লুলু ভাইয়ের অমলিন হাসির সেই সব স্মৃতি

লুলু ভাইয়ের অমলিন হাসির সেই সব স্মৃতি

দিনাজপুর সম্পাদকীয়

১৩ জুন ২০২১ তারিখ সকাল সাড়ে ৮টায় রংপুরের পাগলাপীর এলাকার পানবাজার সংলগ্ন একটি গ্রামে আমার একজন আত্মীয়ের সাথে কথা বলছিলাম। সেখানে আমার স্ত্রীও ছিলেন। সেই আলাপের সময় দৈনিক তিস্তা সম্পাদক মিজানুর রহমান লুলু’র মৃত্যু সংবাদ পেলাম। মোবাইল ফোনে দুঃসংবাদটি জানালেন আজকের দেশবার্তা সম্পাদক চিত্ত ঘোষ। তিনি সকালে না জানালে এই সংবাদ পেতে অনেক দেরী হতো। কারণ ঐ এলাকায় তখন মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না। ফলে ফেসবুকে জানার যে উপায়, তার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। মৃত্যু সংবাদ জানার পরে পরেই দিনাজপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়ে বাড়িতে পৌঁছাই দুপুর সাড়ে ১২টায়। গোসল সেরে বাদ জোহর বালুবাড়ি মসজিদে জানাজায় এবং বাদ আছর পাঁচবাড়ি গোরস্থানে দাফনে শরীক হই।

লেখকের কয়েকটি বই হাতে দৈনিক তিস্তা সম্পাদক মিজানুর রহমান লুলু। এটাই লুলু ভাইয়ের সাথে তার বাড়ির সামনে লেখকের তোলা শেষ ছবি।

লুলু ভাই আমার সাংবাদিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি আমার প্রথম বার্তা সম্পাদক, প্রথম সম্পাদক এবং আমার সাংবাদিকতার শিক্ষাগুরু। অনেকটা হাতে কলমে শেখানোর মত করেই আমাকে সাংবাদিকতা শিখিয়েছেন।

সেই প্রথম দিনের কথা মনে আছে, যেদিন দিনাজপুরের আরেক সাংবাদিক কামরুল হুদা হেলাল আমাকে দৈনিক প্রতিদিন অফিসে নিয়ে গেলেন এবং পরিচয় করিয়ে দিলেন মিজানুর রহমান লুলুর সাথে। সেটা সম্ভবত ১৯৮২ সালের মাঝামাঝি। লুলু ভাই তখন প্রতিদিনের বার্তা সম্পাদক। তার সাথে পরিচয় করালেন হেলাল ভাই। বললেন, আমার ছোট ভাই, সাংবাদিক হতে চায়।

লুলু ভাই তখন টেবিলে বসে কিছু একটা লিখছিলেন। হেলাল ভাইয়ের কথায় একবার চোখ তুলে তাকালেন। তারপর আবারো নিজের কাজে মনোনিবেশ। লিখতে লিখতেই প্রশ্ন করলেন, সাংবাদিক হবা?
হতে চাই। বললাম আমি।

ঠিক আছে, তুমি রিক্সা ভাড়ার উপরে আগে একটা নিউজ করো। এই যে চার আনা থেকে আট আনা, আট আনা থেকে এক টাকা, এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে রিক্সা ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে, রিক্সা ভাড়ার এই দৌরাত্ম নিয়ে নিউজ করো। তোমার জন্য প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট এটা।
লুলু ভাইয়ের দেয়া প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আমার সাংবাদিকতার শুরু। নিউজটি দুই কলামে বক্স করে ব্যাক পেজে প্রকাশ করা হয়েছিল। লুলু ভাই যখন যা বলতেন সেটা করতাম। নিজেও তথ্য সংগ্রহ করে নিউজ লিখতাম। কিন্তু তিন মাস যেতে না যেতেই লুলু ভাই প্রতিদিন ছেড়ে দিলেন। তিনি নাই, ফলে আমার সাংবাদিকতায় একটা ছন্দ পতন হলো। ছন্দপতন এই কারণে যে, তখন প্রতিদিনে সৈয়দ ওয়াজেদ আলী, রঞ্জন কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, চিত্ত ঘোষসহ আরো যারা কাজ করতেন, তাদের কারো সাথে আমার সেই রকম কোন হৃদ্যতা ঐ াতিন মাসে তৈরী হয় নাই। তারা আমাকে তেমন পাত্তাও দিতেন না। ফলে প্রতিদিন পত্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম এবং আপাতত আমার সাংবাদিকতায় যবনিকাপাত এলো।
এর কয়েক মাস পর একদিন বিকাল বেলা ঘাসিপাড়া হয়ে গনেশতলার দিকে হেঁটে যাচ্ছি। ঘাসিপাড়া প্রাইমারী স্কুলের কাছাকাছি যখন পৌচেছি, সেই সময় পেছন দিক থেকে আমার ঘাড়ে হাত রাখার স্পর্শ পেলাম। ঘুরে তাকাতে দেখি লুলু ভাই। তিনি ঘাড়ে হাত রেখেই বললেন, কি

