মিয়ানমারে রোমান ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান

মিয়ানমারে রোমান ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান

আন্তর্জাতিক

মিয়ানমারের একটি গির্জায় হামলার ঘটনায় চার জন নিহত ও আট জনের বেশি আহত হওয়ার পর দেশটির রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের নেতা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

চলতি সপ্তাহে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে তুমুল লড়াই চলছে। এর মধ্যেই ওই গির্জাটিতে মূলত নারী ও শিশুদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সম্প্রতি দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের শান ও কায়াহ রাজ্যে সেনাবাহিনী ও সামরিক জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লড়াইয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এসব সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় যোদ্ধা মিলিয়ে কয়েক ডজন লোক নিহত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যম ও এলাকাগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলের হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন; সংঘর্ষে বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটছে।

“ভয়াবহ দুঃখ ও কষ্ট নিয়ে আমরা নিরীহ বেসামরিকদের ওপর হামলার যন্ত্রণা লিপিবদ্ধ করছি, যারা কায়ানথায়ারের পবিত্র হার্ট গির্জায় আশ্রয় চেয়েছিলেন। ধারাবাহিক গোলাবর্ষণ, ভীতসন্ত্রস্ত জনগোষ্ঠী, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু, তাদের ওপর ভারি অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহারের মতো সহিংস কর্মকাণ্ডের ফলেই এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

“এটা থামাতে হবে। আমরা আপনাদের সবার কাছে আবেদন করছি, দয়া করে যুদ্ধকে আর বাড়িয়ে তুলবেন না,” টুইটারে পোস্ট করা এক চিঠিতে এমনটাই বলেছেন ইয়াংগনের আর্চবিশপ কার্ডিনাল চার্লস মং বো।

আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী সংঘর্ষের সময়ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও স্কুল সুরক্ষা পায় বলে মনে করিয়ে দেন তিনি।

রোববার রাতের হামলায় থাইল্যান্ডের সীমান্তলাগোয়া কায়াহ রাজ্যের রাজধানী লোইকাওয়ের চার্চটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান বো।

মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও কায়াহ-র মতো কিছু কিছু এলাকায় অনেক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীও আছেন।

হামলার ফলে এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিতে হয়েছে; ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ এখন উদ্বাস্তু এবং তাদের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা পণ্য দরকার বলে জানিয়েছেন বো।

ওই অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতদের সহায়তা করা আরেক বাসিন্দা বুধবার সংঘর্ষের কারণে বাড়িঘর ছেড়ে পালানো লোকজনের সংখ্যা বেড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজারের মধ্যে দাঁড়িয়েছে এবং অনেকে এখনও বিভিন্ন গির্জাকেই আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছেন।

“বয়স্ক মানুষ ও শিশুরা গির্জাগুলোতে থাকছেন। গোলাবর্ষণ বন্ধে সব গির্জাই সাদা পতাকা লাগিয়ে রেখেছে,” বলেছেন নাম পরিচয় গোপন রাখতে চাওয়া ২০ বছর বয়সী ওই তরুণী।

তিনি জানান, পরিস্থিতি এখনও উত্তাল। সামরিক বাহিনী হালকা অস্ত্রে সজ্জিত স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ভারি অস্ত্র ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সামরিক জান্তার মুখপাত্রের মন্তব্য জোগাড়ের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

গত বছরের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে এ বছরের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নোবেলজয়ী অং সান সু চি নেতৃত্বাধীন দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এর পর থেকেই দেশটি টালমাটাল সময় পার করছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটির অসংখ্য শহর টানা বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও আইন অমান্য আন্দোলন দেখেছে।

আন্দোলন দমাতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয় এবং কয়েক হাজার লোককে গ্রেপ্তার করে।

অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের হাতে ৮০০র বেশি লোক নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের ঘটনাবলীর ওপর নজর রাখা গোষ্ঠী অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিকাল প্রিজনার্স।

নিহতের এ সংখ্যা সঠিক নয় বলে দাবি সামরিক বাহিনীর। অভ্যুত্থানকারী জেনারেল মিন অং হ্লাইং সম্প্রতি বলেছেন, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত ৪৭ পুলিশসহ ৩০০র মতো মানুষ নিহত হয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি গত কয়েক সপ্তাহে আত্মপ্রকাশ করা বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থানবিরোধী মিলিশিয়া বাহিনীর বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে। স্থানীয় এ মিলিশিয়া বাহিনীগুলো হালকা বন্দুক ও ঘরে বানানো অস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে।

এ ধরনের সংঘর্ষ মিয়ানমারকে ‘গৃহযুদ্ধের’ দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন না হ্লাইং।

“আমার মনে হয় না কোনো গৃহযুদ্ধ হবে,” গত ২০ মে হংকংভিত্তিক চীনা ভাষার সম্প্রচারমাধ্যম ফিনিক্স টেলিভিশন ফিনিক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য