লন্ডনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি স্কুলশিক্ষকে হত্যা

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সাবিনার হত্যাকাণ্ড ঘিরে যুক্তরাজ্যজুড়ে ক্ষোভ, বিতর্ক

আন্তর্জাতিক

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এক স্কুল শিক্ষকের হত্যাকাণ্ড যুক্তরাজ্যজুড়ে নারীর নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং মিডিয়া কভারেজ ও শ্বেতাঙ্গ-সংখ্যালঘু বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

গত সপ্তাহে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের এক পার্কের ভেতর ২৮ বছর বয়সী সাবিনা নেসার মৃতদেহ মেলে। এর আগে মার্চে লন্ডনের একটি পার্কে একইরকমভাবে সারা এভারার্ড নামে আরেক নারীর মৃতদেহ মিলেছিল।

কয়েক মাসের ব্যবধানে কাছকাছি ধরনের দুটি হত্যাকাণ্ড শহরটির নারীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে; পাশপাশি শ্বেতাঙ্গ সারা এভারার্ডের ঘটনা গণমাধ্যমের মনোযোগ যতখানি পেয়েছিল, প্রথম দিকে সাবিনার ঘটনা তেমনটা না পাওয়ায় চলছে নানামুখী বিতর্কও।

সাবিনা হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহখানেক পর পুলিশ এক সন্দেহভাজনকে আটক করেছে বলে রোববার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

ব্রিটিশ এ সংবাদমাধ্যমটি জানায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় বিকালে এক ব্যক্তি পার্কের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সাবিনার লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।

যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমগুলোতে এ খবর প্রকাশিত হয় সোমবার, তাও হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকায়, ভেতরের পাতায় ছোট করে। খবরের সঙ্গে পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া একটি ছবি, যাতে সাবিনাকে দেখা যাচ্ছে কালো গ্রাজুয়েশন গাউন পরে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিতে।

২৮ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পড়াশোনা করেছেন গ্রিনিচ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায়।

পড়াতেন দক্ষিণ লন্ডনের এক স্কুলে। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাবিনাকে অ্যাখ্যা দিয়েছেন ‘মেধাবী, দয়ালু ও নিবেদিতপ্রাণ’ শিক্ষক হিসেবে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, সাবিনাকে সম্ভবত শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর হত্যাকারী তার লাশটি ফেলে রেখেছিল পার্কে ঝোপঝাড়-ঘাসের আড়ালে, পরদিন বিকালে পার্কের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক ব্যক্তির নজরে আসার আগ পর্যন্ত সেটি সেখানেই পড়ে ছিল।

সাবিনা শুক্রবার সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পার্কের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে খুব কাছেই এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। পুলিশের ধারণা, বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ পরে একটি সিসিটিভি ফুটেজও প্রকাশ করে, যাতে মাথায় চুল নেই এমন একজনকে হাতে কিছু একটা নিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে। তার পরণে ছিল ধূসর রঙের জিন্স ও কালো জ্যাকেট। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাকে মাথায় হুড টেনে দিতে দেখা যায়।

ফুটেজে থাকা এই ব্যক্তিই আটক হয়েছেন কিনা, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি স্কুল শিক্ষক সাবিনার হত্যাকাণ্ড লন্ডনের মতো একটি শহরে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

“পুলিশ বলছে, সাবিনা এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ঘর থেকে বেরিয়ে স্থানীয় একটি পাবের দিকে যাচ্ছিল, পাবটির দূরত্ব ছিল তার ঘর থেকে ৫ মিনিট। আমরাও ওই পাবে নিয়মিত যাই, ৫ থেকে ১০ মিনিট লাগে। আপনার মনে হতেই পারে, সাবিনা না হয়ে আপনিওতো হতে পারতেন। এমন ঘটনা যে কোনো জায়গায়, যে কারও সঙ্গে ঘটতে পারে,” সিএনএনকে এমনটাই বলেছেন কিডব্রুকের বাসিন্দা আলিয়া ইসায়েভা।

আলিয়া ও তার বন্ধু সুয়েদা সিফতি জানান, তারা সপ্তাহে অন্ততু একবার ওই পার্কটিতে যান, যেখানে সাবিনার মৃতদেহ মিলেছিল।

“থাকার জন্য এই জায়গাটিকে (কিডব্রুক) বেছে নিয়েছিলাম আমরা, কারণ এখানে অনেক পার্ক। চমৎকার পারিবারিক এলাকা,” বলেন সিফতি।

