ক্লিন ফিড ইস্যুতে সরকার ও কোয়াবের অবস্থান বিপরীতমুখী

ক্লিন ফিড ইস্যুতে সরকার ও কোয়াবের অবস্থান বিপরীতমুখী

জাতীয়

একেকটি টেলিভিশন চ্যানেলে যা সম্প্রচার করা হয়, সাধারণত তাকে ফিড বলা হয়। ফিডের মূল কন্টেন্টের সঙ্গে আবার অতিরিক্ত টেক্সট, ছবি, ব্যাকগ্রাউন্ড বা বিজ্ঞাপন ভিডিও সম্প্রচার করা হয়, তা-ও এই ফিডের অন্তর্ভুক্ত; যা সাধারণত বাণিজ্যিক উদ্দেশে করা হয়। এক্ষেত্রেই প্রশ্ন আসে ক্লিন ফিডের। অর্থাৎ ক্ষেত্র বিশেষে বিজ্ঞাপনমুক্ত কন্টেন্ট সম্প্রচার। দেশের বাজারে চ্যানেলগুলোর এই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সুযোগ আছে বটে। কিন্তু বিদেশে? নীতিমালা আছে, চ্যানেলগুলো বিদেশে সম্প্রচার হবে বিজ্ঞাপন ছাড়া বা ‘ফিড ক্লিন’ হয়ে। এ ক্ষেত্রে আবার প্রশ্ন আসতে পারে, বিদেশের বাজারে সম্প্রচার হলে এই ফিড ক্লিন করবেটা কে? ফিড ক্লিন নিশ্চিত হয় কীভাবে?

বিদেশি চ্যানেলগুলো এই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য এতদিন ধরে হাসিল করে আসছিল বাংলাদেশে। এ নিয়ে অনেকদিন ধরে কথাও হচ্ছিল। অবশেষে শুক্রবার থেকে ক্লিন ফিড বিহীন সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ক্লিন ফিড বা বিজ্ঞাপনমুক্ত ছাড়া বিদেশি চ্যানেল চালাতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করার বিষয়ে নেওয়া সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে ক্যাবল অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন দেখানো বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ রাখা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে সরকার ও কেব্ল অপারেটররা। সরকার বলছে, বিজ্ঞাপন ছাড়া (ক্লিন ফিড) বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারের দায়িত্ব কেব্ল অপারেটর ও ডিস্ট্রিবিউটরদের। কেননা সরকার কোনো চ্যানেল বন্ধ করেনি। এরাই সম্প্রচার বন্ধ রেখেছে।

অন্যদিকে কেব্ল অপারেটররা বলছেন, সরকারের নির্দেশনার কারণে বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ রাখা হয়েছে। কেননা বিদেশি চ্যানেলের বিজ্ঞাপন বাদ দিয়ে সম্প্রচার করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং চ্যানেল সম্প্রচারের বিষয়ে সরকারকেই করণীয় জানাতে হবে। এদিকে দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো বলছে এটি সহজ একটি কাজ। দেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার চলে। ধরা যাক ভারতের কোনও টিভি চ্যানেলে একটি অনুষ্ঠান বা সিরিয়াল প্রচার হবে। ওই সিরিয়াল এয়ারিংয়ের সময় যে জায়গাগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচার হয় সেসব জায়গায় প্রমোশনাল চালাতে পারে। ট্রান্সমিশনের সময় এটা করা যেতে পারে। এটা সংশ্লিষ্ট চ্যানেল কর্তৃপক্ষই করতে পারে। এতে হয়তো আমাদের দেশের দর্শকরা আধ ঘণ্টা পরে অনুষ্ঠানটা দেখতে পারবে। তবে ক্লিন ফিড সম্ভব নয় কথাটা ঠিক নয়। ওই টিভি কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে অনেক পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার হয় যার মধ্যে অনেকগুলো এ দেশে পাওয়া যায়। ওই বিজ্ঞাপন প্রচারের ফলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানিকারক বা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত (মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠান) পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। এতে দেশীয় চ্যানেলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় বিজ্ঞাপনের বাজার বড় হচ্ছে না। আমাদের বিজ্ঞাপনের বাজার দেড় হাজার কোটি টাকার কিছু বেশিতে আটকে আছে। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে তা সর্বোপরি দেশের জন্যই ভালো।

