Newyourk imageআমেরিকার নিউ ইয়র্কে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গোয়েন্দা বিভাগের একটি শাখা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও ওই শাখাটির সদস্যরা এখনো মুসলমানদের মধ্যে গুপ্তচর বৃত্তি অব্যাহত রেখেছে। গতকাল সোমবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সম্পাদকীয়তে এ তথ্য জানানো হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়টি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো:
নিউ ইয়কের্র পুলিশ কমিশনার উইলিয়াম ব্র্যাটন তার পূর্বসূরি রেমন্ড কেলির আওতাধীন একটি বাহিনীকে গত মাসে নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। আইন মেনা চলা মুসলমান জনগণ যারা অঞ্চলটিতে বসবাসরত তাদের নিজ সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মকমের্র সঙ্গে যুক্ত, তাদের ওপর নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করত বাহিনীটি। কোনোরকম অবৈধ কার্যক্রমের জন্য নয়, বরং শুধু নিজ ধমের্র প্রতি আনুগত্যের কারণেই ওই মুসলমানদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করা হচ্ছিল। এর মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তারা। এভাবে মুসলমানদের উস্কে দেয়ার মাধ্যমে ডেমোগ্রাফিক ওই বিভাগটি সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতার প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে নিজেদের নিতান্তই অকর্মা হিসেবে প্রমাণ করেছে। সমস্যাটির এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। দ্য টাইমের জোসেফ গোল্ডস্টেইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাগটি এখনো মুসলমানদের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে এবং সমস্যা সৃষ্টি করছে। এবার বিভাগটি এই কাজ করছে মুসলমান সম্প্রদায়ের ভেতরে গুপ্তচর ঢুকিয়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে। ভদ্র ভাষায় সিটিওয়াইড ডিব্রিফিং টিম হিসেবে খ্যাত একদল গোয়েন্দার পরিচালিত ওই বিভাগটি বলছে, গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে বলেই এ ধরনের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, রাজনৈতিক কোনো কার্যক্রম নিয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে তাদের। গোয়েন্দা তৎপরতার ভিত্তি হিসেবে আদৌ কোনো ধরনের মূল্যবোধ অনুসরণ করে কি-না, তা নিয়েও তাদের ভূমিকার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের কিছু পরেই বিভাগটি নিউ ইয়র্ক শহরের প্রতিটি থানায় গিয়ে অভিবাসী, বিশেষ করে মুসলমানদের খুঁজে বের করতে শুরু করে। তখন থেকেই তারা মুসলমানদের ভেতরে গুপ্তচর ঢোকাতে থাকে। ঐতিহাসিকভাবে, অপরাধী গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে কোনো কিছু জানা থাকলে কিংবা অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকলে তাদের ভেতরের খবর সরবরাহ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়ে থাকে এই গুপ্তচরদের। এই পথটিই এখন মুসলমানদের ভেতরের তথ্য জানতে অনুসরণ করা হচ্ছে- বিশেষ করে তাদের জন্ম ও মুসলমান পদবীর ভিত্তিতে এই নজরদারি চালানো হচ্ছে। এই দলটির সঙ্গে কাজ করেছেন এমন একজন সাবেক পুলিশ সার্জেন্ট বলেন, “অপরাধী কার্যক্রম কিংবা সন্ত্রাসীচক্রের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহই আমাদের মূল কাজ। তাহলে- ‘তুমি কি মুসলমান? ’, ‘কোন মসজিদে যাও তুমি? ’ কিংবা ‘সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ আছে তোমার? ’- এ ধরনের প্রশ্ন কেন করব আমরা? ”এসব ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে ছোটখাট অপরাধ করে যারা, এমনকি কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন- এমন ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হন। মাঝে মাঝে তাদের প্রয়োজনের চাইতেও বেশি সময় নিয়ে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। তারা তাদের ধর্মীয় কাজগুলো কোথায় গিয়ে সম্পাদন করেন, তাদের আত্মীয়স্বজনের নাম-পরিচয় কী এবং অবসর সময় তারা কোথায়, কিভাবে কাটান- এসব তথ্য জানার জন্য গোয়েন্দারা তাদের দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব প্রশ্নের উত্তর দেবেন কি দেবেন না তা ওই ব্যক্তিদের ইচ্ছার ওপরেই নিভর্র করে। কিন্তু যেহেতু পুলিশের হেফাজতে থাকায় তারা না বুঝেই ভয় পেয়ে যান এবং মনে করেন যে পুলিশকে সহযোগিতাইয় ব্যর্থ হলেই বুঝি তাদের শাস্তি দেয়া হবে।

এই বিষয়টিকে আদালতে এখনো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। তবে এই ধরনের তৎপরতা বন্ধ করার জন্য প্রায় এক দশক আগেই এর সমালোচনা করেছিলেন ম্যানহাটনের ফেডারেল ডিসট্রিক্ট কোর্ট। ২০০৩ সালে নিউ ইয়র্কে যুদ্ধবিরোধী একদল মানুষের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতটি এই রায় দিয়েছিলেন।

মুসলমানদের প্রশ্নের মুখে পড়ে ওই মামলায় পুলিশ- যতদূর মনে পড়ে- বলেছিল, রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি-না, প্রেসিডেন্টের বিষয়ে মনোভাব কেমন, ইরাকে যুদ্ধের বিষয়ে অবস্থান কী- এসব বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। আর বাড়তি সময় ধরে হেফাজতে রাখার বিষয়ে পুলিশ বলেছিল- নির্দিষ্ট গোয়েন্দারা, যারা জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্বে থাকতেন, তারা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকায় কিছুটা বেশি সময় নিয়েই ওই ব্যক্তিদের পুলিশের হেফাজতে রাখতে হতো।

এরপর পুরো ব্যাপারটিকে নির্দোষ জনগণকে হয়রানি করার একটি দমনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেন আদালত এবং বলেন, পুলিশি হেফাজত নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অর্থ হলো- বিক্ষোভকারীদের মানবাধিকার নিশ্চিত করার সময় এসেছে।

সন্ত্রাসী কার্যক্রম নস্যাৎ করে দিতে গুপ্তচর লাগানোর ব্যাপারে পুলিশ বিভাগ সঠিক হতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে যদি জনগণ পুলিশকে ভয় পেতে শুরু করে কিংবা এর মাধ্যমে যদি পুলিশ সংবিধান লঙ্ঘন করে, তাহলে ভবিষ্যতে তা পুলিশের জন্য উলটো ফলই বয়ে আনবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য