যুক্তরাষ্ট্র কি ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের সঙ্গে অঘোষিত যুদ্ধে

যুক্তরাষ্ট্র কি ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের সঙ্গে অঘোষিত যুদ্ধে

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়াদের বিভিন্ন স্থাপনায় যে হামলা চালিয়েছেন, তা প্রথম না হলেও, তার মাত্রই শুরু হওয়া মেয়াদে এটি সম্ভবত শেষ হামলাও নয়।

বাইডেনের অনুসারী অনেক ডেমোক্র্যাটের কাছেই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই ধরনের হামলা আর পাল্টা হামলার যে পরিমাণ তা কী অঘোষিত যুদ্ধ নয়?

যদি তেমনটাই হয়, তাহলে কংগ্রেসের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকছে; দুই দশকের ‘অনন্ত লড়াইয়ের’ পর এ ধরনের কোনো কিছু হলে তা রাজনৈতিকভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে বলেও মত তাদের।

“যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ওপর যে গতিতে হামলা হচ্ছে, তার পাল্টায় আমাদের প্রতিক্রিয়ার যে ক্রমবর্ধমান মাত্রা- তা যে যুদ্ধ নয় সে বিষয়ে পাল্টা যুক্তি দেওয়া খুবই কঠিন,” বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন সেনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ একটি সাব কমিটির নেতৃত্বে থাকা ক্রিস মারফি।

ডেমোক্র্যাট এ সেনেটর বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে মার্কিন জনগণ সত্যিকার অর্থে তার ভার নিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে আমরা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি।”

গত বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় শীর্ষ এক ইরানি জেনারেল নিহত হওয়ার পর দুই দেশ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরাকের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শতাধিক মার্কিন সেনার ‘মস্তিষ্কে আঘাতজনিত সমস্যা’ দেখা দেয়।

মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকে।

সর্বশেষ রোববার যুক্তরাষ্ট্রের জঙ্গিবিমানগুলো সিরিয়ার দুটি এবং ইরাকের একটি এলাকায় মিলিশিয়াদের অস্ত্রাগার এবং অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালায়।

ইরাকে মার্কিন সেনা ও তাদের ব্যবহার করা স্থাপনায় মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার পাল্টায় এ হামলা চালানো হয় বলে ভাষ্য পেন্টাগনের (যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়) ।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টায় সোমবার ইরাকের মার্কিন সেনারা রকেট হামলার মুখে পড়লেও কেউ হতাহত হয়নি। যেসব স্থান থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী সেসব স্থান লক্ষ্য করে সেসময় কামানের গোলাও ছুড়েছে।

“অনেকেরই ধারণা, ‘অনন্তকালের যুদ্ধ’ কথাটা মূলত আবেগি শব্দচয়ন। কিন্তু এটি আদতে রোববার যেমনটা দেখেছি, তেমন হামলার শালীন বর্ণনা। কোনো কৌশলগত লক্ষ্য নেই, লড়াইয়ের শেষ দেখা যাচ্ছে না; কেবল স্থায়ী উপস্থিতি রাখা আর ইটের বদলে পাটকেল মারা,” টুইটারে এমনটাই বলেছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের আবাসিক ফেলো এম অ্যাশফোর্ড।

হোয়াইট হাউস বলছে, রোববারের বিমান হামলা করাই হয়েছে, ভবিষ্যতে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে মিলিশিয়াদের হামলা ঠেকাতে ও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কমিয়ে আনতে।

সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে সামরিক বাহিনীর ‘কমান্ডার ইন চিফের’ ক্ষমতা দেওয়ায় এ ধরনের হামলাগুলোকে আইনসিদ্ধ বলছেন খোদ বাইডেনও।

“ধারা দুই অনুযায়ী আমার এ ধরনের নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার আছে। পার্লামেন্টের যারা এটি স্বীকার করতে অনিচ্ছুক, তারাও একথা মানবে,” বলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনি উপদেষ্টা কার্যালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ব্রায়ান ফিনুকেন বলেছেন, আগের প্রশাসনগুলোর মতো বাইডেন প্রশাসনও এ ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলাকে চলমান কোনো যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখছে না।

তিনি এ দৃষ্টিভঙ্গিকে অভিহিত করেছেন ‘সালামি-স্লাইস’ নামে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির মাইকেল নাইটস বলছেন, মিলিশিয়ারা এখন যেভাবে ড্রোনের ব্যবহার করছে, তা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। জিপিএসের মাধ্যমে তারা সুনির্দিষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাকে লক্ষ্য বানাচ্ছে।

“সংখ্যা ও গুণগত মান উভয় দিক থেকেই ইরাকে জোট বাহিনীর ওপর মিলিশিয়াদের হামলা বাড়ছে। এটা ঠেকানো না গেলে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে,” বলেছেন তিনি।

তবে একই প্রতিষ্ঠানের ফিলিপ স্মিথের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চল ছেড়ে যেতে বাধ্য করার পাশাপাশি বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনের মতো বিভিন্ন অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যে তারা যে দক্ষ হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র, ইরাকি সরকার ও অন্যদের এ সংক্রান্ত বার্তা দেওয়াও মিলিশিয়াদের অন্যতম লক্ষ্য।

মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা এখন প্রেসিডেন্টের হাত থেকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কিছু ক্ষমতা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কাজ করছেন; ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় দলের আগের প্রেসিডেন্টরাই এসব ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ইরাক, সিরিয়া ও অন্যান্য স্থানে হামলাকে জায়েজ করেছিলেন।

যদিও যুদ্ধ সংক্রান্ত ক্ষমতা কমলেও বাইডেন বা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রেসিডেন্টের ঠিকই প্রতিরক্ষামূলক বিমান হামলা চালানোর এখতিয়ার থাকবে।

সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিন বিমান হামলা নিয়ে বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা দলের কাছ থেকে ব্রিফিং পাওয়ার পরও সেনেটর মারফি বলছেন, তার দুশ্চিন্তা রয়েই গেছে।

ইরাকে মার্কিন বাহিনী পাঠানো হয়েছিল ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে লড়াই করতে, ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ার সঙ্গে নয়, বলেছেন তিনি।

“কংগ্রেসে যদি ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে হামলার অনুমোদন পেতে সমস্যা হয়, তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে আমাদের ভোটটাররা এটা (যুদ্ধ) চায় না। এ বিতর্কে এই বিষয়টিই অনুপস্থিত,” বলেছেন এ ডেমোক্র্যাট।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য