হুমকির মুখে ট্যানারি, মৃতপ্রায় চামড়া শিল্প বাঁচবে তো!

হুমকির মুখে ট্যানারি, মৃতপ্রায় চামড়া শিল্প বাঁচবে তো!

জাতীয়

সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধের দাবীঃ পরিবেশ দূষণের কারণে সম্প্রতি সাভারের হরিণধরা এলাকায় চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ এসেছে সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে। চালু হওয়ার চার বছরের মধ্যে এটি বন্ধের দাবি উঠতে শুরু করেছে।

চামড়া শিল্পনগরী কেন বন্ধ করা হবে না, বিসিকের কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এদিকে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিক ও শ্রমিকরাও পরিবেশ দূষণ রোধ করে সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি কামনা করেছেন।

বিসিক বলছে, ট্যানারিগুলো প্রয়োজনের বেশি পরিমাণ পানি ব্যবহার করায় তা সিইটিপির শোধন ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে সলিড বর্জ্যকে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার করলে এই সমস্যা সমাধান হবে। এই লক্ষ্যে তারা নতুন একটি প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে বলেও জানা গেছে।

বিসিক কর্মকর্তা ও চামড়া শিল্পকারখানার মালিকদের মধ্যে তর্কবিতর্ক: ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পকারখানাগুলো সাভারে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও প্রকল্প শুরু করতে লেগে যায় ৯ বছর। দু বছর মেয়াদী প্রকল্প উনিশ বছর পর আলোর মুখ দেখে। কিন্তু আলোর মুখ দেখতে না দেখতেই কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কেননা সাভারে স্থানান্তরিত ট্যানারিতে পূর্ণ সক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি এখনও নেই। আর এজন্য পরিবেশ দূষিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে বিপুল বর্জ্য। ফলে তাকেও বুড়িগঙ্গার মতো পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে।

এই চামড়া শিল্প নগরীটি তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বা বিসিকের তত্ত্বাবধানে। হাজারীবাগে শোধনাগার ছিল না। তাই চামড়াশিল্পের বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হতো। ফলে বুড়িগঙ্গা পরিণত হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ও নোংরা নদীতে। কিন্তু যে সমস্যাগুলোর কথা মাথায় রেখে ট্যানারিগুলোকে হাজারীবাগ থেকে সাভারে সরিয়ে নেয়া হলো সেই সমস্যাগুলোই আবার কেন দেখা দিল? বিসিক কেন সেই সমস্যার সমাধান করতে পারলো না? ট্যানারিগুলো কেন আবার পরিবেশের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিলো?

বিসিক কর্মকর্তাদের অভিযোগের আঙুল শিল্পকারখানার মালিকদের দিকে। তাদের অভিযোগ, নিয়ম ভেঙে ট্যানারি থেকে কঠিন বর্জ্যসহ ক্রোমমিশ্রিত পানি সরাসরি মূল পাইপে ছাড়া হয়। ফলে পাইপলাইন ব্লক হয়ে নোংরা পানি ম্যানহোল দিয়ে উপচে পড়ে। এতে সিইটিপির ব্যাকটেরিয়া মরে যায়, যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) নেতাদের দাবি, দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে বিসিক নিজেদের দায় অন্যান্যের ওপর চাপাচ্ছে। চীনের নিম্নমানের যন্ত্রপাতির কারণেই সিইটিপি নষ্ট হয়েছে। ট্যানারি থেকে সিইটিপিতে বর্জ্য নেওয়ার জন্য ৩৮ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ দেওয়ার কথা থাকলেও ১৮ ইঞ্চির পাইপ দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, সাভার চামড়াশিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় শোধনাগার বা সিইটিপির সব ইউনিট এখনো প্রস্তুত হয়নি। এজন্য প্রথমত বিসিকই দায়ী। কেননা এ রকম একটি ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি দরকার, তারা তা মানেনি। এখন শিল্পমালিকদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন যে তাঁরা কঠিন বর্জ্য সরাসরি পাইপে ছেড়ে দেওয়ায় পাইপ অকেজো হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন ৩৮ ইঞ্চির পাইপ ১৮ ইঞ্চিতে পরিণত হলো, কেন চীন থেকে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা হলো সেসব প্রশ্নের উত্তর নেই।

বাপা’র সতর্কবার্তা: হাজারীবাগে চামড়াশিল্পের পরিবেশগত অভিঘাত ও ক্ষতির কথা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। বাপা’র এক জরিপ অনুসারে এই ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকা। তবে ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতির চেয়েও বড় যে বিষয় সেটি হলো এটি ‘লং টার্মে’ নদীকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ট্যানারি স্থানান্তরের তোড়জোড় চলাকালে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন বিসিককে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এখন ট্যানারিটা হেমায়েতপুরে চলে গেলেও, সেখানে যদি মানসম্মত সিইটিপি লাগানো না হয়, তবে ঐ এলাকার বংশী বা ধলেশ্বরী নদীও দূষিত হবে৷ আর সেটা হলে, সেই পানি আবারো ঘুরে-ফিরে আবার ওই বুড়িগঙ্গাতেই এসে পতিত হবে।’