সাংবাদিকতা করবে না?

বললাম, করতে তো চাই। কিন্তু আপনি তো নাই।

আমি নতুন পত্রিকা বের করেছি। দৈনিক তিস্তা। গনেশতলায় অফিস। তুমি আসো।
লুলু ভাই অফার দিলেন। তারপরেও তিস্তা অফিসে যেতে আরো কয়েক মাস লেগে গেল। সম্ভবত ১৯৮৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক তিস্তায় সাংবাদিক হিসেবে পরিপুর্ণভাবে কাজ শুরু করলাম।
সব বিষয়ে রিপোর্ট করতাম। তবে পলিটিক্যাল নিউজে আমার হাত ভাল বলে মনে করতেন লুলু ভাই। তাই রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের খবর করার জন্য আমাকে সব সময় প্রায়োরিটি দিতেন, অনেকের কাছে আমার প্রশংসাও করতেন।
কাজ করতে গিয়ে লুলু ভাইয়ের সাথে অনেক নৈকট্য তৈরী হয়েছিল। বড় ভাই, কিন্তু বন্ধুর মত ছিলেন। রসপ্রিয় মানুষ। হাস্য, কৌতুক করতেন। হাসির কথা বলতে ভাল বাসতেন। তার হাস্য-কৌতুক ফুটে উঠত ধনা-মনা চরিত্রে। ‘ধনা-মনা’ ছিল দৈনিক তিস্তার একটি নিয়মিত কলাম। এই কলামে ধনা ও মনা নামের দুইটি প্রতীকী চরিত্রের দুই-চারটি সংলাপ দ্বারা সমকালিন কোন অন্যায়, অস্বচ্ছ চরিত্র কিংবা ঘটনার সমালোচনা করা হতো। এটা তিস্তার জনপ্রিয় কলাম ছিল। লুলু ভাই নিজেই এটা লিখতেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখিও করতেন। ধনা-মনায় অনিবার্যভাবেই তিনি একটি কল্পিত ‘আড়িয়া’ নিয়ে আসতেন।

দৈনিক তিস্তা থেকে বিদায়ী ফুল দেয়ার সময় লুলু ভাই বলেছেন, তুমি যে আশায় তিস্তা ছাড়ছ, তা কোনদিন পুরণ হবে না। তারপরেই হাসির ফোয়ারা!

লুলু ভাই বাস্তব জীবনেও কৌতুক প্রিয়। কিছু কিছু ঘটনায় তার প্রতিফলন থাকত। আমার মনে আছে, একবার তিস্তা কার্যালয়ের নীচের সড়ক ধরে তিনজন মেয়ে গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। লুলু ভাই এবং আমি তিস্তার ছাদ থেকে তাদের হেঁটে যাওয়া দেখছিলাম। লুলু ভাই প্রশ্ন করলেন, ঐ যে মেয়ে তিনটা যাচ্ছে, এর মধ্যে কোন মেয়েটাকে তোমার ভাল লাগছে?

আমি মুচকি হাসলাম। বললাম, ঐ মেয়েটা, ডানেরটা।

কেন? লুলু ভাই প্রশ্ন করলেন। তার প্রশ্নের উত্তরে একটা কারণ বললাম। তিনি শুনলেন। তারপর বললেন, আমার পছন্দ ঐ মেয়েটা, মাঝেরটা। লুলু ভাই তার পছন্দেন কারণ ব্যাখ্যা করলেন। বেশ হাসি এবং মজা হলো আমাদের এই বিষয়টা নিয়ে। এই রকমই এক মজার মানুষ তিনি।

