DMCD

দিনাজপুরের মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক সংকটে জোড়াতালির সেবা

দিনাজপুর

দিনাজপুর সংবাদাতাঃ দিনাজপুরের বিরামপুরের বামুন্ডাগ্রামের বাসিন্দা আজিজুর রহমান ও হাসিনা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে মেহেদী হাসান। এক সপ্তাহ ধরে পেটে ব্যথা অনুভব করছিলেন মেহেদী। বাবা-মা ছেলেকে নিয়ে গত শুক্রবার যান দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দেখানো হলে মেহেদীকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। এরপর থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মেহেদী। কিন্তু ছয় দিনে তাকে চিকিৎসক দেখেছেন মাত্র ছয়বার। এরমধ্যে দুবার এক্স-রে করা হলেও চিকিৎসক ঠিকমতো না আসায় তা দেখানো সম্ভব হয়নি। একমাত্র ছেলেকে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখলেও কিছুই করার ছিল না বাবা-মায়ের।

আরও খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে নীলফামারীর ডিমলা থেকে আসা আমির হামজার। আট দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও পেয়েছেন শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকের জোড়াতালির সেবা। ক্ষুব্ধ আমির হামজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই মাস আগে আমার ডান পায়ের রক্তনালি শুকিয়ে যাওয়ায় ব্যথা শুরু হয়। তখন এই হাসপাতালে ভর্তি হই। সে সময় অপারেশন করে আমার ডান পায়ের পাঁচটি আঙুল কেটে ফেলা হয়। এরপর সুস্থ হলে বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু আমার ডান পায়ে আবার ব্যথা শুরু হলে এই হাসপাতালে ভর্তি হই। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ডাক্তারের দেখা মিলছে না। শুধু ইন্টার্ন ডাক্তাররা আমাকে সেবা দিচ্ছে। যেখানে আগে বড় ডাক্তাররা দিনে দুই বার আসতেন। এখন তো একবারও ঠিকমতো আসেন না। ইন্টার্ন ডাক্তারদের কিছু বললে তারা আমাকে বলে হাসপাতালে ডাক্তার সংকট। যারা আছে তাদের দিয়েই পুরো হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।’

শুধু মেহেদী হাসান ও আমির হামজার ক্ষেত্রেই যে এরকম ঘটনা ঘটেছে তা নয়। এই হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন আসা ছয় থেকে সাতশ’ রোগীর সঙ্গে একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কারণ তীব্র চিকিৎসক সংকট। ২০২১ সালে চিকিৎসা সেবায় দেশের দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটি। হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুমোদিত পদ রয়েছে ২০২টি। কিন্তু সেই পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬৯ জন। চিকিৎসক শূন্যতার এই হার শতকরা ৬৬ শতাংশ। এ ছাড়া ১৫০ জন ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১০৫ জন।

দিনাজপুরের মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক সংকটে জোড়াতালির সেবা

এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. আরমান হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিনাজপুর একটি বড় জেলা। হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। কেননা ঢাকা থেকে অনেক দূরের এই উত্তরাঞ্চলের জেলা। তাই শুধু এই জেলারই নয়, পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও জয়পুরহাট জেলা থেকেও রোগী এখানে আসে। কিন্তু রোগীর তুলনায় হাসপাতালে যত সংখ্যক চিকিৎসক থাকা দরকার, তা নেই। চিকিৎসক সংকটের পরও আমরা ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগীদের শতভাগ সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো হলে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হবে।’

চিকিৎসক সংকটে অস্ত্রোপচারের কাজও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ডা. মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী লিটন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের হাসপাতাল থেকে ছয়জন সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যানেসথেসিওলজিস্ট বদলি হওয়াতে আমরা সংকটে পড়েছি। গড়ে আমাদের প্রচুর অপারেশন করতে হয়। কিন্তু চিকিৎসক সংকটের ফলে ঠিকমতো অপারেশন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও যে জনবল রয়েছে, তা দিয়ে আমরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। বর্তমানে রমজান মাসে রোগীর অপারেশন কম হচ্ছে। কিন্তু ঈদের পর অপারেশন রোগীর সংখ্যা বাড়বে। তখন আমরা অনেক সংকটে পড়ে যাব। তাই এখনই চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।’

চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী শামীম হোসেন বলেন, ‘এই হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা ৫০০ হলেও প্রতিদিন গড়ে নতুন রোগী আসে ছয় থেকে সাতশ’ জন। এ ছাড়াও বহির্বিভাগের রোগী আছে। আর গড়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি অপারেশন করা হয়। তবে এই হাসপাতালে অনুমোদিত পদের সংখ্যায় অনেক কম চিকিৎসক রয়েছেন। তারপরও আমরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। কয়েক দিন আগে ১২ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টকে বদলি করা হয়। এরপর মধ্যে ৬ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ছিলেন। যার ফলে আমাদের অপারেশন করতে সমস্যা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এর বাইরেও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসক সংকট দূর করার জন্য কথা বলেছেন।’