পঞ্চগড়ে চায়ের পাশাপাশি সুপারি থেকেও অতিরিক্ত আয়ের আশা চা চাষিদের

রংপুর

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড়ঃ দেশের চা শিল্পকে আলোর পথ দেখাচ্ছে উত্তরের সমতলের ক্ষুদ্র চা বাগান। এই অঞ্চলে প্রতিবছরই বাড়ছে চা আবাদী জমির পরিমান ও চা উৎপাদন। বিগত দুই বছর ধরে চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে এই অঞ্চলটি। গত বছর পঞ্চগড়সহ উত্তরের পাঁচ জেলার সমতল ভূমিতে রেকর্ড এক কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে।

আগের মৌসূমের চেয়ে ৪২ লাখ ৪০ হাজার কেজি বেশি। যা জাতীয় উৎপাদনের ১৫ শতাংশ। এর আগে ২০২০ সালে এক কোটি ৩ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয় এই অঞ্চল থেকে। এটিও আগের বছরের চেয়ে রেকর্ড উৎপাদন ছিল। দেশজ মোট উৎপাদনের শতকরা ১২ ভাগ চা উৎপাদন করেছিল এই অঞ্চলটি। পঞ্চগড়সহ উত্তরের পাঁচ জেলায় যে হারে চায়ের আবাদ বাড়ছে এতে করে আগামি বছরগুলোতে দেশজ মোট উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করবে এই অঞ্চলটি।

এবার সমতলের চায়ের সাথে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে সুপারি গাছ। চা বাগানে ছায়া দেয়ার জন্য প্রয়োজন হয় শেড ট্রি’র। চা বাগান মালিক ও ক্ষুদ্র চা চাষিরা বাগানে ছায়া দেয়ার জন্য স্বল্পমেয়াদী বিভিন্ন বনজ গাছের চারা বাগানে রোপন করত। গত বছর থেকে অনেক বাগান মালিক নতুন চা বাগানে শেড ট্রি হিসেবে সুপারির চারা লাগানো শুরু করেছে।

বাগানে ছায়া দানের পাশাপাশি ৫/৭ বছরের মধ্যে এই গাছ থেকে পাওয়া যাবে সুপারি। চায়ের পাশাপাশি সুপারি থেকে অতিরিক্ত লাভের আমায় নতুন বাগান করছে এমন অনেকেই সুপারি চারা রোপন করছেন। তুলনামূলক উঁচু জমিতে চায়ের চাষ হয়। চায়ের জমিতে বর্ষাকালেও পানি জমে থাকে না। এ অবস্থায় চা বাগানে শেড ট্রি হিসেবে সুপারি গাছ অনেক লাভবান এমনটি জানিয়েছেন চা চাষিরা।

এ নিয়ে কথা হয় পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের প্রধানপাড়া গ্রামের চা চাষি আবু হাসান সাঈদ অনুপমের সাথে। তিনি জানালেন, তার ৩ একর চা বাগানে তিনি চারশ’ সুপারির চারা রোপন করেছেন দুই বছর আগে। আগামি ৪/৫ বছরের মধ্যে তিনি সুপারির ফলন পাবেন। প্রতিটি গাছে ফল আসলে চারশ’ গাছ থেকে তিনি বছরে অতিরিক্ত আয় করবেন ৮/১০ লাখ টাকা।

অনুপম বলেন, আমি আগে শেড ট্রি হিসেবে কড়ই ও নিম গাছ লাগিয়েছিলাম। লাগানো কয়েক বছর পর গাছ কেটে ফেলার পর তা লাকড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এসব গাছ। এখন সুপারির গাছ লাগানোর পর ৫/৭ বছর পর থেকে একশ বছর পর্যন্ত চায়ের পাশাপাশি আমি সুপারি থেকে আয় করতে পারবো।

বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুল হক খোকন বলেন, পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোতে সমতল ভূমির চা চাষ ইতোমধ্যে দেশে চা উৎপাদনে আশার আলো দেখাচ্ছে। চা পাতার ন্যায্য মূল্য, সুলভে সেচ সুবিধা ও সার সরবরাহ নিশ্চিত হলে দিন দিন চায়ের চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, এতদিন চা বাগানে শেড ট্রি হিসেবে কড়ই, নিমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা লাগানো হত। এখন চা চাষিরা অতিরিক্ত লাভের আশায় চা বাগানে সুপারির চারা লাগানো শুরু করেছেন। বাগানে ছায়া দেয়ার পাশাপাশি বাগান মালিকরা অনেক বছর ধরে সুপারি থেকে অতিরিক্ত আয় করতে পারবে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, চা বাগানকে লাল মাকড়সহ বিভিন্ন ধরণের পোকার আক্রমন থেকে রক্ষা এবং খড়া, শীত ও শীলার কবল থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা বাগানে ২০ ফুট অন্তর কড়ই জাতীয় গাছ লাগানোর পরামর্শ দেই।

বিগত কয়েক বছর থেকে দেখা যাচ্ছে পঞ্চগড়ের নতুন চা বাগান মালিকরা অধিক লাভের আশায় বাগানে শেড ট্রি হিসেবে সুপারি গাছ লাগাচ্ছেন। সুপারি গাছ খুব তাড়তাড়ি উঁচু হয়ে যাওয়ায় বেশি বছর বাগানে ছায়া দিতে পারে না। চা চাষিরা অধিক লাভের আশায় চা বাগানে সুপারির গাছ লাগানোতে আমরা বাধাও দিচ্ছি না। কারণ এই গাছ থেকে তারা আগামিতে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করতে পারবে।