কৌতুক করতেন বলেই যে সিরিয়াস ছিলেন না, এমনটা কিন্তু নয়। বিশেষ করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এবং নেতৃত্বের বিষয়ে সিরিয়াস রোল প্লে করতেন। সাংবাদিকতার মাপকাঠিতে তিনি অনেক উচ্চতর ছিলেন। তবে নেতৃত্বের দ্বন্ধ তাঁকে কখনো লাইম লাইটে এনেছে, আবার অনেক আপনজনের থেকে দূরেও সরিয়েছে। তার পরেও একথা বলতে দ্বিধা নেইযে, লুলু ভাই ছিলেন অনন্য উচ্চতার এমন এক মানুষ, যার প্রতি খুব বেশি সময় নিয়ে অভিমান পুষিয়ে রাখা যেত না।

সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি এক ধরণের ভালবাসা ছিল লুলু ভাইয়ের। তিনি সাহিত্যের বিকাশ চাইতেন। সাংবাদিকতায় আসার অনেক আগের থেকে সাহিত্য চর্চা করতাম এটা জানা ছিল তাঁর। তাই আমাকে দৈনিক তিস্তায় সাহিত্য পাতা বের করতে উৎসাহিত করলেন। তার উৎসাহে প্রথমে ‘তিস্তা সাহিত্য’ নামের একটি সাপ্তাহিক পাতা বের করি। এই পাতায় নবীন-প্রবীণ বিভিন্ন লেখকের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ছাপা হতো। আজকে প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখকের প্রথম লেখা ছাপা হয়েছে তিস্তা সাহিত্যে। এই পাতা ভালভাবে চালু হওয়ার পর শিশু-কিশোরদের জন্য ‘শতফুল’ এবং মেয়েদের জন্য ‘জায়া-জননী’ পাতা বের করা হয়। তবে মেয়েদের লেখা তুলনামূলক কম আসার কারণে জায়া জননী সপ্তাহে একদিনের পরিবর্তে ১৫ দিনে একবার প্রকাশ করা হতো।

দৈনিক করতোয়া সহ বগুড়ার অনেক কাগজ অফসেটে আসার পর কোন কোন পত্রিকায় বিনোদন পাতা প্রকাশ হতে থাকে। বিনোদন পাতায় মূলত চলচ্চিত্রাঙ্গণের খবর, নায়ক-নায়িকাদের লাস্যময়ী ছবি, তাদেরকে নিয়ে ফিচার, প্রতিবেদন ইত্যাদি ছাপা হতো। লুলু ভাই আমাকে বললেন, তিস্তা বিনোদন বের করো।

আমি বললাম, বিনোদন তো লেটার প্রেসে হবেনা। অফসেটে ছাপা হতে হবে। এটা ব্যয়বহুল হবে।

কিন্তু লুলু ভাই শুনলেন না। বললেন, খুব বেশি ব্যয় হবে না। বগুড়ায় যাও, বিনোদান ছাপিয়ে নিয়ে আসো।

অতঃপর লুলু ভাইয়ের পিড়াপিড়িতে আমি বগুড়ায় গিয়ে দৈনিক করতোয়ার ন্যাশনাল মুদ্রণালয় হতে চার পৃষ্ঠার তিস্তা বিনোদন ছাপিয়ে আনি। এভাবে দুইবার বিনোদন ছাপিয়েছি বলে আমার মনে আছে। বিনোদনের মধ্যে নায়ক-নায়িকার ছবি ও খবর ছাপানোর পাশাপাশি দিনাজপুর ভিত্তিক বিনোদনমূলক কিছু খবরও ছাপা হয়েছিল।
লুলু ভাই আমাকে মাঝে মাঝে ‘চেতনা জুয়েল’ বলে সম্বোধন করতেন। এর কারণ হলো, দিনাজপুরের এমন কিছু বিষয় নিয়ে আমি লিখেছি যা হয়ত মানুষ ভুলে গিয়েছিল। উদাহরন হিসেবে বলা যায়, ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণে সংঘটিত বিস্ফোরণে অর্ধ সহ¯্র মুক্তিযোদ্ধার মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি। এতবড় ট্র্যাজেডির বিষয় মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। আমার লেখার কারণে সেটা নতুন করে অনেকের স্মৃতিকে হানা দিয়েছিল।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর দিনাজপুরের প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে নিহত হয়েছিলেন বিপ্লবী ছাত্রনেতা মোজাম্মেল হক। শশরা ইউনিয়ন নিবাসী মোজাম্মেল হককে আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দিনাজপুর শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছিল। মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল তাঁর কথা। কিন্তু দৈনিক তিস্তায় তাঁকে নিয়ে আমার একটি রিপোর্ট প্রকাশ হলে বিষয়টি অনেকের আলোচনায় আসে। এই রকম অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে লুলু ভাই কখনো কখনো ‘চেতনা জুয়েল’ বলতেন। এটা যে আমার খুব একটা ভাল লাগত, এমন নয়। কারণ তিনি এমনভাবে চেতনা জুয়েল শব্দ দুটো উচ্চারণ করতেন তাতে মনে হতো আমার সাথে যেন মজা করছেন।

