সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১ হাজার গাছ লাগানো হবে

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১ হাজার গাছ লাগানো হবে

জাতীয়

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কাটা নিয়ে বাদ-প্রতিবাদের মধ্যে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, যে সংখ্যক গাছ কাটা হবে তার ১০ গুণ গাছ লাগানো হবে।

প্রকল্প পরিচালক মো.হাবিবুল ইসলাম বলেছেন, “যখনই যেই গাছ কাটা পড়বে, সেই গাছের বিপরীতে ১০টা গাছ লাগানো হবে। আর সামগ্রিকভাবে অন্তত এক হাজার গাছ লাগানো আমাদের লক্ষ্য।”

গাছ কাটার সমালোচনার প্রতিক্রিয়া এবং এই উদ্যান ঘিরে পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে একথা বলেন তিনি।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে এখন স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়) প্রকল্পের কাজ চলছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

প্রকল্প বাস্তবায়নে শতাধিক গাছ কাটা পড়ায় পরিবেশবাদী সংগঠনসহ বিভিন্ন জন সরব হয়েছেন। এই উদ্যান নিয়ে হাই কোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগও উঠেছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্প পরিচালক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হাবিবুল ইসলাম নতুন করে আরও গাছ লাগানোর কথা বলেন।

পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সামনের বর্ষা আসলেই গাছ লাগানোর কাজ শুরু করব। কোন স্থাপনার পাশে কোন উচ্চতার গাছ হবে, সেই উচ্চতার গাছ পরিকল্পনা করে লাগাব।

“আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সারা বছর কোন কোন গাছে ফুল থাকবে, সেই ধরনের পরিকল্পনা করে গাছ রোপণ করব।”

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এখন কতটি গাছ রয়েছে এবং এর মধ্যে ঠিক কতটি কাটা পড়ছে, সেই সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেননি প্রকল্প পরিচালক।

তবে তিনি বলেন, সরকার গাছকে না কেটে বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একান্তভাবে জরুরি না হলে কোনো গাছ কাটা পড়বে না। সিদ্ধান্ত হলো যতটা না কাটা যায়।

গত কয়েকদিন ধরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কর্মসূচি পালনকারীরা গাছ কেটে খাবারের দোকান, হাঁটার পথ, গাড়ি রাখার স্থান নির্মাণের বিরোধিতা করছেন।

প্রকল্প পরিচালক হাবিবুল বলেন, “এখানে কোনো রুটি বা ভাতের দোকান হচ্ছে না। উদ্যানে ঘুরতে এসে এখানকার নানান স্থাপনা দেখতে দেখতে একজন মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন, তার একটু পানির পিপাসা পেতে পারে বা তার টয়লেট ফ্যাসিলিটির প্রয়োজন হতে পারে।

“তখন যাতে তিনি একটা জায়গায় বসে বিশ্রাম নিতে পারেন, এজন্য পুরো উদ্যানে সাতটি ‘ফুড কিওস্ক’ তৈরি করা হবে। সেখানে পানি ও হালকা নাশতা গ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে এবং তার পেছন দিকে মহিলা এবং পুরুষদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকবে।”

পরিবেশবাদীদের অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আসলে যে কোন রিফর্মের মাঝ পথে দেখলে এই রকমই মনে হবে। একটু সময় দিতে হবে।

“মনে রাখতে হবে যে সরকার একেবারেই বেখেয়ালে কোনো কাজ করে না, যে কাজটা করে, গুছিয়ে করে। মাঝপথে এমন লাগতেই পারে। তবে কাজ শেষ হলে তা একটা নান্দনিক বিষয় হবে।”

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি শাসনবিরোধী ২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রাম এবং ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত ভাস্কর্য

স্থাপন, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, ইন্দিরা মঞ্চ নির্মাণ, ওয়াটার বডি ও ফাউন্টেইন নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ ৫০০ গাড়ির পার্কিং ও শিশুপার্ক পুনর্বিন্যাসসহ বিভিন্ন নির্মাণ কাজ চলছে।

২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের বাস্তবায়নের কাজ ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২৬৫ কোটি টাকা।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৬১০ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুবেদার ইসলাম খাঁর সময়ে ঢাকা নগরী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যে উদ্যান গড়ে ওঠে তাই আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্ক। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিতি পায়, পাকিস্তান আমলেও ছিল তাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়, আরেক অংশ হয় রমনা পার্ক।

এই রেসকোর্স ময়দানেই বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। এখানেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল।

হাবিবুল বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই স্থান এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল যে টেবিলে সই হয়েছিল, সেই টেবিল রাখার স্থানটি চিহ্নিত করা হয়েছে।

“পয়েন্টটা এক সময় শিশু পার্কের সীমানার মধ্যে ছিল, যা এখন সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দুই পয়েন্টকে সংরক্ষণ করে সেখানে ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হচ্ছে।”

“কাজটা যখন শেষ হবে, তখন যে কোনো দেশি বা বিদেশি দর্শনার্থী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভবিষ্যতে যখন আসবেন, একই সঙ্গে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে জানবেন,আমাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানবেন,” বলেন তিনি।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্থান ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থান সংরক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কে এম সফিউল্লাহ ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জনস্বার্থে ২০০৯ বছরের ২৫ জুন হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন।

এর এক বছর পরে দেওয়া রায়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একাত্তর-পরবর্তী স্থাপনা, যেমন- শিশু পার্ক, মহানগর পুলিশের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, ফুলের মার্কেট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালত রায়ে এক বা একাধিক কমিটি গঠন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সাতটি স্থান চিহ্নিত করতে নির্দেশ দিয়েছিল।

এগুলো হল- ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দেওয়া ভাষণের স্থান; ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের স্থান; একাত্তর সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় ও প্রাদেশিক সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের শপথের স্থান; ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্থান; পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থান; ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের স্থান এবং ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণের স্থান।

এই সাতটি স্থান ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সব ধরনের স্থাপনা অপসারণ করতে বলা হয়েছিল রায়ে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য