মিয়ানমার সীমান্তে বাড়ছে ‘আইস’ চোরাচালান

মিয়ানমার সীমান্তে বাড়ছে ‘আইস’ চোরাচালান

জাতীয়

চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে ৫টির জেলার সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত রয়েছে ভারতের আর দু’টি জেলার সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমারের। ভারত থেকে ফেনসিডিল আর মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার হয়ে আসে বাংলাদেশে।

জানা যায়, কক্সবাজার ও বান্দরবানের ২৭২ কিলোমিটার সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে বানের জলের মতো দেশে ঢুকছে ইয়াবা। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমান্ত এলাকার ৩৭টি কারখানায় তৈরি ইয়াবা ‘পূঁজি ছাড়াই’ অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে বাংলাদেশে। এটি পাচারে রাতারাতি বড়লোক হবার ‘টোপে’ ব্যবহার হচ্ছে নিরীহ সব মানুষ। কৌশলে বাড়ানো হচ্ছে সেবনকারীও।

আশির দশক থেকেই বৃহত্তর চট্টগ্রাম মূলত বাংলাদেশে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রথমদিকে কুমিল্লা ও ফেনী সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসে হেরোইন। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার অভিযানের মুখে হেরোইন আসা কিছুটা কমলেও শুরু হয় ফেনসিডিল পাচার।

দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও এ রুট দিয়ে মাদক পাচার বন্ধ করা যায়নি। আর ২০০৭ সালের দিকে কক্সবাজার টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িয়ে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ ঘটে ইয়াবার।

দেশে মাদকের ক্ষেত্রে ইয়াবার চেয়েও এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, যে পথে দেশে ইয়াবার চালান ঢুকছে, সেই একই পথেই ঢুকছে আইস। ভয়ংকর এই মাদকও দেশে আসছে মিয়ানমার থেকে। এখন পর্যন্ত এই মাদকের বাজার ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক।

সাম্প্রতিক সময়ে ধরা পড়া ১১টি আইসের চালান বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এসব চালান এসেছে মিয়ানমার থেকে। এর মধ্যে ১০টি চালান ধরা পড়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। একটি চালান ধরা পড়েছে পিরোজপুরে। এই মাদক চোরাচালান ঠেকানো না গেলে ইয়াবার মতো আইসও সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র থেকে জানা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ নগরকেন্দ্রিক আইস সেবনকারী একটা শ্রেণি তৈরি হয়েছে। আইসের বহুবিধ ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই মাদক সরাসরি সেবন করা যায়। আবার এটি ইয়াবা তৈরিরও মূল উপাদান। ইয়াবায় ৫ শতাংশ আইস থাকে। সরাসরি আইস সেবনে ইয়াবার চেয়ে ২০ গুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আবার অন্যান্য মাদকের সঙ্গে মিশিয়েও আইস সেবন করা হয়।

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ছাড়াও বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় বিস্তৃত সীমান্ত রয়েছে। কক্সবাজারের ৩৪ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানায়, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে সংবাদ রয়েছে, আইস মিয়ানমার থেকে আসছে। বিজিবির প্যাট্রোল টিমগুলোকেও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ইয়াবার বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হয়, আইসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যসেবা দাতা সংস্থা হেলথ ডাইরেক্ট অস্ট্রেলিয়ার তথ্যমতে, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ খুবই ভয়ংকর মাদক। অ্যামফিটামিন গোত্রের এই মাদক দেখতে স্বচ্ছ কাচের (ক্রিস্টাল) মতো। এই মাদক সেবনে নিদ্রাহীনতা, স্মৃতি বিভ্রম, মস্তিষ্কবিকৃতিসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে এই মাদক সেবনে ওজন হারানো, কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা এবং বিষণœতা ও স্ট্রোকের মতো বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
ডিএনসি ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০ আগস্ট আইস সেবন ও বিক্রির অভিযোগে রাজধানীর বনানী, উত্তরা, বনশ্রী ও খিলগাঁও থেকে ১০ জনকে ৫০০ গ্রাম আইসসহ গ্রেপ্তার করা করেছে ডিএনসি। ১৭ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ী থেকে আধা কেজি আইস, ৬৩ হাজার ইয়াবাসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। দুটি চালানে উদ্ধার হওয়া আইস মিয়ানমার থেকে দেশে এসেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তারের ভাষ্য, ‘বিশ্বে আইস পুরোনো মাদক। এটি বাংলাদেশে এতদিন ছিল না। হঠাৎ করে দেশে এর ব্যবহার কেন বেড়ে যাচ্ছে, এ বিষয়ে নজরদারি শুরু হয়েছে। আইস দিয়ে গোপনে ইয়াবা বানানো হচ্ছে নাকি সরাসরি আইস মাদক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসাবারেও এর ব্যবহার হতে পারে। মিয়ানমারে আইস ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হয়।

