শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত, আন্দোলনে অযাচিত হামলা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত, আন্দোলনে অযাচিত হামলা

জাতীয়

গণপরিবহনে হাফ পাস ভাড়া বাস্তবায়নের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে সারা দেশে গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে এ কর্মসূচি। এরপর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাফ পাসের দাবি মেনে নেওয়ার সময় বেধে দেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘হাফ পাস আমার অধিকার, নয় কোনো আবদার’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় নিউমার্কেট সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। গণপরিবহণ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যস্থলে যাওয়া শুরু করে।

শিক্ষার্থীদের চলমান এই আন্দোলনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে নীলক্ষেত যাওয়ার সময় ঢাকা কলেজের উল্টো দিকের পেট্রল পাম্পের সামনে তাঁদের ওপর হামলা করা হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ এই হামলা করেছে।

তবে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হামলার ঘটনাকে অস্বীকার করা হয়েছে। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের ভাষ্য, ‘এই ঘটনায় ছাত্রলীগের কেউ জড়িত নয়। বরং আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অতি উৎসাহী হয়ে ঢাকা কলেজের এক ছাত্রের ওপর হামলা চালিয়েছে। তার মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছে।’

এ বিষয়ে আন্দোলনরত একজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ‘আমরা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখন টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সামনে মোটরসাইকেলের সঙ্গে এক ব্যক্তিগত গাড়ির ধাক্কা লাগে। ওই গাড়ির যাত্রী এক নারীর সঙ্গে মোটরসাইকেলের যুবকটি তর্ক করছিল। আমাদের মিছিল যেহেতু এখান দিয়ে যাবে তাই আমরা কয়েকজন তাদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরানোর চেষ্টা করি। এর একপর্যায়ে ওই যুবকের সঙ্গে আইডিয়াল কলেজের কয়েকজন ছাত্রের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যে ওই যুবক আরো কয়েক জনকে নিয়ে আসে। সেখান থেকে ঘটনা বড় হয়ে যায়।’ এই শিক্ষার্থীর দাবি, তাঁরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী না হলে এত দ্রুত লাঠিসোঁটা নিয়ে আসতে পারত না।

সূত্র জানায়,মঙ্গলবার রাজধানীর নীলক্ষেত ও সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ ও ধানম-ি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা। সায়েন্স ল্যাব মোড়ের অবস্থান শেষে ছাত্রদের একটি মিছিল নীলক্ষেত ঘুরে সায়েন্স ল্যাবে এসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মিছিল ঢাকা কলেজের উল্টো পাশে পৌঁছলে লাঠি, গাছের ঢাল নিয়ে একদল তরুণ তাঁদের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের কয়েকজন হেলমেট পরা ছিল। হামলায় শিক্ষার্থীদের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এতে কয়েকজন আহত হন। হামলাকারীদের দুজন একজন ছাত্রকে ধরে নিয়ে মারধর করে। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে করা সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনেও এই জায়গায় ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটে। তখনো হামলাকারী অনেককে হেলমেট পরে থাকতে দেখা যায়।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে শনিবার। ওইদিন বাসে অর্ধেক ভাড়া দেয়ায় বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীকে প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকি দেয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে রোববার বকশীবাজারে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় নয়টি দাবিসহ অভিযুক্তকে গ্রেফতারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়া হয়। পরে ঠিকানা পরিবহনের ওই চালক ও হেলপারকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

এ ঘটনার পর গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণ, ছাত্রীদের যৌন হয়রানি বন্ধসহ নিরাপদ সড়কের দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেন সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে কলেজের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন করেছেন। গতকাল দুপুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গণপরিবহনে হাফ পাস, যাত্রী হয়রানি বন্ধসহ পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এ কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচি থেকে গণপরিবহনে সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা, যাত্রাপথে চেক ও ওয়েবিল বাতিল, বিআরটিএর আইন মেনে গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বন্ধ এবং পরিবহনে শিক্ষার্থী ও যাত্রী হয়রানি বন্ধ করার দাবি জানানো হয়।

শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে উল্লেখ করে মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, দেশের মানুষ এখন সড়ক পরিবহনের নৈরাজ্যে নাকাল। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেয়া হচ্ছে না। আমরা এর দ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। এ সময় শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গণপরিবহনের চলমান সমস্যা সমাধানের দাবি জানান। না হলে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের একত্র করে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানান তারা।

জানা যায়, হাফ ভাড়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরাও। মঙ্গলবার নগরের ষোলশহর দুই নম্বর গেট মোড়ে ‘গণপরিবহনে হাফ ভাড়া চাই, চট্টগ্রাম’ ব্যানারে হাফ ভাড়াসহ পাঁচ দফা দাবিতে সমাবেশ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সেখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল জিইসি মোড়ে এসে শেষ হয়।

সমাবেশে শিক্ষার্থীরা বলেন, গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের’ ৯ দফায় ছিল। সে সময় সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সেটি মেনে নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন করেননি। উল্টো জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ঘাড়েও বাড়তি ভাড়া চাপিয়ে দিয়েছেন। তাই গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।

এদিকে গণপরিবহণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ‘অর্ধেক ভাড়া’ নিশ্চিত করা এবং তাদের সঙ্গে ‘অমানবিক আচরণ’ বন্ধ করার দাবিতে রামপুরা ব্রিজ এলাকায় মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে অবিলম্বে সড়ক পরিবহণ আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ ছাত্র ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য অর্ধেক ভাড়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানায় সংগঠনটি।

মানববন্ধন শেষে সমাবেশে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, দেড়শ বছর আগে করা ব্রিটিশ আমলের রেল আইনে প্রতিবন্ধীদের হাফ ভাড়ার বিধান রাখা হয়েছে এবং এখনও তা মানা হচ্ছে। অথচ বাসে সেটি কার্যকর করা হয়নি।