সুবল সেন, দিনাজপুরের ব্যানার শিল্প ও শিল্পীকথা

সুবল সেন, দিনাজপুরের ব্যানার শিল্প ও শিল্পীকথা

দিনাজপুর সম্পাদকীয়

উপ-সম্পাদকীয়ঃ সুবল সেন দিনাজপুর জেলার একজন প্রখ্যাত ব্যানার শিল্পী। সাইনবোর্ড শিল্পীও বলা যায়। অংকন জগতে দিনাজপুর জেলার পরিচিত মুখ। দোকানের সাইন বোর্ড, রাজনৈতিক দলের পোষ্টার, সভা-সমাবেশ, জনসভার ব্যানার, সিনেমা হলের বিলবোর্ড সবকিছুতেই এক দক্ষ শিল্পীর নাম সুবল সেন।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত যারা দিনাজপুরের হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছেন, তারা জানেন যে, ছবি প্রদর্শন শুরু হওয়ার আগে স্লাইডে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখানো হতো। সেই বিজ্ঞাপনের নীচের এক কোণে লেখা থাকত সুবল, সামু, তোফাজ্জলসহ আরো দু-একটি নাম। ঐ নামের অর্থ হলো ঐ বিজ্ঞাপনটি ঐ নামের ব্যক্তিটি তৈরী করেছেন। এই নামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি ছিল সুবল ও সামু। তারা হলে প্রদর্শিত সিনেমার বড় বড় পোষ্টার, ব্যানার করতেন। তাদের আঁকা নায়ক-নায়িকার ছবিযুক্ত বিরাটকায় ব্যানার হলের মুখের সামনে টাঙ্গিয়ে দেয়া হতো দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য।

ছয় দশক ধরে অংকন পেশায় জড়িত সুবল সেন। দিনাজপুরের আরেক শিল্পী সামু আহমেদের কাছ থেকে হাতেখড়ি নিয়ে এই পেশায় এসেছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলে লিলি হলে বিলবোর্ড তৈরী করতেন।

লিলি (বর্তমানে এই হলটি সেই। হল ভেঙ্গে মার্কেট করা হয়েছে) সিনেমায় বকুল নামের একজন কাঠমিস্ত্রি থাকতেন। তার কাজ ছিল, প্রতিদিন সকালে হলের ভিতরের সবগুলো ব্রেঞ্চ চেক করে নষ্ট হওয়া ব্রেঞ্চ মেরামত করা। সুবল বলেন, সেই কাঠমিস্ত্রির সাথে সখ্যতা ছিল আমার। সখ্যতা ও পরিচিতির সূত্র ধরে প্রতিদিন লিলি হলে গিয়ে বকুল মিস্ত্রির সাথে আড্ডা মারতাম। আড্ডা মারার সময় আমার সামু আহমেদের ছবি আঁকা দেখতাম। চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের ছবি আঁকতেন তিনি। আমি মুগ্ধ হতাম। তারপর আমার মধ্যেও ছবি আঁকার নেশা জেগে উঠল।’

এভাবে এই জগতে আসার ইতিহাস বর্ণনা করলেন সুবল। তার ব্যাখানুযায়ী তখন তিনি ১২-১৩ বছরের কিশোর। লিলি হলে সামু আহমেদের ছবি আঁকা দেখতেন মুগ্ধতার সাথে। সুযোগ পেয়ে তাকে দিয়ে টুকটাক ফাই ফরমাস খাটিয়ে নিতেন সামু। টুকটাকে কোন আপত্তি ছিল না। কারণ তখন তো তার মধ্যেও ছবি ও ব্যানার আঁকার নেশা জেগে উঠেছিল।

সত্তুরের দশক হতে শুরু করে পরবর্তী ৩০-৪০ বছর যারা দিনাজপুরের প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখেছেন, তারা পর্দায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের নীচের দিকে ‘সুবল’ নাম অবশ্যই দেখেছেন। অর্থাৎ ঐ বিজ্ঞাপনের লেখা ও ডিজাইন সুবল সেনের।