কিন্তু কোয়াবের কণ্ঠে ভিন্ন সুর। কোয়াব সভাপতি আনোয়ার পারভেজের ভাষ্য, ‘আমরা ক্লিন ফিড চালাতে পারবো না। তাই ক্যাবল টিভির সম্প্রচার বন্ধ রেখেছি। যতদিন বিষয়টির সুরাহা না হচ্ছে ততদিন সম্প্রচার বন্ধ থাকবে।’ কিন্তু দেখা যায় ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো খেলা লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে, তাতে আমাদের স্থানীয় বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। এক্ষেতে ক্লিন ফিড নিয়ে কোন ঝামেলা নেই। কোয়াব সভাপতি এই ব্যাপারটি খ-ন করতে যুক্তি দেন, ‘একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান খেলার প্রোডাকশন তৈরি করে। সেই প্রোডাকশন তারা বিভিন্ন দেশের স্বত্বপ্রাপ্তদের দেয়। ফলে এটি সম্ভব হয়।‘ সরকার ও কেব্ল অপারেটরদের এই মুখোমুখি অবস্থানে বিপাকে পড়েছেন দেশের টেলিভিশন দর্শকেরা। তাঁরা গত শুক্রবার থেকে পছন্দের কোনো বিদেশি চ্যানেল দেখতে পারছেন না। সরকারের নীতির বাইরে গিয়ে কিছু হোক, সেটা অবশ্য সাধারণ মানুষ কেউ চান না। তবে তারা বিদেশি চ্যানেল দেখার সুযোগ চান। এ ক্ষেত্রে অনেকের ভাষ্য, আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে দেশের মানুষকে বিদেশি চ্যানেল দেখা থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কোনো পক্ষেরই নেই।

তবে বাংলাদেশে একমাত্র ডিটিএইচ সংযোগকারী আকাশ ডিটিএইচ সংবাদভিত্তিক কয়েকটি বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার করছে। এই সংযোগ যেসব গ্রাহকের বাসায় আছে তাঁরা বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা, এনএইচকে, ফ্রান্স টিভি দেখতে পাচ্ছেন।

আকাশ ডিটিএইচের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, এই চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দেখায় না। এ কারণে সম্প্রচার অব্যাহত রাখা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে এই আইন হয়েছে। তবে অপারেটরদের বিজ্ঞাপন ছাড়া চ্যানেল সম্প্রচারের ব্যবস্থা করতে প্রায় দুই বছর সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অন্যদিকে, অপারেটররা এই আইন বাতিল করার কথা বলছেন। শনিবার বনানীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে কেব্ল অপারেটরদের সংগঠনের (কোয়াব) নেতারা বলেছেন, এখন এই আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে মানুষ টেলিভিশন-বিমুখ হবে। এই জায়গা ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদন মাধ্যমগুলো দখলে নিয়ে যাবে। তাঁরা বলেছেন, চ্যানেল অপারেটিং পদ্ধতি ডিজিটালাইজড (সেট টপ বক্সের মাধ্যমে সম্প্রচার) না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখাই ভালো।

সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, সরকার কোনো চ্যানেল বন্ধ করেনি। সরকার বলেছে, বিজ্ঞাপনহীনভাবে চ্যানেল সম্প্রচার করতে। এটা কেব্ল অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটরদের দায়িত্ব। তিনি বলেছেন, কেউ যদি দর্শককে জিম্মি করার জন্য বিজ্ঞাপন নেই এমন বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ রাখে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিদেশি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপনসহ সম্প্রচার করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশ প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণে আমরা এ পদক্ষেপ নিয়েছি। কোয়াবের প্রধানের ভাষ্য, সারা দেশে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি কেব্ল অপারেটর রয়েছেন। বেশির ভাগ অপারেটরের সংযোগসংখ্যা ১৫০-২০০ বা ২৫০-৩০০। চ্যানেল ক্লিন ফিড করে চালানো কেব্ল অপারেটরদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রায় ৫ লাখ মানুষ এ খাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। সরকারকে এই দিকটাও বিবেচনা করা দরকার। একসময় বিদেশি চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার মতে, চ্যানেলের দুটি অংশ থাকে। একটি আপলিংক, অন্যদিকে ডাউনলিংক। চ্যানেলের মালিক বা ব্রডকাস্টার তাঁদের চ্যানেল স্যাটেলাইটে আপলিংক করেন। আর কেব্ল অপারেটররা স্যাটেলাইট থেকে তা ডাউনলিংক করেন। এর মাঝামাঝি আর কিছু নেই। বাংলাদেশের অপারেটররা সব চ্যানেল ডাউনলিংক করে যখন প্রচার তখনই সম্প্রচার (রিয়েল টাইম) করে। বিজ্ঞাপনমুক্ত করে রিয়েল টাইমে চ্যানেল সম্প্রচার করা যায় না। চ্যানেল ক্লিন ফিড করে পরে সম্প্রচার করা কেব্ল অপারেটরদের জন্য ব্যয়বহুল একটি বিষয়। এ কারণে তাঁরা এটা করতে চান না। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকার বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘সরকার হয়তো আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু চ্যানেল ক্লিন ফিড করে দেওয়াটা আমি যতটুকু বুঝি সরকারের কাজ নয়। অন্যান্য দেশেও এমনটাই হয়।’ এদিকে সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো), বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)। শনিবার এ নিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন বিএফইউজের সভাপতি মোল্লা জালাল, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আবদুল মজিদ এবং ডিইউজে সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান।
উল্লেখ্য, ক্লিন ফিড বা বিজ্ঞাপন ছাড়া বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার হবে, এটা নতুন কোনো ধারণা নয়। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপালেও ক্লিন ফিড বা বিজ্ঞাপন ছাড়া বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার হয়। ইউরোপ-আমেরিকাতেও এটি আছে আরও আগে থেকে।