লুলু ভাই ও সাবিহা ভাবির সাথে কোন এক একুশে
ফেব্রুয়ারিতে লেখক কন্যা লাভলী আজাদ লিজা

সম।ববত ১৯৯১ সালে সাংবাদিকতার উপরে আমাকে একটি ট্রেনিংয়ে ঢাকায় পাঠালেন লুলু ভাই। ২১ দিনের ট্রেনিং। দিনাজপুরের আরেকজন সাজেদুর রহমান শিলু উত্তর বাংলা পত্রিকা থেকে ঐ ট্রেনিংয়ে গিয়েছিলেন। তখন তো এখনকার মত মোবাইল আর ইন্টারনেট ছিল না। দূরালাপনের মূল মাধ্যম ছিল টেলিফোন। লুলু ভাই একদিন পিআইবিতে আমাকে ফোন দিয়ে ভীষণ উচ্ছসিতভাবে জানালেন যে, আমার মেয়ে হয়েছে। লুলু ভাইয়ের তখনকার উচ্ছাসটা না দেখেও আমি বেশ অনুভব করতে পারছিলাম। সেই সুখবরটি পেয়ে আমি এবং শিলুও উচ্ছসিত। শিলু বলল, দোস্ত, বাবা হয়েছ, মিষ্টি খাওয়াও। সেইদিন তাকে বড় সাইজের দুইটি মিষ্টি খাইয়েছিলাম।

অজ্ঞাত কারণে আমার সম্পর্কে সব সময় পজিটিভ ধারণা পোষণ করতেন লুলু ভাই। লোকের কাছে তার ধারণা প্রকাশও করতেন। বলতেন, ছেলেটার হাত ভাল। যে কোন দায়িত্ব দিলে সেটা সে করেই ছাড়বে। তার এই পজিটিভ ধারণা তিনি শুধু লালন করতেন না, কাজেও লাগাতেন।
দিনাজপুর পৌরসভার একটি নির্বাচনে লুলু ভাই চেয়ারম্যান পদে সৈয়দ মোসাদ্দেক হোসেন লাবুর পক্ষে কাজ করেছিলেন। লাবু ভাই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর লুলু ভাই তাকে বোঝালেন যে, চেয়ারম্যান পদটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ। নানান ব্যস্তটা থাকে চেয়ারম্যানের। চেয়ারম্যানের একজন পিএস অথবা গণসংযোগ কর্মকর্তা থাকা উচিৎ।

লুলু ভাইয়ের এই যুক্তির সাথে লাবু ভাই একমত হলেন এবং লুলু ভাইকেই বললেন যে, আপনি ঠিক করে দেন, কাকে আমি এই রকম একটি পদে রাখতে পারি, যেন তার দ্বারা আমার কোন ক্ষতি না হয়। তখন লুলু ভাই আমার নাম প্রস্তাব করেছিলেন এবং লাবু ভাই আমাকে নিয়োগও দিয়েছিলেন। লাবু ভাই মেয়র ছিলেন পাঁচ বছর। তার জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আমি পাঁচ বছর দিনাজপুর পৌরসভার সাথে যুক্ত ছিলাম। লুলু ভাইয়ের এই অবদানের কথা ভুলবার নয়।

