চেয়ারম্যানের কারণে ভিজিডি কার্ড বঞ্চিত ২শতাধিক অসহায় নারী

চেয়ারম্যানের কারণে ভিজিডি কার্ড বঞ্চিত ২শতাধিক অসহায় নারী

দিনাজপুর
  • তালিকায় নাম আছে, জানেন না অধিকাংশ নারী
  • অনিয়মে সহায়তা না করায় চেয়ারম্যান কর্তৃক লাঞ্ছিতের শিকার ইউপি সচিব
  • ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন

দিনাজপুর সংবাদাতাঃ দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ চৌধুরী বিপ্লবের স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের কারণে তালিকায় নাম থাকলেও ভিজিডির কার্ড পেল না ২ শতাধিক অসহায় নারী। এব্যাপারে কয়েকজন ভুক্তভোগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর অভিযোগ দায়ের করেছে। তবে অভিযোগ পাওয়ার পূর্বেই তদন্তের জন্য ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছেন ইউএনও।

তবে চুড়ান্ত তালিকা পরিবর্তন করার ক্ষমতা রয়েছে বলে চেয়ারম্যান দাবী করেছেন। তার এই দাবীর বিরোধীতা করেছেন খোদ ওই ইউনিয়নের সচিব ও ইউএনও। সচিব ও ইউএনও জানিয়েছেন, চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর সেটি পরিবর্তন করার ক্ষমতা চেয়ারম্যানের নেই। অপরদিকে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ জানানোর কারণে চেয়ারম্যান কর্তৃক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে ইউপি সচিবকে। অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী জানিয়েছেন উপজেলা যুবলীগ সহ-সভাপতি।

জানা গেছে, শিবনগর ইউনিয়নের ৪৪০জন অসহায় উপকার ভোগী নারীর জন্য ২৬ দশমিক ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়। যা মে ও জুন মাসে বিতরণ করার নিয়ম রয়েছে। তবে ইউপি চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ চৌধুরী বিপ্লব নানান অজুহাতে সময়মত কার্ড ও চাল বিতরণ করেন নি। এছাড়া ওই উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নগুলোতে মাসের ভিজিডির চাল ২৫ মে ও জুন মাসের ভিজিডির চাল ১৪ জুন বিতরণ সম্পন্ন করা হয়।

তালিকায় নাম থাকলেও ভিজিডি কার্ড না পাওয়ায় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভিজিডি কার্ড বঞ্চিত জোসনা খাতুন, নাছিমা বেগম, মরজিনা খাতুন, ছালেহা বেগম, রাশেদা খাতুন, নুরবানু, ইয়াতন বেগম, রেজিয়া ইসলাম, কহিনুর রহমান, রুবিনা বেগম, বিউটি খাতুন, গোলাপী বেগম, সানজিদা বেগম পৃথক পৃথকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন বরাবরে চেয়ারম্যান বিপ্লবের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, ভিজিডি কর্মসূচীর আওতায় ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের জন্য অনলাইন তালিকায় তাদের নাম থাকলেও এখনো কার্ড পায়নি। এমনকি তাদের একবারও চাল প্রদান করা হয়নি। ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে বার বার ধর্ণা দিয়েও কোন লাভ হয়নি। ভিজিডির তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি জানেন না বহু ভুক্তভোগী। অপরদিকে যারা কার্ড পেয়েছেন, তারা চাল পেয়েছেন দুই মাসে একবার।

উপকারভোগী আদুরী বেগম ও রাজিয়া খাতুন, মঞ্জিলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভিজিডির চাল প্রতিমাসে দেবার কথা থাকলেও সময়মত চালগুলো তাদেরকে দেয়া হয় না। ঈদ-উল ফিজরের এক সপ্তাহ আগে চাল পেয়েছেন। এরপর ঈদ-উল আযহার আগে চাল পেলেন। আগামীতে কবে চাল পাব তারও ঠিক ঠিকানা নাই।

তবে অভিযোগ হাতে পাওয়ার পূর্বেই মৌখিকভাবে জেনে ২৩ মে উপজেলা বিএমডিএ’র সহকারী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রধানের বদলী জনিত কারনে তদন্তটি পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে উপজেলা ভেটেরিনারী সার্জন নেয়ামত আলীকে কমিটির প্রধান করা হয়। বর্তমানে তদন্ত কমিটি তদন্ত কাজ পরিচালনা করছে।

উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও উপজেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন। নারী ও তাদের পরিবারকে স্বাবলম্বী করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ভিজিডি কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। কিন্তু আজ শিবনগর ইউপি চেয়ারম্যান বিপ্লব ২ শতাধিক অসহায় নারীর ভিজিডির কার্ড আত্মসাৎ করে চাল উত্তোলন করছেন। যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ইউপি সচিব একজন সরকারী কর্মকর্তা। সচিব সরকারের নির্দেশ মেনে চাকুরী করছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান সচিবকে লাঞ্ছিত করেছেন। আমি অবিলম্বে চেয়ারম্যান বিপ্লবের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছি।

শিবনগর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব দীপক চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৪ জুলাই চেয়ারম্যান বিপ্লবের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে আমি লাঞ্ছিত হয়েছি। আমাকে আমার রুম থেকে বের করে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল চেয়ারম্যান। আমি এব্যাপারে ইউএনওসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছি। একই সাথে ফুলবাড়ী থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছি। চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদে নিজের ইচ্ছামত অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা করছেন। তার এসব কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করলে চেয়ারম্যানের গুন্ডা বাহিনী দ্বারা মারধরের শিকার হতে হচ্ছে। ইতিপূর্বে চেয়ারম্যানের গুন্ডাদের হাতে এক উদ্যোক্তা হামলার শিকার হয়েছে।

“তালিকা চুড়ান্ত হওয়ার পর চেয়ারম্যান তালিকা কর্তন করতে পারেন কি না?” এমন প্রশ্নের জবাবে ইউপি সচিব বলেন, ইতিপূর্বে ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিডির আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবছর অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। যা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও ইউএনও তালিকা চুড়ান্ত করেছেন। এটি চেয়ারম্যান কোন ভাবেই কাটছাট করতে পারেন না। কাটছাট করার এখতিয়ার চেয়ারম্যানের নেই। তিনি নিজের ক্ষমতাবলে এসব কর্মকান্ড চালিয়েছেন।

শিবনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ চৌধুরী বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, “এই ইউনিয়নে ভিজিডির কার্ড বিতরণে কোন ধরনের অনিয়ম হয়নি। তবে কয়েকজনের নাম কর্তন করে অন্য জনকে কার্ড দেয়া হয়েছে। তালিকা চুড়ান্ত হওয়ার পর নাম কাটছাট করার এখতিয়ার আমার রয়েছে। তাই আমি কিছু নাম কাটছাট করেছি।”

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুরু থেকে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভিজিডিসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে অনিয়মের অভিযোগ আসছে আমার কাছে আসছে। ভিজিডি নিবন্ধনের জন্য প্রথম থেকে চেয়ারম্যান আমাদের অসহযোগিতা করেছেন। ওই ইউনিয়নে ৪৪০জনের ভিজিডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। তবে অনলাইনে আবেদন দ্বিগুন প্রয়োজন। যা চেয়ারম্যান ৪৪০ জনের আবেদন পূরণ করতে পারেন নি। তাই বাধ্য হয়ে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ওই ইউনিয়নে মাইকিং করে অসহায় নারীদের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু কার্ড তৈরী হওয়ার পর তালিকায় নাম থাকারা কার্ড পাচ্ছেন না বিষয়টি মৌখিকভাবে অবগত হয়ে আমি ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছি। কমিটি পরবর্তীতে পুনঃগঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটি কাজ করছে। তারা রিপোর্ট দিলে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তালিকা চুড়ান্ত হওয়ার পর কাটছাট করার এখতিয়ার চেয়ারম্যানের নেই বলে তিনি বলেন, তালিকাটি উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও আমার নেতৃত্বে চুড়ান্ত করা হয়েছে। এবার অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। তালিকা চুড়ান্ত হওয়ার চেয়ারম্যান কাটছাট করতে পারেন না। এটা তার এখতিয়ারে পড়ে না। তিনি তা করে অন্যায় করেছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য