জনপ্রিয় দিনাজপুরের পাঁপড়

দিনাজপুর

দিনাজপুর সংবাদাতাঃ মুখরোচক খাবার পাঁপড়। তা যদি হয় দিনাজপুরের, তাহলে তো কথাই নেই। দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী মুগ, খেসারি ও বেসনের তৈরি পাপড়ের কথা শুনলেই জিভে জল চলে আসে। সুস্বাদু আর মুখরোচক হওয়ায় এক সময় এর চাহিদা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে। রাজা-বাদশাদের খাদ্য তালিকায়ও ছিল এই পাঁপড়। দিনাজপুরের এই পাঁপড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় কয়েকশ বছরের ইতিহাস।

পুরোনো ঝাঁকড়া বটগাছের নিচে বসা ছোট ছোট দোকানে ভাজা হয় মুগের পাঁপড়। ওপরে ছিটিয়ে দেওয়া হয় হালকা ঝাল বিট লবণ। পুরো বছর জেলার গ্রামগঞ্জের প্রায় প্রতিটি হাটবাজারে পাঁপড় পাওয়া যায়। মেলাগুলো যেন পাঁপড়ের দোকান ছাড়া জমেই না।

দিনাজপুরে ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের কাছে বাহারি আর বিভিন্ন আকারের পাঁপড় তৈরির দৃশ্য অতিপরিচিত। কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা স্কুলের টিফিনে একটি আধুলি কিংবা ১ টাকার কয়েন দিয়ে বড় একখানা পাপড় কিনে তা অল্প অল্প করে অতি সাবধানে ভেঙে খাওয়ার দৃশ্য এখনো চোখে পড়বে। সরু সুগন্ধি চাল, লিচু আর কাটারিভোগ চালের চিড়ার পাশাপাশি দিনাজপুরের পাপড়ের চাহিদা এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রয়েছে।

দিনাজপুর শহরের চকবাজার, নতুনপাড়া, বাসুনিয়াপট্টি, চুড়িপট্টি, রাজবাড়ি, গুঞ্জাবাড়ি, ফকিরপাড়া, বড়বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় পাঁপড়। সাধারণত মসুর, ছোলা, মাসকলাই, চাল, আলু ইত্যাদির গুঁড়ো ও খামি থেকে এটি বানানো হয়। তবে দিনাজপুরের মুগ ও খেসারির ডাল এবং বেসনের পাঁপড় বেশ বিখ্যাত। সারাদেশের নিরামিষাশীদের মধ্যে মুগ ডালের পাঁপড়ের চাহিদা ব্যাপক। মূল উপাদান ডাল হলেও পাঁপড়ের স্বাদে বৈচিত্র্য আনতে খামিরের সঙ্গে জিরা, মরিচ, বাদাম কিংবা কালিজিরা মেশানো হয়।

দক্ষিণ ভারতের এই খাবার দিনাজপুরে কীভাবে প্রচলিত হলো, তা নিয়ে বিভিন্ন গল্প শোনা যায় লোকমুখে। এটাও জানা যায়, দিনাজপুরের রাজপরিবারের খাদ্য তালিকায়ও ছিল মুগের পাঁপড়। ফলে এই অঞ্চলে পাঁপড়ের ইতিহাস যে কয়েকশ বছরের পুরোনো, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

পাঁপড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা গেলেও এখন পাঁপড় মুখরোচক নাশতার অন্যতম অনুষঙ্গ। শরতের স্নিগ্ধ বিকেলে হোক বা শীতের দিন, চায়ের সঙ্গে পাঁপড় ভাজা কিংবা পাঁপড় ভেঙে দিয়ে মুড়িমাখা অথবা শুধু ভাজা পাঁপড় খাওয়া এক অন্য আবেশ তৈরি করে। দিনাজপুরের পাঁপড় এখন ঢাকাসহ সারাদেশে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সুপার স্টোরে তো বটেই, বড় মুদি দোকানেও কেজি হিসেবে বিক্রি হয় পাঁপড়।

পাঁপড় তৈরির শ্রমিক লতা রানী বলেন, সংসারের কাজের পাশাপশি প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর ধরে পাঁপড় তৈরির কাজ করি। বাড়ির কাজ শেষে দিনে দেড় থেকে ২০০ টাকার পাঁপড় ডলতে পারি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমরা যারা পাঁপড় তৈরি শ্রমিক, তাদের পাঁপড় ডলতে রোদে শুকাতে খুব কষ্ট হয়। খোলা জায়গায় পাঁপড় শুকাতে হয়। অনেক সময় ধুলাবালি, মাছি আবার বৃষ্টি হলে আমরা বিপদে পড়ি। পাঁপড় তৈরির জন্য যদি কারখানা থাকত, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো।

আরেক শ্রমিক শ্যামলী রানী বলেন, প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে পাঁপড় তৈরির কাজ করে আসছি। আগে ১০০ পাঁপড় ডললে ১০ টাকা দিতেন ব্যবসায়ীরা। এখন ১০০ পাপড় ডললে ২৫ টাকা দেন। কিন্তু তাতেও আমাদের সংসার চালাতে কষ্ট হয়। বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়তি। কিন্তু আমাদের পাঁপড় শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে না।

দিনাজপুরের চকবাজার এলাকার পাঁপড় ব্যবসায়ী দুলাল মিয়া বলেন, চকবাজার এলাকায় জেলার সবচেয়ে বেশি পাঁপড় তৈরি হয়। আমরা প্রায় ৩০ জন পাঁপড় ব্যবসায়ী সারাদেশে পাঁপড় সাপ্লাই দিয়ে থাকি। তবে আমরা বিদেশেও রপ্তানির চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দিনাজপুরে পাঁপড় তৈরির সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার। সরকারি সহযোগিতা পেলে পাঁপড় বাহিরের দেশে রপ্তানি করা সম্ভব।

কীভাবে পাপড় তৈরি হয়

পাঁপড় তৈরির মূল কাঁচামাল মুগ, খেসারি, বেসন, সয়াবিন ও পাম অয়েল। কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় তা হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন ও মুখরোচক। পাঁপড় তৈরি করা হয় উন্নতমানের চাল ও ডালের মিহি গুঁড়া কিংবা ময়দা দিয়ে। প্রথমে সমপরিমাণ মুগ ও মাসকলাই একসঙ্গে মিশিয়ে মেশিনের মাধ্যমে ভেঙে গুঁড়া করা হয়। ফুটানো পানির সঙ্গে লবণ, জিরা, কালিজিরা, গোলমরিচ গুঁড়া, দই, সোডা, হিং ও আমচুর দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা হয়।

এর সঙ্গে মুগ ও মাসকলাই ডালের মিহি গুঁড়া ও ঠান্ডা পানি মিশিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট রোলিং করে পাঁপড় তৈরির উপযুক্ত মণ্ড তৈরি করেন কারিগররা। মণ্ডটিকে লম্বালম্বি কয়েকটি ভাগে ভাগ করে সুতা দিয়ে কেটে নেওয়া হয়। গোলাকৃতির মসৃণ কাঠের পিঁড়িতে বেলোনচাপ দেওয়া হয়। এভাবে কয়েকবার এপিঠ-ওপিঠ করলে পাঁপড় তৈরি হয়। এগুলো ২০ থেকে ২৫ মিনিট কড়া রোদে ও পরবর্তী সময়ে সারাদিন হালকা রোদে শুকানো হয়।

পাঁপড়ের দাম

মুগের পাঁপড় প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা আর মাসকলাই এবং অন্যান্য ডালের পাঁপড় ১১০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকায় এর দাম কিছুটা বেশি। -ঢাকাপোষ্ট