একবার স্যাটলমেন্ট জরিপকালে আমার বাড়ির জায়গা-জমি নিয়ে প্রতিবেশি ও আমার মৃত বড় আব্বা আব্দুল হামিদের পরিবারে সাথে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হলো। আমি কাগজপত্র ঘেঁটে দেখলাম যে, বড় আব্বার সাথে আমার বাবার একটা লিখিত ডেমি আছে যেখানে কার অংশ কতটুকু তা উল্লেখ আছে। সেই লিখিত চুক্তিতে পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মহসীন আলীসহ আরো অনেকের সাক্ষী হিসেবে সিগনেচার আছে। লুলু ভাইকে আমার সমস্যার কথা বললাম এবং সেই ডেমি কাগজটি দেখালাম। তখন দিনাজপুরে স্যাটলমেন্টের আদালত বসত। লুলু ভাই আনঅফিসিয়ালি সেটি আদালতের বিচারককে দেখান। বিচারক বলেন যে, এটা একটা ডকুমেন্ট এবং এর বৈধতা আছে। শুনানীর সময় সাক্ষী মহসীন সাহেব এলেই ডেমির পক্ষে রায় দেয়া যাবে। আমার সৌভাগ্য যে, ঐ ডেমিতে তিনজন সাক্ষীর (মোঃ মহসীন আলী, মখলেছুর রহমান, আমিনুল ইসলাম) সবাই আমার পক্ষে জরিপ আদালতে এসে সাক্ষ্য দান করেছিলেন এবং বিচারক আমার পক্ষে রায় প্রদান করেছিলেন। এভাবেই লুলু ভাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমার কল্যাণে অনেক কাজ করে আমাকে ঋণী রেখে গেছেন।

আমার ব্যক্তি জীবনের উত্থানের পেছনে লুলু ভাইয়ের অনেক অবদান ছিল। তারপরেও আমি দৈনিক তিস্তা ছেড়ে অন্য কোন পত্রিকায় যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কেন? কারণ লুলু ভাই মাঝে মাঝেই রেগে গিয়ে বলতেন, তিস্তা ছাড়া তোমার গতি নাই। তখন আমারো রাগ হতো। এক জায়গায় বেশিদিন থাকা ভাল নয় বলে মনে হতো। তাতে নিজের কদর থাকে না। তাই অন্য দৈনিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সম্ভবত ১৯৯৬-৯৭ সালে দৈনিক তিস্তা ছেড়ে আমি দৈনিক উত্তর বাংলায় দিয়েছিলাম। যোগ দেয়ার দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর লুলু ভাইকে জানালে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েন। উল্টা-পাল্টা নানান প্রশ্ন করেন। তারপর বলেন, যাবা যখন যাও। তবে তোমাকে একটা বিদায় সংবর্ধনা দিব, আর বিদায়ের আগে তুমি আমাদেরকে খাওয়াবে।

আমি খাওয়াতে রাজি হলাম। পাফিন চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে লুলু ভাইসহ তিস্তার বন্ধুরা (গোলাম নবী দুলাল, ওয়াহেদুল আলম আর্টিস, রোস্তম মন্ডল, হিরু পোদ্ধার) বিদায়ী ফুল দিলেন। ফুল দেয়ার সময়ও লুলু ভাইয়ের রসিকতা ; শোন, যে আশায় যাচ্ছো, সেই আশা তোমার কোনদিন পুরণ হবে না।

এমন কথায় লুলু ভাই কি ইঙ্গিত দিলেন তা বুঝে সবাই হো হো করে হাসলেন, লুলু ভাইও হাসলেন। সেইসব মজার স্মৃতি, কাজের স্মৃতি, কল্যাণের স্মৃতিসহ অনেক স্মৃতিই ছিল লুলু ভাইয়ের সাথে আমার।

প্রেসক্লাব সংক্রান্ত দ্বন্ধে সাংগঠনিক ভাবে আমি কখনোই লুলু ভাইয়ের পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু তার প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার কমতি ছিল না। লুলু ভাই মাঝে মাঝেই বলতেন, শোন জুয়েল, আমি কিন্তু তোমার ফ্যান। রাজ্জাক, শাবানার যেমন ফ্যান আছে, শাকিব-মাশরাফির যেমন ভক্ত আছে, তেমনি আমি হলাম তোমার ভক্ত।

লুলু ভাই কেন আমাকে এভাবে বলতেন, জানি না। কিন্তু আমাকে তিনি শ্নেহ করতেন, ভালবাসতেন এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের কাছে আমার সম্পর্কে পজিটিভ ধারণা তুলে ধরতেন, লুলু ভাইয়ের বিভিন্ন কর্মকান্ডে তা প্রমাণিত হয়েছে।