ক্ষেত্রিপাড়ার মৃত দেবেন চন্দ্র সেন ও মৃত রানীবালা সেনের পুত্র তিনি। তার জন্ম ১৯৫৩ সালে। বর্তমান বয়স প্রায় ৬৭। ক্ষেত্রিপাড়ায় বসবাস করছেন জন্মসূত্রে। একটা সময়ে ব্যানার-সাইনবোর্ড অংকনের রমরমা ব্যবসা করেছেন। “এখন সেই দিন নেই। রমরমা ব্যবসাও নেই।” খুব দুঃখ আর কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বললেন সুবল সেন।

অংকন পেশায় যুক্ত হয়ে অল্প বয়সে সুনাম কুড়িয়েছিলেন সুবল। দিনাজপুর সহ পুরো উত্তরবঙ্গে নামডাক ছিল। এই পেশার উজ্জল ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন একটা সময়। কিন্তু দিন বদলে গেছে। পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। ডিজিটালের ছোঁয়ায় হাতে আঁকা সাইনবোর্ড, ব্যানার এখন অচল প্রায়। মাঝে মধ্যে দু-একটি যা তৈরী হয় তা দিয়ে সংসার চালানো দূরের কথা, নিজের পকেট খরচও এখন চলে না। এমনটাই জানালেন তিনি।
লিলি হলে কাজ শিখলেও সুবল সেন পরে বোস্তানে (এই হলটিও এখন নেই। হল ভেঙ্গে মার্কেট করা হয়েছে) চাকুরি নিয়েছিলেন। সেখানে নায়ক-নায়িকাদের ছবিযুক্ত বড় বড় বিলবোর্ড করতেন। সাজ্জাদ নামের আরেক শিল্পীও কাজ করতেন সেখানে। শুধু ব্যানার লিখতেন। বাড়ি লালবাগে। কমিউনিস্ট কর্মী জাফর- জোহাকের ভাই তিনি।

সুবল সেনের শিক্ষাগুরু সামু পরে মডার্ণ হলে যোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত এই হলেই থেকে গিয়েছিলেন। সামু লিলি হলে আসার আগে সেখানে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সুভাষ দত্ত কাজ করতেন। তিনি রং-তুলির জগতেও একজন ভাল শিল্পী ছিলেন। তিনি পওে চলচ্চিত্রের টানে ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় যাওয়ার পর তোফাজ্জল ও সামু কাজ করতেন লিলি হলে। বিহারি চুন্নু কাজ করতেন মডার্ণ হলে।

ব্যানার শিল্পীদের সাথে আলাপ করে জানা যায় যে, দিনাজপুর জেলার প্রথম সিনেমার ব্যানার ও সাইন বোর্ড শিল্পী ছিলেন প্রভাত ঘোষ। তার প্রতিষ্ঠানের নাম শিল্প কুঠির। গনেশতলায় মরহুম নাট্যশিল্পী ও পরিচালক শাহজাহান শাহ’র বাড়ির সামনে শিল্পকুঠির নামের প্রতিষ্ঠানটি এখনো দেখা যায়।

প্রভাত ঘোষ হলেন দিনাজপুরের ব্যানার ও সাইনবোর্ড শিল্পর জনক। তার দুই পুত্র মনা ঘোষ ও নারায়ন ঘোষ। তারা জাত শিল্পী হতে পেরেছিলেন। পিতাই ছিলেন তাদের ওস্তাদ। পিতার কাছে শিখে নিজেদের দোকানে সাইনবোর্ড লেখার পেশায় নিয়োজিত হয়েছিলেন।

দূর্ভাগ্য যে, দিনাজপুরের ব্যানার শিল্পর জনক প্রভাত ঘোষ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ও তার ছোট পুত্র নারায়ন ঘোষ ভারতের রায়গঞ্জে গিয়ে সেখানে ঐ পেশাতেই নতুনভাবে জীবন শুরু করেন। অপরদিকে তার আরেক পুত্র মনা ঘোষ কুটির শিল্প নিয়ে দিনাজপুরেই অবস্থান করেন এবং এই পেশায় নিজেকে আজীবন ব্যপৃত রাখেন। বয়সের কারণে এখন ভালভাবে কাজ করতে না পারলেও মনা এখনো এই রং-তুলিতেই আছেন। তার বাড়ি দিনাজপুর শহরের ঠোঙ্গাপট্টিতে।

