কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে ১৮ বছরের শিকলবন্দি চায়না বেগম

কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে ১৮ বছরের শিকলবন্দি চায়না বেগম

রংপুর

মানসিক রোগী চায়না বেগমের বয়স এখন ৩৪ বছর। শিকলের আঘাতে তার পায়ে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত। ছোট্ট একটি টিনের চালাঘর। তার ভেতরে খুঁটির সঙ্গে শিকল দিয়ে পা বেঁধে রাখা, ওই চালাঘরের মেঝেতে সারা দিন শিকলে বন্দি হয়ে থাকতে হয় চায়না বেগমকে।

বিধবা মা এবং দিনমজুর ভাই সাইফুলের সংসারে বোঝা হয়ে আছেন চায়না। অভাবের তাড়নায় চায়নার ভালো কোনো চিকিৎসা দিতে পারছে না পরিবারটি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে শিকলে বন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন দুই সন্তানের জননী চায়না বেগম। ১৮ বছরেও মেলেনি ভিজিডি, ভিজিএফ, প্রতিবন্ধী ভাতা বা কোনো সরকারি অনুদান।

আজ ১৭ এপ্রিল কুড়িগ্রাম জেলার রাজিবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের জাউনিয়ারচর গড়াইমারী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে মৃত নাছির আলী ও সাহাতনের পরিবারের এমনই এক করুণ দৃশ্য।

প্রতিবেশী হাসিনা, মরিয়ম ও জয়নালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রায় ২২ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয় একই এলাকার কাচানীপাড়া গ্রামের আবেদ আলীর সঙ্গে। বিবাহিত জীবনে তিন বছরের মধ্যেই কিশোরী বয়সে দুটি কন্যাসন্তান জন্ম দেন চায়না। প্রথম সন্তান জন্মের পর থেকেই চায়নার অস্বাভাবিক আচরণ শুরু হয়। মাঝেমধ্যে স্বামীর বাড়ি থেকে এদিক-সেদিক পালিয়ে বেড়াতেন কাউকে না বলেই। ভারসাম্যহীন অবস্থাতেই দ্বিতীয় কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার পর স্বামী আবেদ আলী বিবাহবিচ্ছেদ ছাড়াই তাঁকে সরিয়ে দেন দুই সন্তানসহ। একবার পালিয়া ভারতেও গিয়েছিলেন। চায়নাকে নিয়ে পরিবারটি খুব সমস্যায় আছে। সে জন্যই তাঁকে শিকলে বেঁধে রাখে। আবেদ আলী অন্যত্র বিয়ে করে খোঁজখবর নেন না স্ত্রী-সন্তানদের। ১৮ বছর যাবৎ বিধবা বৃদ্ধ মা ও দিনমজুর ভাই সাইফুলের আশ্রয়ে কষ্টে দিন যাচ্ছে তাঁর। চায়নার দুটি কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করে বিয়ে দিয়েছে ওই পরিবার।

বৃদ্ধ মা ও ভাই পাবনা, রংপুর, উলিপুর, কুড়িগ্রাম এবং বিভিন্ন কবিরাজি চিকিৎসার জন্য ঘুরে ঘুরে সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্বপ্রায়। বৃদ্ধ মা সাহাতন বয়সের ভারে ঠিকমতো সেবাযত্ন করতে পারছে না চায়নার। না পারছেন খাবার জোগাতে, না পারছেন ভালো চিকিৎসা দিতে। তা ছাড়া সরকারি কোনো অনুদানও পায়নি পরিবারটি।

চায়নার মা সাহাতন খাতুন বলেন, ‘টেহা-পয়সা খরচ কইরা আর কুলাইতে পারছি না। সব শেষ হইয়া গেছে। সরকার যদি দয়া কইরা আমার বেটিটারে ভালো ডাক্তার দেহায় আমার বেটি ভালো হইব। মরণের আগে এইডা দেইহা যাইতে পারলে আমার শান্তি। ‘

রাজিবপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিরণ মো. ইলিয়াস বলেন, চায়নার পরিবার থেকে কেউ যোগাযোগ করলে অবশ্যই যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হবে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হাসান সাদিক মাহমুদ বলেন, ‘আমি এই উপজেলায় নতুন এসেছি। বিষয়টি আমি কয়েক দিন আগে জেনেছি এবং প্রতিবন্ধীর নতুন তালিকায় চায়না বেগমের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছি। চায়নার চিকিৎসাপত্র আনতে বলেছি। কাগজপত্র হাতে পেলে অন্যান্য সহযোগিতা করা হবে। ‘