বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

জাতীয়

বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে এলএনজি দাম। এমন অস্থিতিশীলতায় বর্তমানে দেশে এলএনজির সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আর ঘাটতির এমন ধারা অব্যাহত থাকলে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন গ্যাসভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেও অলস বসিয়ে রাখতে হতে পারে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার বিপরীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের মাত্রা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বেসরকারি খাতের এলএনজিভিত্তিক ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে নির্মাণ হচ্ছে। ইতিমধ্যে সামিট পাওয়ার, ইউনিক গ্রুপ ও ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপের মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নির্মাণ কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। আগামী বছরেই ওই ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার কথা। তবে এ মুহূর্তে এলএনজির চলমান সংকট দুশ্চিন্তর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির মূল্য কবে স্থিতিশীল পর্যায়ে আসবে তার কোনো তথ্য কেউই দিতে পারছে না। বরং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় অদূর ভবিষ্যতে তা আরো প্রকট হয়ে উাার আভাস দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যথাসময়ে উৎপাদন যাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে সামিট পাওয়ার সামিট মেঘনাঘাট-২ নামে ৫৮৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। আগামী বছরের মার্চে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনে আসার লক্ষ্য রয়েছে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির গ্যাস টারবাইন স্থাপনসহ নানা প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। তাছাড়া ইউনিক গ্রুপ ৫৮৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার নামের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজ ইতিমধ্যে ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী বছরের নভেম্বরে ওই কেন্দ্রটির উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটিতে ৪ হাজার ৭৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ৪টি ব্যাংক ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থায়ন করছে। তাছাড়া এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিগত ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিপিডিবির সঙ্গে নির্মাণ ও ক্রয় চুক্তি করে ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্স। আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে রিলায়েন্স মেঘনাঘাট ৭৫০ মেগাওয়াট আইপিপি-২ নামে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। তার বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিডিবি এলএনজিভিত্তিক আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। চট্টগ্রামের রাউজানে নির্মাণাধীন ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা হবে ৪৫০ মেগাওয়াট। এলএনজিনির্ভর ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, এলএনজিভিত্তিক ৩টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন উৎপাদনে জন্য অপেক্ষমাণ তখন বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী। দেশে গ্যাসের সংকট প্রকট হয়ে ওঠায় এমনিতেই এখন স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় ওই সংকট আরো প্রকট হয়ে ওঠার জোর আশঙ্কা রয়েছে। এমন অবস্থায় আগামী বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা হলে সেগুলোয় গ্যাস সরবরাহ করা যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ করা না গেলেও বিদ্যুৎ বিভাগকে চুক্তি অনুযায়ী সেগুলোর সক্ষমতা বাবদ বিপুল অংকের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, উৎপাদনক্ষম হয়ে ওঠা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য যথাসময়ে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। ওই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গ্যাস আমদানির চুক্তিও করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সহজ নয়। গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো দেশে বিদ্যমান গ্যাসের সংকট সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। বিদ্যমান সংকট কাটাতে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি ছাড়া বিকল্প পথ খোলা নেই। তাছাড়া দেশে গ্যাস সরবরাহের বিদ্যমান অবকাঠামোও সীমিত। এমন অবস্থায় নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে গেলে তা কেবল বিপদই বাড়াবে। গ্যাস যদি আমদানিও করা হয় বিদ্যমান অবকাঠামোয় তা খুব বেশি সুফল দেবে না।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ ইতিমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে সক্ষমতার চার্জ বাবদ ৭০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। আবার গ্যাস সরবরাহ করা না গেলে বেসরকারি খাতের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে পিডিবি শঙ্কায় রয়েছে। গ্যাস সংকটে ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো না গেলে বোঝা কেবলই বাড়বে। বেসরকারি খাতের এলএনজিভিত্তিক ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৮৫ মেগাওয়াট। তবে ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ পেতে কেন্দ্রগুলোর জন্য দৈনিক ১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। বর্তমানে দৈনিক যে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে সেখানে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংকট রয়েছে। নতুন করে আরো ১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস কীভাবে সরবরাহ পাওয়া যাবে সে বিষয়ে সদুত্তর নেই। তবে দেশে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গত দুই মাসে ৩টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে বলে জানা যায়।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুতের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন জানান, আগামীতে গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসছে সেখানে প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন হবে। ওসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করতে সরকার এলএনজি আমদানির চুক্তি করছে। সামিটের সঙ্গেও এলএনজি আমদানিতে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে তা মূলত দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যমান গ্যাসের ঘাটতির বিষয়টি মাথায় রেখেই করা হয়েছে।
আর সার্বিক বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিসুর রহমান জানান, আগামী ২০২২-২৩ সালে গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাবে সেগুলোর জ্বালানি নিশ্চিত করতে মূলত এলএনজি সমঝোতা চুক্তি করা হচ্ছে। চুক্তি হওয়া দেশগুলো থেকে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।