বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াবিদ ও নাট্যকর্মী ষ্টেনগান নজরুল

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াবিদ ও নাট্যকর্মী ষ্টেনগান নজরুল

দিনাজপুর সম্পাদকীয়

১৯৮৬-৮৭ সালের কথা। দিনাজপুরের হেমায়েত আলী হলে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, দিনাজপুর জেলা কমান্ডের নির্বাচন হয়েছে। ঐ নির্বাচনে সংসদের জেলা কমান্ডার পদপ্রার্থী মিশনরোড নিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নজরুল ইসলাম হেরে গেছেন। ফলাফল ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে ভীষণ উত্তেজিত তিনি। উত্তেজনার বশে হলের ভিতর থেকে বের হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করে খুঁজছেন বিজয়ী হিসেবে ঘোষিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মকশেদ আলী মঙ্গলিয়াকে।

“গুলি করব। ফুটা করে দিব। জাল ভোটে হারানো হয়েছে। গুলি করে মারব।” ভিষণ উত্তেজিত হয়ে বলছেন নজরুল ইসলাম। হাতে তার রিভলভারও আছে। রিভলবারের ভিতরে গুলি আছে কি না, বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মকশেদ আলী মঙ্গলিয়াকে আর খুঁজে পেলেন না। কোন অঘটনও ঘটল না।

অনেক পরে এই ঘটনা নিয়ে আমি (এই নিবন্ধের লেখক) আলাপ করি মকশেদ আলী মঙ্গলিয়ার সাথে। প্রশ্ন করি “নজরুল ভাইয়ের ঐ ঘটনাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?”

আমার ধারণা ছিল মকশেদ আলী মঙ্গলিয়া এই প্রশ্নের জবাব দিবেন ভিষণ রাগ দেখিয়ে। নজরুল সম্পর্কে বলবেন হয়ত উল্টাপাল্টা অনেক কিছু। কিন্তু না, তাঁর মধ্যে রাগের বহি:প্রকাশ দেখা গেল না। অতি সাধারণ ভাবে হাসতে হাসতে বললেন, ‘নজরুল দুষ্টুমী করত। একটু রাগীও ছিল। কিন্তু যে ধরণের রাগ দেখাত, বাস্তবে তেমন ছিল না। তার মন পরিস্কার থাকত। তাৎক্ষণিক রাগ হলেও নরমাল হতে সময় লাগত না। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাহসী মানুষ ছিলেন। সাহস, রাগ ও জেদ ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক। তাই বলে খারাপ মানুষ কখনোই না।’

মকছেদ আলী মঙ্গলিয়া আরো বলেন যে, মুক্তিযুদ্ধে নজরুল ফ্রন্ট ফাইটে অংশ নিয়ে আহত হয়েছিলেন। উড়–ুতে গুলি লাগায় বেশ কিছুদিন হাসপাতালে ছিলেন। ভিষণ প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে তাৎক্ষনিক প্রতিবাদ শুধু করতেন না, মাইরও লাগাতে চাইতেন।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের সহসিকতা, রাগ ও জেদ সম্পর্কে একদিন কথা হচ্ছিল দিনাজপুরের বিশিষ্ট সাংবাদিক, আজকের দেশবার্তা সম্পাদক ও দিনাজপুর নাট্য সমিতির সভাপতি চিত্ত ঘোষের সাথে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিষয়ে নজরুল ইসলাম ছিলেন আপোসহীন।

চিত্ত ঘোষ একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন সংক্রান্ত বিষয়ে একবার দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক একটি প্রস্তুতি সভা ডেকেছিলেন। ঐ সভায় নজরুল ইসলাম প্রস্তাব করেন যে, বড় মাঠের স্বাধীনতা দিবসে পুলিশ, বিডিআর, আনসার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধারাও যেন কুচকাওয়াজে অংশ নিতে পারে, তার ব্যবস্থা নেয়া হোক।

ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান খান যিনি মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের পক্ষ নিয়ে পীস কমিটির নেতা হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর ঐ অ্যাডভোকেটের প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল। প্রশাসন তাকে গুরুত্ব দিত এবং জেলা প্রশাসনের প্রায় সকল গুরুত্বপুর্ণ মিটিংয়ে তার উপস্থিতি থাকত । তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মতামত দিয়ে বলেন, পুলিশ, আনসার , ইপিআর তো থাকলই। তাদের পাশে মুক্তিযোদ্ধা মানায় না। মুক্তিযোদ্ধাদের কুচকাওয়াজে না রাখাই ভাল হবে।

এ্যাডভোকেট মতিয়ারের এমন বক্তব্যের সাথে সাথেই তেলে-বেগুনে জ¦লে উঠেন মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম। তিনি সকলের সামনে নিজের উড়– পর্যন্ত কাপড় উঠিয়ে তার উড়–তে গুলি লাগার ক্ষত চিহ্ন দেখিয়ে চিৎকার করে সবার উদ্দেশে বলতে থাকেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশ স্বাধীন করেছি, রাতের পর রাত খেয়ে না খেয়ে লড়াই করেছি, আর উনি তো (মতিয়ার) চিহ্নিত রাজাকার। পাকিস্তানের দালাল ছিলেন। আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা, রক্তে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে এসেছেন কোন সাহসে? রাজাকারের কথায় কি বাংলাদেশ চলবে? প্রশাসন রাজাকারের কথা শুনবে কেন?

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াবিদ ও নাট্যকর্মী ষ্টেনগান নজরুল
স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়ের প্রতিবাদী মিছিলে নজরুল ইসলাম আজাদ

ভরা মিটিংয়ে প্রকাশ্যে মুখের উপর এমন কথা বলার পর মতিয়ার রহমান খান চুপসে যেতে বাধ্য হন। অপরদিকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ঐ সভায় সর্ব সম্মতিক্রমে বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

নজরুল ইসলাম সম্পর্কে একই রকমের অভিমত ব্যক্ত করেছেন দিনাজপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল জব্বার। তিনি বলেন, নজরুল সাহেব প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন। যে কোন পরিস্থিতিতে, যে কারো বিরুদ্ধে সামনা-সামনি বলতে মোটেও ভয় পেতেন না।
(২)
নজরুল ইসলামের জন্ম বৃটিশ শাসনামলে ১৯৪৪ সালের ৫ জুলাই। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল একাডেমি স্কুলের পাঠশালায়। মেট্রিক পাস করেছেন জেলা স্কুল হতে ১৯৬১ সালে। ১৯৬৪ সালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ হতে আইএ ও ১৯৬৭ সালে ডিগ্রী পাস করেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই ল পাস করেন ঢাকা বিশ^বি

দ্যালয় হতে।

নজরুল সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে সচেষ্ট থাকেন ঘোষিত সকল কর্মসুচি বাস্তবায়নে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর টগবগে তরুণ নজরুল ইসলাম প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। খাদ্য-পানীয় দিয়ে সহায়তা করেন প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ সেনয়া মুক্তি সেনাদের। তৎকালিন ইপিআর বাহিনীর সেক্টর হেডকোয়ার্টার কুঠিবাড়িতে অবস্থানরত বাঙালি ইপিআর সৈনিকরা ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনা ও শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করলে হাজারো জনতার মত তরুণ নজরুলও বিদ্রোহীদের সাহায্যে এগিয়ে যান। এই বিদ্রোহে পাকিস্তানি সেনারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেলে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দিনাজপুর জেলা মুক্তাঞ্চলে পরিনত হয়। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় হানাদার বাহিনী দিনাজপুর শহর পুনরায় দখল করার পর হাজারো মানুষের সাথে নজরুল নিজেও সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান এবং ভারতীয় দিনাজপুরের বালুরঘাটে গড়ে উঠা কামারপাড়া যুব রিক্রুট ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগ দেন।

