জন্য একমাত্র চান্দাপাড়াতেই ইয়াছিন আলী নামের একজন দর্জি ছিলেন। পাশ্ববর্তী কয়েক গ্রামের মানুষ যেতেন সেই গ্রামে কাপড় সেলাই করতে। তিনিও তার বাবার হাত ধরে অনেক বার গেছেন সেই গ্রামে। কয়েক বছরের ব্যবধানে একসময়ের ব্যস্ত সেই চান্দাপাড়া এখন বিরানভ’মি। দেখে বুঝার উপায় নেই এক সময় এখানে গ্রাম ছিল।

গরিনাবাড়ি ইউনিয়নের চেয়রম্যান মনোয়ার হোসেন দিপু বলেন, গ্রামটিতে ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগোষ্ঠি শতবছর ধরে বাস করতো। গ্রামে থাকা মসজিদে ছোট ছেলেমেয়ের ধর্মীয় শিক্ষাদানও করা হতো। ভারতীয় চোর-ডাকাতের উপদ্রপে গ্রামের মানুষেরা অন্যত্র চলে যাওয়ায় চান্দাপাড়ায় পরিত্যক্ত থাকা শতবছরের পুরোনো মসজিদটি গ্রামের স্মৃতি ধরে রেখেছে।