আত্মসমর্পণ করতে চাওয়া ২২ আফগান সেনাকে হত্যা করেছে তালেবান

আত্মসমর্পণ করতে চাওয়া ২২ আফগান সেনাকে হত্যা করেছে তালেবান

আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তানের ফারিয়াব প্রদেশের দাওলাত আবাদ শহরে গত মাসে আত্মসমর্পণ করতে চাওয়া ২২ আফগান সেনাকে গুলি করে হত্যা করেছিল তালেবান যোদ্ধারা।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে সংযুক্ত এক ভিডিওতে ১৬ জুনের ওই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য উঠে এসেছে। ভিডিওতে সব শব্দ স্পষ্ট শোনা গেলেও, যে ক্যামেরায় এটি ধারণ করা হয়েছিল, সেটি স্থির ছিল না।

ভিডিওতে একটি ভবন থেকে কয়েকজন বেরিয়ে আসার পর ‘আত্মসমর্পণ, কমান্ডোরা, আত্মসমর্পণ’ শোনা যায়; দুই হাত উপরে তুলে বেরিয়ে আসা এ যোদ্ধারা যে নিরস্ত্র ছিল, ভিডিওতে তা স্পষ্ট দেখা গেছে।

আত্মসমর্পণের ওই অনুরোধ কাজে লাগেনি। কয়েক মুহুর্ত পরই সেনাদের দিকে ছুটে যায় একের পর এক বুলেট, তারা যখন লুটিয়ে পড়ছিলেন, সেসময় বহুকণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ মহান) ।

এখানে নিহতরা সবাই ছিলেন আফগান বিশেষ বাহিনীর সদস্য আর তাদের হত্যাকারীরা তালেবান যোদ্ধা ছিলেন বলে জানিয়েছে সিএনএন।

সিএনএন জানিয়েছে, তারা এ হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও সংগ্রহ করে যাচাই করে দেখেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও কথা বলেছে।

ওই প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দাওলাত আবাদ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তুমুল লড়াইয়ের এক পর্যায়ে আফগান কমান্ডোদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে তালেবান যোদ্ধারা তাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।

৪৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে এক পথচারীকে স্থানীয় পশতু ভাষায় তালেবানদের উদ্দেশ্যে ‘গুলি করো না, ওদেরকে গুলি করো না, আমি অনুরোধ করছি ওদেরকে গুলি করো না’ বলতে শোনা যায়।

“কীভাবে তোমরা পশতুনরা আফগানদের হত্যা করছো?,” ভিডিওতে ওই পথচারীকে এমনটাও বলতে শোনা গেছে।

ভিডিওটির একেবারে শেষ দিকে ক্যামেরার বাইরে থাকা একজনকে ‘তাদের সব নিয়ে নাও’ বলতে শোনা যায়।

অন্য এক ভিডিওতে একজনকে ‘ওর শরীরের বর্ম খুলে নাও’ বলতে শোনা যায়। এই ভিডিওতে তালেবান এক যোদ্ধাকে এক আফগান কমান্ডোর দেহ থেকে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম খুলে ফেলতেও দেখা গেছে।

পরে রেড ক্রস ২২ আফগান কমান্ডোর মৃতদেহ উদ্ধারের কথা জানায়।

আফগান সেনারা আত্মসমর্পণ করতে চাইলে তাদেরকে সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদেরকে বাড়িও চলে যেতে দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তালেবানরা নিজেদেরকে যেভাবে হাজির করতে চাইছে, দাওলাত আবাদের ঘটনা তার পুরোপুরি বিপরীত।

দাওলাত আবাদের ওই যুদ্ধের তিনদিন পর পোস্ট করা এক ভিডিওতে তালেবানরা তাদের জব্দ করা সামরিক ট্রাক ও অস্ত্রশস্ত্র দেখিয়েছিল। ভিডিওতে সিআইএর প্রশিক্ষিত একজনকে জীবিত আটক করার কথাও জানানো হয়।

আত্মসমর্পণ করতে চাওয়া আফগান সেনাদের গুলি করে মারার যেসব ভিডিও সিএনএনের কাছে আছে সেগুলোকে ‘ভুয়া’ ও আফগান সরকারের ‘মিথ্যা প্রচার’ বলে অভিহিত করেছে তালেবানরা। অন্যদের আত্মসমর্পণে অনুৎসাহিত করতেই আফগান সরকার এ ‘মিথ্যা প্রচার’ চালাচ্ছে, বলছে তারা।

তালেবানের এক মুখপাত্র বলেছেন, দাওলাত আবাদে যুদ্ধের পর আটক ২৪ কমান্ডো এখনও তাদের জিম্মায় আছেন। যদিও এ বক্তব্যের সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি তিনি।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তালেবান মুখপাত্রের ওই বক্তব্য উড়িয়ে দিয়েছে। কমান্ডোদের তালেবানরাই হত্যা করেছে বলেও জানিয়েছে তারা।

দাওলাত আবাদের ঘটনা নিয়ে সিএনএন যাদের সাক্ষ্য নিয়েছে, সেই প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই বলেছেন, আফগান কমান্ডোদের ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী একজন জানান, আফগান সেনারা বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্ক নিয়ে শহরে প্রবেশ করলেও দুই ঘণ্টা যুদ্ধের পর তাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায় এবং তারা বিমান বাহিনীর সহায়তাও পায়নি।

“তালেবানরা কমান্ডোদের ঘিরে ফেলে, পরে তাদেরকে সড়কের মাঝখানে নিয়ে আসে এবং সবাইকে গুলি করে,” বলেন ওই প্রত্যক্ষদর্শী।

তিনি জানান, যারা গুলি করেছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজন বিদেশি থাকতে পারে বলেও তার সন্দেহ, কেননা তারা নিজেদের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলছিল, তা তিনি বুঝতে পারেননি।

একই মত অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শীরও। তিনি জানান, আফগান কমান্ডোরা তখন যুদ্ধ করছিল না, তারা হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণ করেছিল, তালেবানরা তাদের উপর গুলি চালায়।

“তালেবানরা যখন কমান্ডোদের ওপর গুলি চালানো শুরু করে তখন আমি খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সেদিন সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। আমি আমার দোকানে লুকিয়ে ছিলাম,” বলেন স্থানীয় এক দোকানদার।

দোকানের একটা ফুটো দিয়ে তিনি কমান্ডোদের উপর তালেবানদের গুলি চালানোর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

স্থানীয় কর্মকর্তারা অবশ্য বিমান বাহিনীর সহায়তা বা আরও সামরিক সহায়তা ছাড়া এভাবে দাওলাত আবাদে এলিট কমান্ডোদের পাঠানোর ঘটনার সমালোচনা করছেন।

যারা এখানে এসেছিল, তারা এ এলাকা ভালোভাবে চিনতো না, কোন কোন জেলা তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে তাও তারা জানতো না, বলেছেন ফারিয়াব প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আবদুল আহাদ আইলবেক।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য