সরকারি মজুদ না থাকায় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চিনির বাজার

জাতীয়

বর্তমানে দেশে সরকারি কোনো চিনি মজুদ নেই। আর ডিসেম্বর পর্যন্ত যা উৎপাদন হবে তা মোট চাহিদার ২ শতাংশেরও কম। ফলে এখন চিনির বাজার শতভাগ আমদানিনির্ভর হতে চলেছে। দেশের চিনিকলগুলোর প্রায় অর্ধেকই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারের হাতে মজুদ থাকছে না।

ফলে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দামও। আর বাড়তে বাড়তে সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত এক বছরে দেশের বাজারে চিনির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৮ টাকা বা ৩১ শতাংশের বেশি। আর দুই বছরের মধ্যে বেড়েছে ২৮ টাকা বা ৫৫ শতাংশ। মূলত সরকারি মজুদ না থাকা বা কম থাকার সুযোগে বাজারের নিয়ন্ত্রণ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে।

তারাই বাজারের সরবরাহ ও দাম ঠিক করে। আমদানি খরচ বৃদ্ধিসহ নানা অজুহাতেই চিনির দাম বাড়ছে। সেক্ষেত্রে মিল মালিকদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সরকারও অগ্রাহ্য করতে পারছে না। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের চিনির বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ায় ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। কারণ দাম বাড়লেও কারো কিছু করার নেই। সরকার চাইলেও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সেজন্য দেশে চিনি উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তাতে অন্তত বাজারে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাজারে প্রতযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারিভাবে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

দেশের চিনিকলগুলোতে ক্রমাগত লোকসানের কারণে উৎপাদন হ্রাস বা বন্ধ করে দেয়ায় ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে চিনির বাজার। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে ৬টি চিনিকল বন্ধ করে দেয়ায় বাজার শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ১৫টি মিলের মধ্যে বাকি ৯টিতেও উৎপাদন খুব একটা আশানুরূপ নয়।

সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খুচরায় চিনি এখন ৭৮-৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক বছর আগে এই সময় অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে বাজারে চিনি প্রতি কেজি ৬০-৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। অর্থাৎ এক বছরে চিনির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ১৮ টাকা। গত বছর গড়ে চিনির দাম ছিল ৬২ টাকা ৫০ পয়সা। এখন গড়ে চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭৯ টাকা কেজি। ওই হিসেবে দাম বেড়েছে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা বা ৩১ শতাংশের কিছু বেশি।

তার আগের বছর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চিনির দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকা। ওই হিসেবে দুই বছরের ব্যবধানে চিনির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি গড়ে ২৮ টাকা বা ৫৫ শতাংশ। বাংলাদেশে বছরে চিনির চাহিদা প্রায় ১৮ লাখ মেট্রিক টন। সরকারি মজুদ না থাকায় চাহিদা মেটাতে বেসরকারি আমদানিকারকরা বর্তমানে ব্রাজিল, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়া থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে। তারপর তা পরিশোধন করে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে।

বিগত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দেশে অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৭২ হাজার ৬৮০ মেট্রিক টন। পরের মাস অর্থাৎ গত বছরের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ২ লাখ ৯১ হাজার টনে ওঠে। ফেব্রুয়ারিতে আরো বেড়ে ৩ লাখ ৮৬ হাজার টনেরও বেশি হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে অপরিশোধিত চিনির আমদানি কিছুটা কমলেও ৩ লাখ টনের কাছাকাছিই ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৩ লাখ ২০ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়। মার্চ-এপ্রিলে আমদানি ছাড়িয়ে যায় ৫ লাখ টনেরও বেশি। মার্চে ৫ লাখ ৩২ ও এপ্রিলে ৫ লাখ ২০ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি বিদেশ থেকে আসে।

অথচ বছরপাঁচেক আগেও দেশে চিনি আমদানি আরো অনেক কম ছিল। ২০১৭ সালে জানুয়ারিতে অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছিল এক লাখ ৮৭ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন। আর ওই বছর ডিসেম্বরে ছিল এক লাখ ৬৭ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি ২ লাখ টনের বেশি হয়নি।

সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছর দেশে চিনি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৭০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ওই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ডলার। চলতি বছরের জুলাই মাসে চিনি আমদানিতে দেশের ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। তার আগের বছর একই মাসে আমদানি ব্যয় ছিল ৬ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। বর্তমানে দশে চিনির চাহিদা পূরণে পুরোপুরি আমদানিনির্ভ হয়ে পড়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি একটি অশনিসংকেত।

এদিকে এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানান, একসময় দেশের উৎপাদিত চিনি দিয়ে বাজার চাহিদার অনেকটাই পূরণ হতো। কিন্তু দেশের সরকারি চিনিকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা অনেক কমে গেছে। সামনের দিনগুলোতে আরো কমতে পারে। সেক্ষেত্রে রিফাইনারি মিলগুলোরও নানা অপকৌশল রয়েছে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান আরিফুর রহমানের মতে, চালু থাকা সরকারি ৯টি চিনিকল থেকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০ হাজার টনের মতো চিনি পাওয়া যাবে। যা মোট চাহিদার মাত্র ১.৬৬ শতাংশ উৎপাদন হবে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আশা করা যায় আগামী বছর ৯টি চিনিকল থেকেই এক লাখ টনের বেশি চিনি উৎপাদন সম্ভব হবে। তখন আপৎকালীন সময়ের জন্য চিনি মজুদ রেখে বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।