এই যুব ক্যাম্পের অবস্থান ছিল হিলি হতে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই ক্যাম্প অনেকের কাছে কুরমাইল ক্যাম্প নামেও পরিচিত ছিল। ক্যাম্পটি পরিচালনা করতেন আওয়ামী লীগ নেতা পাবনার অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও নওগাঁর মরহুম আব্দুল জলিল। অধ্যাপক আবু সাইয়িদ পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিমন্ত্রী এবং আব্দুল জলিল মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিকুল হক ছুটু জানান, মিশন রোডের নজরুল এবং তিনি একই সময়ে কামারপাড়া ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট হয়েছিলেন। দু’জনে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন এই ক্যাম্পে। পরবর্তীতে গেরিলা প্রশিক্ষণসহ উচ্চতর অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন শিলিগুঁড়ির পানিঘাটায়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াবিদ ও নাট্যকর্মী ষ্টেনগান নজরুল
নাট্যকর্মী মুক্তিযোদ্ধা নজরুল

সাহসী নজরুল স্টেনগান, এসএলআর, এসএমজি, মর্টার নিক্ষেপ, গ্রেনেড নিক্ষেপ ও বোমা ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে সদরের কমলপুর, মোহনপুর, ঝানজিরা, পার্বতীপুর, বোচাগঞ্জসহ দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে গেরিলা অপারেশন চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের পর্যদুস্ত করেন। তিনি সব সময় স্টেনগান নিয়ে চলতেন বিধায় ‘স্টেনগান নজরুল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। স্টেনগান নজরুল, এই পরিচিতির ব্যাখ্যা এভাবেই দিলেন দিনাজপুরের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা পাহাড়পুরের আবুল হায়াত কুদরতে খোদা।

(৩)
নজরুল ইসলামের বাড়ি শহরের মিশন রোড এলাকায়। বাবার নাম মরহুম খলিলউদ্দীন আহমেদ, মায়ের নাম মরহুম মল্লিকা বেগম। মিশন রোডের যেখানে তাদের বাড়ি, তার থেকে দশ কদম দূরেই কুঠিবাড়ির অবস্থান। মুক্তিযুদ্ধের সময় কুঠিবাড়ি পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল। এরপরেও বাড়ি ছেড়ে যাননি মুক্তিযোদ্ধা নজরুলের পিতা খলিল উদ্দীন আহমেদ। পরিবারের সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে পাঠিয়ে বয়স্ক ম্নাুষ হিসেবে নিজ বাড়িতে থেকে গিয়েছিলেন। আশা করেছিলেন বয়স্ক লোকের কিছু হবে না। কিন্তু এর প্রতিফল হয়েছে খুবই নিষ্ঠুর। অল্পদিনেই তিনি লাশ হয়েছেন।

নজরুল ইসলামের ছেলে, জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা দিনাজপুর নিউজ ডটকম সম্পাদক আজাদ জয় পরিবারের কাছ থেকে শোনা জানান যে, পাকিস্তানি সেনারা জেনে গিয়েছিল বাবা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। তারা একদিন বাড়ি ঘেরাও করে দাদুর কাছ থেকে বাবার সন্ধান চায়। দাদুর জানার কথা নয় যে, বাবা কোথায় আছে। দাদু সে কথা বললেও পাকিস্তানি সেনারা তার “জানি না” উত্তরে সন্তুস্ত ছিল না। তার্ াদাদুকে গুলি চালিয়ে হত্যা কওে এবং বাড়ির ভিতরের একটি বাংকাওে লাশ ফেলে দিয়ে হালকাভাবে মাটিচাপা দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দাদুর কংকাল পাওয়া যায়। পরিবারের লোকজন তাকে শনাক্ত করে এক পায়ে সেন্ডেল এবং আরেক পায়ের লাঠি দেখে। খলিল উদ্দীন পঙ্গু ছিলেন, তাই একটি পায়ের হাটুর নিচে লাঠি লাগানো ছিল, যার সাহায্যে তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে পারতেন।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নজরুল ইসলামের ভারতীয় নম্বর হলো ৪৪৯৫। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানীর সাক্ষরযুক্ত সনদে এই নম্বরের উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদের ক্রমিক নম্বর হলো ৪৪৫৭৮।

নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে কমলপুর এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদে উপর কয়েক দফা হামলা চালানো হয়েছিল। এইসব হামলায় বেশ কিছু শত্রু সেনা নিহত ও হয়েছিল। তিনি প্রায়ই ভারতের ভিতর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে শত্রু বাহিনীর উপর ঝটিকা বেগে হামলা চালিয়ে আবারো ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তেন।

আমাদের সময় এর দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি রতন সিং জানান যে, ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসে তিনি বাবা-মায়ের সাথে ভারতীয় দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ রেল ষ্টেশনের কাছাকাছি এক বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কাছাকাছি হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই বিকাল বেলা কালিয়াগঞ্জ রেল ষ্টেশন এলাকায় গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেন। এক পর্যায়ে তিনি প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা করে মিশন রোডের নজরুল ইসলাম, বালুবাড়ির সফিকুল হক ছুটু ও তার ভাই বাচ্চুসহ কয়েকজন তরুনকে কালিয়াগঞ্জ রেল ষ্টেশনে দেখতে পেতেন। তাদের হাতে রাইফেল থাকত। তারা প্রতিদিন সন্ধ্যায় অস্ত্র সহকারে কালিয়াগঞ্জ রেল ষ্টেশন হতে সর্বশেষ ট্রেনযোগে ডালিমগাঁও হয়ে রাধিকাপুরের দিকে রওনা দিত।

তারা কোথায় যেতেন সে সম্পর্কে প্রথম দিকে বুঝতে না পারলেও লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে পরে জানতে পারেন যে, তারা ট্রেনযোগে ডালিমগাঁও-রাধিকাপুর যাওয়ার পর বিরল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করতেন এবং পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালাতেন। তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে এবং টার্গেট অপারেশন চালিয়ে আবার ইন্ডিয়ার ভিতরে ঢুকে যেতেন।

রতন সিংয়ের দাবী অনুযায়ী তিনি নজরুল ইসলামকে আগের থেকে চিনতেন। কারণ তাদের (রতন সিং) বাড়ির কাছে বাসুনিয়াপট্টিতে পাকিস্তান আমল হতেই নজরুল ইসলামের একটি অফিস ছিল। এই অফিসে নিয়মিত বসতেন এবং তখন থেকেই তাকে চিনতেন। আগের থেকে চেনা থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় কালিয়াগঞ্জে চিনতে কোন সমস্যা হয় নাই।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াবিদ ও নাট্যকর্মী ষ্টেনগান নজরুল
ক্রিকেট দলে নজরুল ইসলাম আজাদ

কেবিএম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুদ্দিন আখতারের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে, দিনাজপুর সদরের ঝানজিরা এলাকায় রাজাকার বিরোধী একটি অপারেশনের সময় নজরুল ইসলামও অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের অক্টোবরের ২২-২৩ তারিখে দিনাজপুর সদরের মুরাদপুর-রামসাগর এলাকায় একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় আমার নেতৃত্বে। অপারেশন শেষে আমরা মুরাদপুর এলাকায় অবস্থান নেই। আমাদের অবস্থানের খবর পেয়ে নজরুল ইসলাম, সফিকুল হক ছুটু, আব্দুর রহিম (তৎকালিন ছাত্রলীগ, দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি) প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধার একটি দল আমাদের সাথে দেখা করেন। তখন নজরুলের গায়ে যে গেঞ্জিটা দেখেছিলাম সেটা এত ময়লা ছিল যে তাতে পোকা ধরে গিয়েছিল। নজরুল তখন জানিয়েছিলেন, তিনি ২০-২২ দিন ধওে গোসল করতে পারেন নাই। তারা আমাদেরকে ঝানজিরায় তাদের দলের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে অপারেশনে অংশ নিতে প্রস্তাব দেন। আমরা ঐ রাতেই ঝানজিরা গ্রামে একসাথে অপারেশন পরিচালনা করি।