দিনাজপুরে যারা ব্যানার ও সাইনবোর্ড লেখার কাজে জড়িত, তারা সেইসব কাজ কারো না কারো কাছ থেকে শিখেছেন। পরিচালক ও নায়ক, দিনাজপুরের কৃতি সন্তান সুভাষ দত্ত চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে লিলি সিনেমায় চলচ্চিত্রের পোষ্টার আঁকার কাজ করতেন বলে জানালেন সুবল সেন। সুভাষ দত্তের কাছে ব্যানার ও পোষ্টার আঁকার কাজ শিখেছেন কালিতলার চিত্রলেখা’র প্রতিষ্ঠাতা মরহুম তোফাজ্জল হোসেন কানু, পাটুয়াপাড়ার মরহুম নসিম আহমেদ, গনেশতলার নিকনেক সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা হাসান, পাহাড়পুরের মন্টু দত্ত, বড়বন্দরের তালেব আলী (নাট্য শিল্পী আকবর আলী ঝুনুর ভাই) প্রমুখ। নসিম আহম্মেদ সিনিয়র শিল্পী তোফাজ্জল হোসেন কানুর কাছেও কাজ শিখেছেন। আবার নসিমের কাছে কাজ শিখেছেন লালবাগের প্রখ্যাত জাফর-জোহাকের ভাই মরহুম সাজ্জাদ আলী, নসিমের দুই ছেলে মোনায়েম ও নাবু। তবে মোনায়েম ও নাবু কেউই এখন এই কাজ করেন না।

দিনাজপুরের একজন বড় শিল্পী ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন কানু। তার কাজ শিখেছেন চলচ্চিত্র নায়ক-পরিচালক শুভাষ দত্তের কাছ থেকে। আরো কাজ শিখেছেন বড়বন্দরের তালেব আলী। তালেবের কাছে কাজ শিখেছেন গনেশতলার বাসিন্দা সামু আহমেদ। সামু পরে নিজেই দক্ষ শিল্পীতে পরিণত হয়েছেন। সামুর কাছে কাজ শিখেছেন সুবল সেন। এভাবে সবাই কোন না কোন ওস্তাদ ধরেই কাজ শিখেছেন। সামুর কাছে আরও কাজ শিখেছেন নিউটাইনের বিহারি চুন্নু। খালপাড়ার বুড্ডা কাজ শিখেছেন বাসুনিয়াপট্টির সুনীল ও ক্ষেত্রিপাড়ার সুবল সেনের কাছে। সুবল সেনের সাগরেদ আছে আরও অনেকে। গোলাপবাগের মনসুর আলী, রাজবাটির বাচ্চু, বহলার মোহন রায়, পুলিন রায়, পরেশ পাল ও পরেশের এক ভাই, বালুয়াডাঙ্গার রাজ্জাক, নিউটাউনের আকবর আলী, ঘাসিপাড়ার সেলিম, দক্ষিণ কোতয়ালীর আসাদ প্রমুখ, তারা সবাই কাজ শিখেছেন সুবল সেনের কাছে। এদেও মধ্যে আকবর কয়েক বছর আগে একটি ট্রাক রং করার সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেছেন। নিপেন নামের একজন কাজ শিখেছেন সুবলের বাড়িতে থেকে। বাড়ি রংপুরে। এখন রংপুরেই থাকেন। সুবলের এক শিষ্য আছেন ভারতীয় দিনাজপুরের রায়গঞ্জে। সেখানে ডাবোর কোম্পানীর পক্ষে ওয়াল পেইন্টিং এর কাজ করছেন। দক্ষিণ কোতয়ালীর আসাদও ছোট থেকে কাজ শিখেছেন সুবলের কাছে। তারা নিজেরা কাজ শিখে আলাদাভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও খুলেছেন।

