জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার

জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার

দিনাজপুর

দিনাজপুর সংবাদাতাঃ জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলায় অবস্থিত পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার। কেননা বই যদি হয় জ্ঞানের ভাণ্ডার, তাহলে নিঃসন্দেহে সেই ভাণ্ডারের ভাণ্ডার হচ্ছে গ্রন্থাগার। ধর্মের চর্চার জন্য চাই মসজিদ-মন্দির, বিজ্ঞানের চর্চার জন্য ল্যাবরেটরি, তেমনি জ্ঞান চর্চায় জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য যেতে হবে গণগ্রন্থাগারে। সেই লক্ষ্যে এলাকার অন্ধকার সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আলোকিত সমাজের কারিগর তৈরীর অন্যতম সফল একটি প্রতিষ্ঠান পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার।

জানা যায়, ১৯৯৩ সালে সেই সময়ের যুব সমাজের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকেরহাট গ্রন্থাগার। যা পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাধ্যমে উপজেলা জুড়ে হয়ে উঠে জ্ঞানের বাতিঘর এবং ভালো কাজের উদ্ভাবক। কিন্তু সেই সময়ের যুব সমাজের প্রতিনিধিরা নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হলে পেশাগত চাপের কারনে গণগ্রন্থাগারকে টিকিয়ে রাখতে পারে নাই। যার ফলে প্রায় ১১ বছর বন্ধ ছিল পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার। এতে পুরোনো স্থাপনা ও বই সবই হারিয়ে যায়।

কিন্তু যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচো, ঋণ করে হলেও ঘি খাও। মানুষের মনে এ বাণীটি গেঁথে গেছে বলে মনে হয়। কারণ উল্লাস, আনন্দ, সুখ, ভোগ ইত্যাদি জৈবিক প্রবৃত্তি মানুষকে অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। আর যৌবন হল এই অপরাধ সংঘটনের প্রকৃষ্ট সময়। তাই যুবসমাজকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা এখন ভাবার বিষয়। কেননা যারা পুরনো ধ্যান-ধারণা নিয়ে চলে এবং কূপমণ্ডূকতার আশ্রয় নেয়, তাদের দ্বারা সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাঙালি জাতির আছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আর এ ধারা চলতেই থাকবে। যুবসমাজই এ সংগ্রামের অগ্রনায়ক। উপজেলার পাকেরহাট এলাকার এই ছাত্র ও যুবসমাজের হাত ধরেই আবার নতুন উদ্যমে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী আংগারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন ভবনের টিন শেড একটি কক্ষে যাত্রা শুরু করে পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার। যা এখন প্রশংসনীয় প্রতিষ্ঠান।

একটি সুদক্ষ ও কর্মঠ পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার আজ হয়ে উঠেছে ইতিবাচক পরিবর্তনের সহায়ক।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখানে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, শিশু কিশোরদের বই থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, বিনোদন, ধর্মীয়, রাজনীতি, অর্থনীতি,উপন্যাস, প্রবন্ধ, রচনা সমগ্র, জীবনী, ছোট গল্প, কবিতাসহ প্রায়.. টি বই রয়েছে । পছন্দের বই সহজে খুঁজে পেতে ক্যাটাগরি অনুযায়ী আলাদা আলাদা বুক সেলফে সাজানো হয়েছে এ সকল বই। যেগুলো উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পেয়েছে গণগ্রন্থাগার।

প্রতিদিন স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, চাকরি প্রত্যাশী যুবক-যুবতীসহ অনেক মানুষই জ্ঞান অন্বেষণ করতে আসেন এখানে। এই গণগ্রন্থাগারে বই পড়েই অনেক যেমন জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন তেমনি অনেকেই এখন সরকারী-বেসরকারী চাকরি করছেন।

এখানে আছে সদস্য হওয়ার সুযোগ যেটিতে নাম নিবন্ধন করে বাড়িতে নিয়ে গিয়েও বই পড়ার সুযোগ পাবেন। আর রেজিস্ট্রেশন খাতায় দৈনিক পাঠক হাজিরা করা হয়। পরম যত্ন আর গভীর ভালোবাসায় পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার আগলে রাখেন স্বেচ্ছাসেবকরা।

পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার বই পড়ার পাশাপাশি নানা ধরনের জ্ঞান অন্বেষণী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এরমধ্যে দিবস পালন, বৃক্ষরোপণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, চিত্রাংকন ও রচনা প্রতিযোগিতা এবং সমাজসেবা মূলক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য।