তাঁর কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বিসিক এতোবড় একটা ট্যানারি স্থানান্তরের কাজটাকে বেশ ঢিলেঢালাভাবে গ্রহণ করেছিল। যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এবং পরিবেশের সুরক্ষার দিকটাকে উপেক্ষা করে তারা ট্যানারি স্থাপন করেছে অবিবেচকের মতো। ফলে ট্যানারি শিল্প আজ হুমকির মুখে পড়েছে।

ট্যানারির আশেপাশের জীবন হয়ে উঠেছে দুঃসহ: হেমায়েতপুরের শিল্পাঞ্চলজুড়ে রাস্তায় একটু পর পর জমে আছে নোংরা দুর্গন্ধময় পানি। কিছু রাস্তায় হাঁটা সম্ভব নয়, আর কিছু রাস্তা ছোট গাড়ি চলাচলেরও উপযুক্ত নেই। এসব নিয়ে অভিযোগ করছেন শিল্প মালিকেরা এবং এই অজুহাতে কিছু কাজ হাজারীবাগেও চালিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ।

‘ট্যানারির পানি এসে আমার পেঁপে ক্ষেত কোমর পানির উপরে গ্যাছেগা। এইখানে আর চাষাবাদ করার অবস্থা নাই, নৌকা বাওয়া যাইব’ -সাভারের হেমায়েতপুরে এক বাসিন্দার অভিযোগ।

সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরীর শেষ সীমানা পার হলেই চোখে পড়ে একটি বাজার। সেই বাজারের পাশেই নদী। তবে গন্ধের কারণে খুব একটা কাছে যাওয়া যায় না। পাশেই চামড়া নগরীর বর্জ্যরে বিশাল ভাগাড়। বড় পুকুরের মত একটি স্থানে কারখানাগুলোর সব ধরণের বর্জ্য এনে ফেলা হচ্ছে। কারখানা থেকে আনা বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তদারকারী বিসিক কর্মচারীদের ভাষ্য, আশেপাশের কারখানাগুলোর যত কঠিন বর্জ্য আছে সবই এখানে ফেলা হয়।

যদিও এখানে একটি পরিবেশসম্মত ডাম্পিং জোন এবং সেই কঠিন বর্জ্য পুন:ব্যবহার করার কথা ছিল, তার কিছুই এখনো হয়নি। কবে হবে সেটাও কেউ বলতে পারছে না। ট্যানারি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কি সেটি হবে?

নদী মরে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে মাছ: শিল্পকারখানার বর্জ্যরে তরল অংশটি ভেসে পড়ছে পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীতে। চামড়া কারখানা স্থাপন হবার পর থেকে নদীর এই অংশে মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। এলাকার লোকজন এ নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ। তারা কয়েক বার অভিযোগ করার পরও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

চামড়া শিল্পাঞ্চলের পার্শ্ববর্তী নদীতে এবছর সমীক্ষা চালিয়ে অতিরিক্ত ক্রোমিয়াম এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কেন্দ্রীয় যে দুটি পরিশোধনাগার হবার কথা ছিল, তার একটি কয়েক দফা সময় পেছানোর পর চালু হয়েছে বলছে বিসিক। কিন্তু অপরটি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। চালু হতে আরো সময়ের প্রয়োজন হবে বলছেন তারা।

মাছ মরে যাওয়ার পেছনে ট্যানারির বর্জ্য পদার্থের দায় অবশ্য অস্বীকার করছেন বিসিক কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, মাছ যে ট্যানারির রাসায়নিক পদার্থের কারণেই মারা গেছে তার কোন প্রমাণ নেই।

পরিবেশ ও নদী দূষণের ব্যাপারে তাদের ভাষ্য, দূষণের দায় কিছুটা ট্যানারি মালিকদেরও আছে, কারণ কারখানাগুলোও শোধনাগারের জন্য যেভাবে তাদের তরল বর্জ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন সেভাবে করছে না। তারা ক্রোম এবং চুনের পানি মিশিয়ে বর্জ্য দিচ্ছে, কিন্তু সেগুলো দেয়ার কথা ছিল আলাদা।

ট্যানারি বন্ধ হলে বিপদে পড়বে লাখ লাখ মানুষ: হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারের ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে স্থানান্তরের ফলে কারখানাগুলো পুনরায় পুরোদমে উৎপাদনে যেতে দীর্ঘ সময় লেগে গিয়েছিল। দেশীয় চামড়া রফতানিযোগ্য মান অর্জন করতে না পারার পাশাপাশি সিনথেটিক ও ফেব্রিক দিয়ে উৎপাদিত জুতা, ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই শিল্প এমনিতেই ভেঙে পড়ার মুখে।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া সত্ত্বেও চামড়া শিল্প পোশাক শিল্পের তুলনায় কম সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। এজন্য এই খাত থেকে কাক্সিক্ষত রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া ঈদুল আজহায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী চামড়া যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করে নিজেদের কাছে অতিরিক্ত সময় রেখে দেন। ফলে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক রফতানি মান হ্রাস পায়। এগুলোও চামড়া খাতের সঙ্কট বাড়িয়েছে।

তবে এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ মানুষ জড়িত রয়েছে। এখন ট্যানারি যদি অকস্মাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে এই লাখ লাখ মানুষ কর্ম বিমুখ হয়ে পড়বে। তাদের পরিবার পড়বে মহাবিপদে।

ট্যানারির সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের অভিমত, ট্যানারি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের রিজিকের উপর আঘাত আসবে। এটা আমরা কোনোভাবে মাইনা নিতে পারব না।