সাবিনার খুনের ঘটনা কিডব্রুকের বাসিন্দাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। সপ্তাহজুড়ে ওই পার্কটিতে মানুষজন ফুল রেখে গেছে, আলো জ্বালিয়ে স্মরণ করেছে ক্ষণজন্মা এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি স্কুল শিক্ষককে।

পার্কটির কাছেই শুক্রবার সন্ধ্যায় এক প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন শত শত নারী-পুরুষ। তারা সেখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে সাবিনার প্রতি শ্রদ্ধা জানান; হত্যাকাণ্ডের বিচার ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অবসানে কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন।

সমাবেশে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সাবিনার বোন জেবিনা ইয়াসমিন।

“আমাদের অনুভূতি এখন কী, তা কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে পারবো না। মনে হচ্ছে আমরা একটা দুঃস্বপ্নের ঘোরে আটকে আছি। কোনো পরিবারকে যেন এরকম ঘটনার শিকার হতে না হয়,” বলেন জেবিনা।

লন্ডনের মতো শহরেও ঘরের বাইরে নারীদের কীভাবে সারাক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, বিবিসিকে তা নিয়ে বলছিলেন রেডব্রিজের নির্বাচিত কাউন্সিলর সৈয়দা সায়মা আহমেদ ।

‘উইমেনস চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে তিনি ঘরের বাইরে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন; ওই কাজের অংশ হিসেবে কিছুদিন আগে তারা ঘরের বাইরে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে একটা জরিপ মতো চালিয়েছিলেন।

“সেখানে নারীরা আমাদের জানিয়েছেন, রাতে হোক বা দিনে, তারা যখন ঘরের বাইরে যান, তারা ধরেই নেন যে ঘরের বাইরে গেলে তাদেরকে কটূক্তি শুনতে হবে, পুরুষের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হবে। রাস্তায় হয়তো তাদেরকে কেউ অনুসরণ করতে পারে। নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে ব্যাগের মধ্যে কিছু না কিছু নিয়ে বের হতে হয়। অনেকে জুতো বদলান কাজ থেকে ফেরার সময়, যা পরে দৌড় দেয়া যায়। অন্ধকার গলির দিকে তারা যান না, তারা ভয় পান। তাদেরকে হয়তো কেউ নিপীড়ন করতে পারে। এগুলো এতটাই স্বাভাবিক যে, সবাই জানে,” বলেন তিনি।

কেবল নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগই নয় সাবিনার হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ গণমাধ্যমের আচরণকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বলা হচ্ছে, সারা এভারার্ডের ঘটনা গণমাধ্যমের যতটুকু মনোযোগ পেয়েছে, সাবিনার ঘটনা তা পায়নি।

সারা নিহত হন এ বছরের মার্চে দক্ষিণ লন্ডনে। তিনিও সেদিন পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন, পথে তাকে অপহরণ করে এক পুলিশ, পরে তার লাশ পাওয়া যায় একটি পার্কে।

তার হত্যাকাণ্ড ব্রিটেনকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়, দিনের পর দিন এই হত্যাকাণ্ডের খবর ব্রিটিশ গণমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে রেখেছিল। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং ঘরের বাইরে নারীর নিরাপত্তার দাবিতে যে বড় বড় বিক্ষোভ হয়েছিল, তাতে এমনকি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট মিডলটনও যোগ দিয়েছিলেন।

কিন্তু সাবিনার হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম কয়েকদিন গণমাধ্যমে সে ধরণের কাভারেজ দেখা যায়নি। অবশ্য গত কয়েকদিন ধরে ব্রিটিশ গণমাধ্যম তা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তা সত্ত্বেও বিতর্ক থেমে নেই।

সবার অভিযোগ, কোনো শ্বেতাঙ্গ নারী যখন অপরাধের শিকার হন, গণমাধ্যমে তা যেভাবে ফলাও করে প্রচার হয়, অশ্বেতাঙ্গ, সংখ্যালঘু নারীর ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

বিবিসি রেডিও ফোরের টুডে অনুষ্ঠানে টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলর রাবিনা খানও বলেছেন, “অনেকে প্রশ্ন করছেন, একজন অশ্বেতাঙ্গ বা সংখ্যালঘু নারী যদি সারা এভারার্ডের মতো নিখোঁজ হয়ে যান, তিনি কি আসলে মিডিয়ায় একই ধরণের মনোযোগ পাবেন?”