মুন্সীপাড়ায় একাডেমী স্কুলের সামনে চিত্রকুঠির নামের দোকান চালাতেন ঝন্টু নামের একজন শিল্পী। তিনি ঢাকার জুপিটার ফিল্ম এর সিনেমার ব্যানার বানাতেন। কাজ শিখেছেন কালিতলার তোফাজ্জল হোসেন ওরফে কানুর কাছে। ঝন্টুর বড় ভাই রাকাও তার কাছে কাজ শিখেছেন। তবে তিনি শুধু সাইনবোর্ড লিখতেন। বাসুনিয়াপট্টিতে দোকান খুলেছিলেন সুনীল কুমার। তিনিও তোফাজ্জল হোসেনের কাছ থেকে কাজ শিখেছেন। এভাবে বিভিন্ন শিল্পীর হাত ধরে দিনাজপুর জেলার ব্যানার ও সাইনবোর্ড শিল্প একসময় আলোকময় দিন কাটিয়েছে। কিন্তু এখন এই শিল্পে চলছে দূর্দিন। ডিজিটালের ছোঁয়ায় শিল্পীরা বেকার প্রায়। সুবল সেনের মতে, বর্তমানে এই পেশায় অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা নাই। যখন প্রচুর কাজ হতো তখন ভালভাবে চলা যেত। ডিজিটাল আসার পর সবাই অচল।

সুবল সেন শুধু সাইনবোর্ড, ব্যানার তৈরী করেন না, চমৎকার ছবিও অংকন করতে পারেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি আফজাল হোসেনের পিতা তাজউদ্দীনের ছবি এঁকেছেন তিনি। সাবেক হুইপ মিজানুর রহমান মানু তার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর দুইটি বড় পোর্ট্রটে করে নিয়ে গেছেন। পেশাগত জীবনের এই স্মৃতিগুলো সুবলকে বেশ আন্দোলিত করে।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন ১৬-১৭ বছরের কিশোর। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার সুযোগ না হলেও প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় মুক্তি বাহিনীকে রুটি সরবরাহ করে সহযোগিতা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা জর্জ দাস দিনাজপুর শহরের পাহাড়পুর এলাাকায় পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের লক্ষে একটি ট্রেনিং সেন্টার চালু করেছিলেন। সেখানে ১৫-২০জন মুক্তিযোদ্ধার কাউকে ব্যানার অংকন, কাউকে দর্জি, কাউকে সাইকেল মেরামতের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। সুবল সেন সেখানে বিনামূল্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সাইনবোর্ড লেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। কিন্তু ৪-৫ মাস চলার পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সংঘটিত হলে ট্রেনিং সেন্টারটি বন্ধ হয়ে যায়।

তিন কন্যা, এক পুত্রের জনক জনক সেন। পুত্র গৌতম সেন চারুকলায় মাষ্টার্স করেছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনষ্টিটিউট হতে। বর্তমানে ইন্টোরিয়র কাজ করছেন। তৃতীয় কন্যা পিংকি সেন ওরফে ঐশী এক সময় উদীচীর শিক্ষার্থীদের ড্রইং শেখাতেন। শিক্ষকতা করতেন নির্মল শিশু বিদ্যালয়ে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বিয়ে হওয়ার পর সেখানে ড্রইং শিক্ষা কেন্দ্র খুলেছেন। অন্য কন্যারা গৃহসংসার নিয়ে ব্যস্ত।

বর্তমানে ব্যানার কিংবা সাইনবোর্ড শিল্পে আর্থিক নিরাপতাতা নাই। তাই অনেকেই এই পেশা থেকে সরে গেছেন। সুনীল কুমার সঙ্গীত কলেজে শিক্ষকতার চাকুরি নিয়েছেন। নসিমের পুত্ররা অটো গাড়ি চালাচ্ছেন। সুবল সেনও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি যে পেশায় নিজেকে আলোকিত করেছেন, এখন তাতে দূর্দিন। তাই এই পেশার পাশাপাশি অন্য কিছু করেও নিজের আর্থিক সংকট দূর করার চেষ্টা করছেন।

-আজহারুল আজাদ জুয়েল
পাটুয়াপাড়া, দিনাজপুর
ইমেইল- [email protected]
fb- AZHARUL AZAD JEWEL

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য