এই তো কিছুদিন আগে দিনাজপুর বার এর সাবেক সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট খাদেমুল ইসলাম ফোন করলেন। বললেন, তার সাথে যেন দেখা করি। দেখা করলাম। তিনি বললেন, তোমার কথা আমাকে লুলু বলেছে। তুমি না কি খুব ভাল লিখতে পারো? আমি তো বিভিন্ন দেশ সফর করেছি। আমার ইচ্ছা সেই সব সফর নিয়ে একটি বই করব। তাই তোমাকে ডাকা, তুমি সাজিয়ে গুছিয়ে দিবে। এর জন্য তোমাকে আমি সাধ্যমত সম্মানী দিব।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে একবার দৈনিক তিস্তা অফিসে এবং আরেকবার বালুবাড়ির বাড়িতে গিয়ে লুলু ভাইকে আমার লেখা কয়েকটি বই দিয়েছিলাম। তিনি বইয়ের মূল্য আমাকে দিয়েছিলেন। তখন তার অনেক কথা আমার সম্পর্কে। তিনি বলছিলেন যে, আমার কাজগুলো তাঁর খুব ভাল লাগে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর লুলু ভাইয়ের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে মাত্র একবার। করোনা হেওয়ার পর তিনি যখন ঢাকায় তার নিজ ফ্লাটে অবস্থান করছিলেন, তখন একদিন মোবাইলে কল দিয়েছিলাম। কল রিসিভ করে তিনি বলেন যে, করোনা দূর হলেও শরীর বেশ দূর্বল। সেই সময় আলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুয়েল, তুমি তো বেশ কিছু ভাল কাজ করেছ। এবার আমাকে নিয়ে একটা জীবনী লেখার ব্যবস্থা করো। একটা বই কর। যা সহযোগিতা লাগবে, দিব।

আমি বলেছিলাম, লুলু ভাই, বাসায় ফিরে আসেন। ইনশাল্লাহ আপনার ইচ্ছে পুরণ হবে। অপনাকে নিয়ে বই লেখার কাজ করব ইনশাল্লাহ।
আমার দূর্ভাগ্য, লুলু ভাই ফিরেছেন। কিন্তু লাশ হয়ে ফিরেছেন, যা কারো প্রত্যাশিত ছিল না। তিনি তো প্রায় সুস্থ্য হয়েই গিয়েছিলেন। করোনা মুক্ত হওয়ার পর এত দ্রুতই পৃথিবীর আলো, বাতাস ছেড়ে পরলোকে যাত্রা করবেন এটা আমার যেমন কল্পনা বাইরে ছিল, তেমনি লুলু ভাইও কোনদিন হয়ত ভাবতে পারেননি।

তিনি হজ্ব সম্পাদন করেছেন কয়েক বছর হলো। হজ্ব করে আসার পর লুলু ভাই বলতে থাকেন যে, এখন আমি নিস্পাপ। হজ্ব করলে নিস্পাপ থাকে না। শিশুর যেমন পাপ নাই, হজ্ব করার পর আমরাও (হাজীগণ) শিশুদের মত হয়ে গেছি। অর্থাৎ আমরা নিস্পাপ হয়ে গেছি।

লুলু ভাইয়ের নিস্পাপ হওয়ার দাবীতে কেউ কেউ হাসতেন। কারণ হজ্ব করার পরেও তার মধ্যে ন্যাচারাল যে ধনা-মনা চরিত্র কাজ করত তার থেকে তিনি কখনোই বের হতে পারেন নাই। কৌতুক করা, মজার কথা বলে হাস্যরস দেয়া, টিপ্পনী মারা, একটু খোঁটা মারা এগুলো ছিলই। হয়ত বা সে কারণেই হাসতেন কেউ কেউ। আবার এমনে হতে পারে যে, তার কথাগুলো মজার বলেই হাসি চলে আসত অনেকের। কিন্ত মানুষের ক্ষতি, লাগাবাজা, বদমেজাজ এগুলো তার ছিল না। তাই আমিও বিশ^াস করি যে, তার মধ্যে নিজেকে নিস্পাপ হওয়ার যে বিশ্বাস তৈরী হয়েছিল, তা তিনি হয়েছেন এবং মহান সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে তিনি এর পুরস্কার অবশ্যই পাবেন। পরকালে লুলু ভাই ভাল থাকুন প্রত্যাশা করি এটাই।

আজহারুল আজাদ জুয়েল,
সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক
মোবাঃ ০১৭১৬-৩৩৪৬৯০/০১৯০২০২৯০৯৭
ইমেইল- [email protected]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য