আরিফ ইসলাম নামে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ২-৩ বছর থেকে এখানে নিয়মিত আসি। গণগ্রন্থাগারে বিভিন্ন ধরনের বই থাকে বাড়িতে যেটি একত্রে পাওয়া ব্যয়বহুল। তাই বই প্রেমীদের বইয়ের তৃপ্তি মেটাতে এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক এই গণগ্রন্থাগার খুব গুরুত্বপূর্ণ।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিমাংশু রায় বলেন, পাকেরহাট গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিন আসার চর্চা করোনাকালীন সময় থেকে। লকডাউনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ তাই বাসা থেকে এখানে নিয়মিত যাওয়া আসা এবং সেখানে বসা। বিভিন্ন বই পড়ার পাশাপাশি এখানে বসে অনেক সিনিয়র ভাইদের সাথে যে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা সেটার জন্য এরকম একটা প্লাটফর্ম তৈরি করা আসলেই মহৎ এবং অতীব প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এজন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটির সকল সদস্যকে।

পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম শাওন বলেন, গণগ্রন্থাগার জ্ঞানের আলোর ফেরিওয়ালা। সমাজের প্রতিটি মানুষকে জ্ঞানের আলোতে আলোকিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যার প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে একটি সমাজের সঠিক সংস্কৃতি চর্চায়, অসাম্প্রদায়িকতা,নৈতিকতা ও ভদ্রতায়।

পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাওলাদার বলেন, গণগ্রন্থাগার যেভাবে ছাত্রদের বই পড়ার আগ্রহ তৈরীতে কাজ করছে। তা সত্যিই ভালো লাগার মত। তবে সময়ের সাথে গ্রন্থাগারের জন্য আরো বই, বই রাখার সেল্ফ, বসার ব্যবস্থা উন্নত করা দরকার।

পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটির সভাপতি রাশেদ মিলন বলেন,প্রথমত, আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। ২০১৭ সালে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর অনেক চড়াই-উত্তরাই পেরিয়ে পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার আজকের অবস্থানে। পাঠকদের নিয়েই গ্রন্থাগারের মূল কাজ পরিচালিত হয়। এছাড়াও শিক্ষা, সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলা, সামাজিক সংস্কার, সর্বোপরি বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার কাজ করে চলছে। গ্রন্থাগারের প্রাণ হচ্ছে তাঁর পাঠক। পাঠিক সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন পাঠক সৃষ্টি এবং পাঠকদেরকে আধুনিক বইয়ের সুবিধা পৌচ্ছে দিতে আমরা চেষ্টা করছি।

তিনি আরো বলেন, এছাড়াও পাকেরহাট গণগ্রন্থাগারের সকল কার্যক্রমে পাঠক এবং গ্রন্থাগারের শুভাকাঙ্ক্ষী, বিভিন্ন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান আমাদের সহযোগীতা করে থাকেন। এক্ষেত্রে আমাদের ইউএনও খানসামা মহোদয় সর্বাগ্রে। তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।

আংগারপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, বই পড়ার মাধ্যমে আমাদের গ্রামের ছাত্র ও যুব সমাজের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আজেবাজে আড্ডা না দিয়ে গণগ্রন্থাগারে সময় দিচ্ছে। যা তাদের বিভিন্ন আসক্তি থেকে দূরে রাখছে। এরকম একটি চমৎকার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য পাকেরহাট গণগ্রন্থাগার সংশ্লিষ্টদের সাধুবাদ জানাই।

ইউএনও আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম বলেন, গণগ্রন্থাগার সমাজের যেকোন ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজ করে। আর মানুষের বুদ্ধি ও মননের অনুশীলনের প্রয়োজনে মানুষ জ্ঞান আহরণ করে। এই জ্ঞান আহরণের দুটো উপায়। একটি দেশভ্রমণ, অন্যটি গ্রন্থপাঠ। দেশভ্রমণ ব্যয়সাপেক্ষ তাই সবার জন্য সম্ভব নয়। সে তুলনায় জ্ঞান আহরণের জন্য গ্রন্থপাঠ প্রকৃষ্টতম উপায়। কিন্তু জ্ঞানভান্ডারের বিচিত্র সমারোহ একজীবনে সংগ্রহ করা ও পাঠ করা সম্ভব হয় না। এই অসাধ্য সাধন কিছুটা হলেও সম্ভব হয় গ্রন্থাগারের মাধ্যমে। তাই এই মহতি উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ।

তিনি আরো বলেন, প্রতিষ্ঠানটির মানোন্নয়নে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা পাশে থাকবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য