দিনাজপুরে করোনার অ্যান্টিজেন পরীক্ষার অনুমতি পাচ্ছে না বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো

দিনাজপুরে করোনার অ্যান্টিজেন পরীক্ষার অনুমতি পাচ্ছে না বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো

দিনাজপুর

দিনাজপুর সংবাদাতাঃ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পরও দিনাজপুরে বেসরকারি পর্যায়ে করোনার অ্যান্টিজেন পরীক্ষার অনুমতি মিলছে না। সরকারি পর্যায়ে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার কিট গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় পৌঁছালেও জুন মাসের শেষ দিকে এসে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু করে। সেই সঙ্গে নমুনা দিয়ে প্রতিবেদন পেতে উপসর্গধারী রোগীরা বিলম্ব ও ভোগান্তির অভিযোগ করছেন।

দিনাজপুর বে-সরকারী স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও ডায়াগনেষ্টিক সেন্টার এসোসিয়শনের সভাপতি ডাঃ গোলাম মোস্তফা জানান, দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলার প্রেক্ষিতে গত ২৭ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব বিলকিস বেগম স্বাক্ষরিত একটিপত্রে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ৭০০ টাকা ফি গ্রহণ করে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু দিনাজপুরে ৫৫টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে অনেকগুলোর পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও তারা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে অনুমতি পাচ্ছে না।

জেলা সিভিল সার্জন আবদুল কুদ্দুস এ ব্যাপারে বলেন, সরকারিভাবে বিনা মূল্যে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। তারপরও সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় যেহেতু বেসরকারিভাবে অনুমতি দেয়া হয়েছে, এটা চালু করা একটু সময়ের ব্যাপার। প্রতিষ্ঠান থেকে আবেদন করতে হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। সেখান থেকে পাসওয়ার্ড সরবরাহ করলে তারা অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করতে পারবে। এই পরীক্ষা করতে গেলে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব থাকতে হয়। সেখানে একজন অধ্যাপক থাকবেন। তা ছাড়া তাদের মনিটরিং করার জন্য তেমন জনবলও নেই। সিভিল সার্জন বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দেশিকা এই সপ্তাহের মধ্যে পাব। তারপর যাদের সক্ষমতা আছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে জানানো হয়, জেলা শহরে ‘ক্যাটাগরি এ’ এবং ‘ক্যাটাগরি বি’ পর্যায়ে পড়ে এমন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত কোম্পানির কিট সংগ্রহ করে করোনার অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করতে পারবে। আরও বলা হয়, যেসব প্রতিষ্ঠানে রুটিন প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজি পরীক্ষা, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি, হিস্টোপ্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, হরমোন পরীক্ষা, রেডিওলজি ও ইমেজিং সেবা, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই সুবিধা থাকবে, সেসব প্রতিষ্ঠান পড়বে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে। আর সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই সুবিধা ব্যতীত বাকি সেবাগুলো থাকলে সেই প্রতিষ্ঠান পড়বে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ক্যাটাগরি বিবেচনায় জেলায় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ‘এ’ ক্যাটাগরিতে এবং ‘বি’ ক্যাটাগরিতে আছে তিনটি প্রতিষ্ঠান। যদিও দিনাজপুর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান দাবি করেন, শহরের ২০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করার সক্ষমতা রাখে।

জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, জেলায় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে কী আছে, না আছে, সেই বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। কোনটি কোন ক্যাটাগরির পর্যায়ে এমন কোনো হিসাব তাঁর দপ্তরে নেই।

বেসরকারি কয়েকটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালকের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা বলেন, জেলার ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ল্যাব টেকনিশিয়ান রয়েছেন, চিকিৎসক রয়েছেন, ল্যাব সুবিধা রয়েছে। তাহলে দ্রুত অনুমতি দিলে ক্ষতি কোথায়? তাঁরা বলেন, প্রতিনিয়ত মানুষ তাঁদের কাছে করোনা পরীক্ষা করাতে চাইছেন, তাঁরা এই সেবা দিতে পারছেন না।

দিনাজপুর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের এই সংকটকালে আমরা সরকারের পাশে দাঁড়াতে চাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠি পেয়ে সিভিল সার্জনের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি এখনো অনুমতি দেননি। তবে আজ–কালের মধ্যে তাঁর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা আছে।’ তিনি বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে করোনার অ্যান্টিজেন পরীক্ষা হচ্ছে। সেখানে তো কোনো ল্যাব বা মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক প্রয়োজন হচ্ছে না। অথচ আমরা অনুমতি পাচ্ছি না।’

দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ আরটি-পিসিআর ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে ১৮৮টি। ফলে নমুনা দিয়েও পরীক্ষার ফলাফল পেতে দেরি হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তিদের। এই ল্যাব থেকে সপ্তাহে ২ দিন দেড় থেকে ২ হাজার নমুনা পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়। ল্যাবের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক যোগেন্দ্র নাথ সরকার জানান, সর্বশেষ আজ বুধবার ১ হাজার ৭৫৪টি নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলেন, ৩ জুলাই নমুনা দিয়েছেন। ৫ দিন হয়ে গেল এখনো রিপোর্ট পাননি। রিপোর্ট না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে দুশ্চিন্তা। সেই সঙ্গে কী চিকিৎসা করাবেন, বুঝতেও পারছেন না তিনি।

এই পরিস্থিতিতে জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার ওপরে জোর দেয়া প্রয়োজন। সিভিল সার্জন জানান, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০টি অ্যান্টিজেন পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা আছে। ১০ জুন পর্যন্ত ১৩টি উপজেলায় অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে জেলায় ৪২৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৮ জনের করোনা পজিটিভ ফলাফল এসেছে।

এ হিসাবে প্রথম দুই মাসে ১৩টি উপজেলায় দৈনিক গড়ে ১০টির নিচে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিজেন নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে হাকিমপুর উপজেলায় ২২২ জনের। গত ২৫ দিনে বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ হাজার ৮৮৫ জনের অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় ৬৬২ জনের করোনা পজিটিভ ফলাফল আসে।

গত এক মাসে জেলায় করোনা শনাক্তের হার ২১-৪৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। সদর উপজেলায় এই হার ওঠানামা করেছে ৪০দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে। এত দিন জেলায় করোনার নমুনা সংগ্রহের বুথ ছিল শুধুমাত্র এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। উপজেলাগুলোতে বুথ ছাড়াই নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে সদর উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে নতুন একটি বুথ খোলা হয়েছে। জেলায় নমুনা দেওয়ার হার বেড়েছে। গত ৪ সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০০-৬০০ জন পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেভাবে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে পরীক্ষার হার বাড়ানো খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য