শুধু দিনাজপুর সদরে নয়, নজরুল ইসলাম পার্বতীপুর, চিরিরবন্দর, রানীশংকৈলসহ বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ক্রিড়া ও সংস্কৃতিতেও অবদান রেখেছেন। দিনাজপুর প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী দুলাল জানান, নজরুল ইসলাম খুব ভাল মাপের ক্রিকেটার ও বেষ্ট ওপেনার ছিলেন। ক্রিকেটে জেলা টিমকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দিনাজপুর স্টেশন ক্লাবে টেনিস খেলতেন। দিনাজপুরের কাবাডিকে সংঘটিত করেছেন।

নজরুল ইসলাম একজন নাট্যকর্মী ও নাট্যাভিনেতা ছিলেন। গীটারেও হাতেখড়ি ছিল। দিনাজপুরের অন্যতম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম শাহজাহান শাহ সম্পাদিত নবরুপী’র ৫০ বছর শীর্ষক স্মরণিকা থেকে জানা যায় যে, নজরুল ইসলাম নবরুপী সুরবানী সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্রের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি গীটারে ঝংকার তুলতে পারতেন। গীতারের তারে ঝংকার দিয়ে পরিচিত গানের সুর বাজাতে ফরমায়েশ আসত তার কাছে। ১৯৬৩-৬৪ সালে ‘কার টোপে’ নাটকে মাওলা চরিত্রে অভিনয় করে বাজিমাত করেছিলেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াবিদ ও নাট্যকর্মী ষ্টেনগান নজরুল
টেনিস দলের সাথে মুক্তিযোদ্ধা নজরুল

নজরুল ইসলাম একজন পরিবহন ব্যবসায়ী ছিলেন। দিনাজপুর বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করেছেন। দৈনিক জনমত পত্রিকার বার্তা সম্পাদক অ্যাডভোকেট লতিফুর রহমান জানান, ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে নজরুল ইসলাম যখন দিনাজপুর বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, সেই সময় আমি রংপুরে বিশেষ দরকারে যাই। হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘটের কারণে ফেরার সময় বাস পাচ্ছিলাম না। একটা বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না,

এমন ভাবনায় আমি রংপুরের জাহাজ কোম্পানীর মোড়ে এসে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অবস্থান নেই। সেই সময় দেখি একটি মাইক্রোবাস আমাকে পাশ কাটিয়ে কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। তারপর মাইক্রোটি আবার পিছিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে গেল। গাড়ির দরজা খুলে মাথা বের করলেন যিনি, দেখি তিনি নজরুল ভাই। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এইথেনা রাস্তাট দাঁড়াই দাঁড়াই কি করেছিস রে?। বললাম, বাড়ি যাব। কিন্তু অপনাদের ধর্মঘটে যেতে পারছিনা। তিনি বললেন, আয়, ঢুকেক। আমি মাইক্রোবাসে উঠে দিনাজপুরে এলাম নজরুল ভাইয়ের সাথে। তার কাছ থেকে জানলাম যে, রংপুরে মালিক সমিতির একাট মিটিংয়ে যোগ দেয়ার জন্য তিনি মাইক্রো নিয়ে সেখানে এসেছিলেন।

নজরুল ইসলাম একাত্তরে অবিবাহিত ছিলেন। তিনি আইন পেশায় ল পাশ করেছিলেন। বিয়ে করেছিলেন ১৯৭৪ সালে ছয়রাস্তা মোড় নিবাসী মরহুম আমির হোসেনের কন্যা শরিফা ইসলামকে। জন্মগতভাব্ েরাগী হলেও মননশীলতা তার হ্দয়ে ছিল। ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ও নাট্যকর্মী, অভিনেতা ও গীতার বাদক, ক্রিড়াবিদ ও ক্রিড়া সংগঠক, সর্বোপরি সাহসী এই বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্ম হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। দূরারোগ্য ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১০ সালের ২৭ জুলাই ৬৬ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু দিনাজপুরের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক

আজহারুল আজাদ জুয়েল,
সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক
মোবাঃ ০১৭১৬-৩৩৪৬৯০/০১৯০২০২৯০৯৭
ইমেইল- [email protected]
facebook- AZHARUL AZAD JEWEL
পাটুয়াপাড়া, দিনাজপুর
তাং- ১০.০৮.২১

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য