আমরা আর নদী খনন চাই না, নদী যেমন ছিল তেমন করে দিন

আমরা আর নদী খনন চাই না, নদী যেমন ছিল তেমন করে দিন

রংপুর

নদী খনন করে করে যদি আমাদের ক্ষতির পরিমানটাি বেশি হয় তাহলে আমরা সেই নদী খনন চাই না, আমাদের এই সতি নদীটি আগে যেমন ছিল আবার তেমন করে দেয়া হোক। এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন জেলার আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের সতি নদী পাড়ের বাসিন্দা ময়না বেগম।

তিনি আরো বলেন, নদীটি খননের কথা শুনে প্রথমে খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সেই খুশির আনন্দটাই এখন মাটি হবার পথে। ঠিকাদার রেদোয়ান ভাইকেকে ভাল লোক মনে করে ছিলাম। কিন্তু আমাদের সেই ধারনা ভুল ছিল। লোকটা দেখলাম আমাদের উপকারের বদলে ক্ষতিই বেশি করেছে। নদীটি যেমন ছিল আবার তেমন করে দেয়ার দাবী জানাচ্ছি।

৫টি উপজেলা লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম নিয়ে লালমনিরহাট জেলা গঠিত। তিস্তা, ধরলা, রতœাই ও (সতী-স্বর্ণামতি-ভাটেশ্বরী একই নদী ভিন্ন ভিন্ন নাম) নদীসহ কয়েকটা নদী এই জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

(সতী-স্বর্ণামতি-ভাটেশ্বরী) নদীটির আয়োতন মাত্র ৩৫ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১৫০ মিটার এবং নদীটি সর্পিলাকার। বর্তমানে নদীটির বেশির ভাগ যায়গা ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমের আগেই দেখা দেয় বন্যা। অপরদিকে সুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় নদী পাড়ের জমি গুলো চাষাবাদে অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে ঢাকার এসএএসআই গ্রুপ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এই সতী নদীর ১৭ কিলোমিটার খননের কাজ পায়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে হাতিবান্ধা উপজেলার পারুলিয়া বাজারের রেদোয়ান আহমেদ নামে একজনকে সতী নদী খননে এলাকাভিত্তিক এজেন্ট সাব-ঠিকাদার নিয়োগ করে এসএএসআই গ্রুপ।

প্রথমে ভেকু (এসকেভেটর) দিয়ে নদী খননের কাজ শুরু করে। শুরুটা ভাল হলেও কাজ চলাকালিন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট রেদোয়ান আহমেদ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ম্যানেজ করে কাজ বাবদ কোটি টাকা তুলে নেয়।

এরই মাঝে গত বছরের মার্চ মাসে নভেল করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে সরকার লকডাউন ঘোষনা করে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট রেদোয়ান সতী নদী খনন কাজ হ-জ-ব-র-ল করে বন্ধ করে দেয়। নদী খননের সাব-ঠিকাদারদের কোন টাকা না দিয়ে তাদের জানায় আগামী অর্থ বছর কাজ করব আপনারা চিন্তা করিয়েন না। নদী খননের জন্য ভাড়া করে আনা ভেকু (এসকেভেটর), নাইট গার্ড ও লেবারদের পাওনা টাকা না দিতে পারায় এবং টাকা ধার করে নদী খননের কাজ করে ধারের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় সাব-ঠিকাদাররা দেউলিয়া হয়ে যায়।

চুক্তি অনুযায়ী এই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোড়ে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নদীর দু পাড়ের বারোটা বাজিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। সেই সাথে নদী থেকে পাড় ভরাটের জন্য উত্তোলন করা বালু বিক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট রেদোয়ান আহম্মেদ এর বিরুদ্ধে।

সরেজমিন তদন্তে গিয়ে দেখা যায়, তার চেয়েও আরো ভয়াবহ চিত্র। গত বছর ভেকু দিয়ে নদীর মাটি কেটে উপরে তুলে রাখা হয়। এ বছর বৃষ্টিতে সেই মাটি ধুয়ে আবার নদীতে চলে গেছে। কোথাও কোখাও নদীর পাড় ভেঙ্গে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। যাহাতে ওই এলাকায় বসবাসরত জনগন বন্যায় ঘর বাড়ী তলিয়ে যাবার আশঙ্কা করছে।

এসএএসআই গ্রুপের এজেন্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড এর কর্মকর্তাদের টাকার বিনিময়ে কাজ না করে মোটা টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করারও অভিযোগ করেন অনেকেই।

সতী নদী পাড়ের সারপুকুর এলাকার আশরাফুল বলেন, নদী খননের আগেই নদীটি ভালই ছিল। নদী খনন কাজ শুরু হওয়ার পর নদীর আংশিক খনন করে বালু বিক্রয়ের মহাৎসবে মেতে উঠে। আর এ সবই হচ্ছে ঠিকাদারের এজেন্ট রেদোয়ান আহমেদের নেতৃত্বে। তিনি নদী পাড়ের বালু লোক দিয়ে বিক্রয় করছেন ফলে নদীর পাড় বাঁধতে যে মাটির প্রয়োজন হবে তা আর পাবেন না।

তাই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলাকার মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে অনেক যায়গায় রেদোয়ান আহমেদ লোক দিয়ে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর ভূগর্ভস্থ মাটি ও বালু তুলে পালা করছেন। কিন্তু কিছু দিন যাবার পড়েই ট্রলি লাগিয়ে আবার বিক্রয় শুরু করেন। ফলে নদী পাড়ের ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আবার কোথাও কোথাও সতী নদীর প্রস্থ বেড়ে যাচ্ছে।

এসএএসআই গ্রুপের এজেন্ট রেদয়ান আহমেদের বক্তব্য নিতে তার সেল ফোনে অনেকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় সহকারি প্রকৌশলী আবদুল কাদের সেল ফোনে বার বার ফোন দিয়ে তাকে পাওয়া যায় নি।

লালমনিরাট জেলা প্রকাশক আবু জাফর মুঠো ফোনে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ড্রেজার মেশিন বসাতে নিষেধ করা হয়েছে।তার পরও যদি কেও এমনটি করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য