পঞ্চগড়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুন সুপারি বাগান

পঞ্চগড়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুন সুপারি বাগান

রংপুর বিভাগ

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় থেকেঃ পঞ্চগড় জেলার অর্থনীতিতে বড় একটা অংশ দখল করে আছে সুপারি। গাছে ফল আসার পর প্রতি বছর মে-জুন মাসে সুপারি পাঁকে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অন্যান্য অঞ্চলে এই সময়টাতে কোন সুপারি হয় না। তাই এই সময় সারাদেশের পান-সুপারি রসিকদের চাহিদা মেটায় পঞ্চগড়ের সুপারি। দেশের বড় বড় সুপারি ব্যবসায়ীরা এখন অবস্থান করছেন পঞ্চগড়ে। বিভিন্ন হাট থেকে তারা সুপারি কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই পাঁকা সুপারি কিনে মজুদ করছেন। তারা এই সুপারি মাটিতে পুঁতে রাখবেন। মাস দু’য়েক পর তারা এই সুপারি মাটি থেকে তুলে মজা সুপারি হিসেবে অধিক দামে বিক্রয় করবেন। এবার পঞ্চগড়ের সুপারি বাগানে ফলন কিছুটা কম হলেও বাজারে দাম বেশ ভাল। বর্তমানে পঞ্চগড়ের হাট বাজারে প্রতি পণ (২০ হালি বা ৮০টি) সুপারি বিক্রয় হচ্ছে সাইজ ভেদে ৪শ টাকা থেকে ৫শ টাকা দরে। আর প্রতি কাহন (১৬ পণ) সুপারি বিক্রয় হচ্ছে ৬ হাজার ৫শ টাকা থেকে ৮ হাজার টাকায়।

পান রসিকদের জন্য রাজশাহীর পান আর পঞ্চগড়ের সুপারির কদর রয়েছে আলাদাভাবে। পঞ্চগড়ের মানুষদের আদী ঐতিহ্য সুপারির বাাগান। অনেক সুপারি বাগান মালিক আবার সুপারির গাছে পান চাষ করেন। এতে তাদের বাড়তি আয়ও হয়। জমির ধান দিয়ে সারা বছরের খাবার আর সুপারির টাকা দিয়ে চলে সারা বছরের সাংসারিক সব খরচ। পঞ্চগড়ের মাটি অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং মাটি বেলে দোঁআশ হওয়ায় বংশ পরম্পরায় এখানে সুপারি চাষ করে আসছে এখানকার মানুষরা। এক সময় বাড়িতে বাড়িতে ছিল সুপারির গাছ। বাগান আকারে ছাড়াও অনেকে বাড়ির পাশের উঁচু জমিতে সুপারির বাগান করে। সুপারি বাগানে আলাদা করে কোন পরিচর্যাও করতে হয়না। মাঝখানে মড়ক লেগে শত শত একরের সুপারির বাগান ধ্বংস হয়ে গেলেও পঞ্চগড় জেলার সর্বত্র এখনও সুপারির বাগান চোখে পড়ে। বাগান না হলেও প্রতিটি বাড়িতে কমবেশী সুপারির গাছ আছে। লাভজনক হওয়ায় অনেকে নতুন করে সুপারির বাগান করছে।

বিশেষ করে পঞ্চগড় জেলা সদরের কামাত কাজলদিঘী, চাকলাহাট, হাড়িভাসা ও সদর ইউনিয়ন সুপারির জন্য বিখ্যাত। এই এলাকায় রয়েছে অসংখ্য সুপারির বাগান। জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও সুপারির বাগান রয়েছে। উত্তরের জেলাগুলোর মধ্যে বড় সুপারির মোকাম হয় টুনিরহাট বাজারে। সুপারির মৌসূমে প্রতি শুক্র ও সোমবার হাটবারে স্কুল মাঠে উঠে প্রচুর সুপারি। আর প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার পঞ্চগড় জেলা শহরের জালাসি এলাকায় বসে সুপারির হাট। বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এখানকার সুপারি কিনে নিয়ে নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পাঁকা সুপারি কিনে মাটিতে পুতে রাখে মজানোর জন্য। মৌসূম শেষে মাটি থেকে তোলা মজা সুপারি কয়েক মাসের চাহিদা মেটায়। রংপুরের শঠিবাড়ির সুপারি (স্থানীয় ভাষায় বাংলা গুয়া) শেষ হওয়ার পর পঞ্চগড়ের সুপারি বাজারে আসে। তাই দামও থাকে বেশ চড়া।

জেলা সদরের টুনিরহাট এলাকার ভান্ডারুগ্রামের কৃষক হামিদার রহমান। বাবার লাগানো ১০ একর জমির সুপারির বাগানের মালিক হয়েছিলেন তিনি। গত ১০ বছর আগে মড়ক লেগে গোটা বাগানের সব গাছ মরে যায়। আবার নতুন করে বাগানে চারা লাগিয়েছেন তিনি। গত কয়েক বছর থেকে ফলন পাচ্ছেন তিনি। তিনি জানালেন, গত মৌসূমে বাগান থেকে প্রায় ৩শ কাহন (৮০টা সুপারিতে এক পণ আর ১৬ পণে এক কাহন) সুপারি পেয়েছিলাম।

পাঁকা সুপারি মাটির নীচে পুতে মজা করে প্রতি কাহন সুপারি বিক্রয় করেছি ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায়। এক মৌসূমে শুধু সুপারি বিক্রি হয়েছে ১৫ লাখ টাকার উপরে। চলতি মৌসূমে ওই বাগান থেকে তিনি ৪শ কাহন সুপারি পাওয়ার আশা করছেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে তিনি একশ কাহন সুপারি বাজারে বিক্রয় করেছেন। শুরুতে কিছুটা দাম কম হলেও এখন দাম বেশ ভাল। গড়ে প্রতি কাহন সুপারি তিনি ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রয় করেছেন। তিনি আরও জানান, এখন গাছে যে সুপারি আছে তা আর বিক্রয় করব না। গাছ থেকে পাঁকা সুপারি নামিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখব।

এ ব্যাপারে কথা হয় পঞ্চগড় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহ আলম মিয়ার সাথে। তিনি জানান, পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে সুপারি। পঞ্চগড়ের মাটি ও আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এখানে যত্রতত্র সুপারি গাছ হয়। অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং অন্য আবাদ হয়না এমন জমিতে সুপারি বাগান করে এখানকার মানুষরা। লাভজনক হওয়ায় এখনও নতুন নতুন জমিতে সুপারির বাগান গড়ে উঠছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য