‘তিনি আরও বলেন, ‘এ দেশে আইস প্রথমে আসছিল মালয়েশিয়া থেকে, পরে আফ্রিকা থেকে। এখন মিয়ানমার থেকে আসছে। এটা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। ব্যাপকসংখ্যক মানুষ আসক্ত হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ল্যাব স্থাপন করে আইস দিয়ে পরীক্ষামূলক নতুন ধরনের মাদক তৈরির চেষ্টাও করেছিল এক তরুণ। হাসিব বিন মোয়াম্মার রশিদ নামের ওই তরুণকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গ্রেপ্তার করে। এরপর জানা যায়, এই কাজে নাইজেরিয়ার এক নাগরিক তাঁকে সহায়তা করছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের প্রফেসর ড. ইমাম আলী মনে করেন, ‘মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং ভারতকে একত্র হতে হবে জিরো টলারেন্সের ভিত্তিতে। আর বাংলাদেশ সরকারকে আরও শক্ত হতে হবে এই কারণে যে, বাংলাদেশ যেন মাদক পাচারের একটা ট্রানজিট না হয়।’

কিন্তু হাজারো সতর্কতার পরও মাদক চোরাচালান থামানো সম্ভব হচ্ছে না। করোনাকালে বিভিন্ন কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও মাদক চোরাচালান কমেনি, বরং বেড়েছে। জরুরি পণ্য পরিবহনের ট্রাক, লাশবাহী গাড়ি, তেলের লরি, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এসব মাদক পরিবহনের সময় ধরাও পড়েছে। ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৩ কোটি ৮৪ লাখের মতো ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এর আগের বছর ২০১৯ সালে উদ্ধার করা হয়েছিল ৩ কোটি ৪৪ লাখ ইয়াবা।

কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মূলত মিয়ানমার থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে এ দেশে ইয়াবা আসে। অনেক দিন ধরেই ইয়াবার বিস্তার সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন নতুন করে আসছে আরও ভয়ংকর মাদক আইস। এটি এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আরও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

মাদকবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে মাদক ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি বহুলাংশে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা মাদক পাচারে বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এ কারণে মাদক চোরাচালান রোধে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা কার্যক্রম তদারকি জোরদার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইন্টারপোল এবং জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর-ইউএনওডিসির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

মিয়ানমার সীমান্তে মাদক চোরাচালানের এই অপতৎপরতায় বাংলাদেশ সরকারও বেশ উদ্বিগ্ন। এই অপতৎপরতা বন্ধে কঠোর হওয়ার সিধান্ত নিয়েছে সরকার। মিয়ানমার থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচার রোধে প্রয়োজনে সীমান্তে গুলি চালানো হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন।

তিনি বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তে গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু অবৈধ কর্মকা- বন্ধে এখন থেকে গুলি চালানো হবে। তাহলেই মানব, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ হবে।

মঙ্গলবার এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভারত সরকারের উপহারের অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে সকল ধরনের চোরাচালান বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে।

উল্লেখ্য, অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে বক্তব্য রাখেন আবদুল মোমেন। এর আগে সকালে বিমানে সিলেট আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম দ্বোরাইস্বামীসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।