পার্সেল ট্রেনে আগ্রহী হচ্ছে না কৃষক ও ব্যবসায়ীরা

পার্সেল ট্রেনে আগ্রহী হচ্ছে না কৃষক ও ব্যবসায়ীরা

জাতীয়

করোনা প্রাদুর্ভাব রোধে চলমান লকডাউনে পণ্য সহজতর পরিবহনে বাংলাদেশ বিশেষ পার্সেল ট্রেন চালু করলেও কৃষক ও ব্যবসায়ীরা তাতে আগ্রহী হচ্ছে না। অথচ পার্সেল ট্রেনে পণ্য পরিবহন খরচ সড়কপথের যানবাহনের তুলনায় কয়েক গুণ কম। তা সত্ত্বেও পণ্য পরিবহনে পার্সেল ট্রেন ব্যবহারে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আগ্রহী না হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ধারণ, মূলত প্রচার প্রচারণার অভাব ও সীমিত ট্রেন সার্ভিসের কারণে এ ট্রেন সার্ভিস কৃষক-ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছে না। পার্সেল ট্রেনে প্রতি কেজি পণ্য কুমিল্লা থেকে ঢাকায় পরিবহনের খরচ মাত্র ১ টাকা ৮১ পয়সা। আর পণ্যটি যদি কৃষিজাত হয় তবে সেবাগ্রহীতা তার ওপর আরো ২৫ শতাংশ রেয়াতি সুবিধা পাচ্ছে। ওই হিসাবে প্রতি ৫ টন কৃষিজাত পণ্য কুমিল্লা থেকে ঢাকায় পরিবহন করতে খরচ হবে মাত্র ৬ হাজার ৭৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। যদিও ৫ টন পণ্য ট্রাকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় নিয়ে যেতে ১২-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিদ্যমান লকডাউনের মাঝে নিয়মিত ৫-৬টি বগিসংবলিত রেক দিয়ে পার্সেল ট্রেনগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু ওসব ট্রেন কোনো কোনো দিন প্রায় খালি অবস্থায় নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে। তাতে অনেক ট্রেন জ্বালানি খরচের সমপরিমাণও আয় করতে পারছে না। সর্বাত্মক কঠোর বিধিনিষেধে প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে সরিষাবাড়ী, ঢাকা থেকে সিলেট, পঞ্চগড় থেকে ঢাকা এবং খুলনা থেকে চিলাহাটি রুটে উভয় পথে ৮টি পার্সেল ট্রেন সার্ভিস চালু হয়।

সূত্র জানায়, গত ১৪ এপ্রিল চালু হওয়া পার্সেল ট্রেন-১ ও ২-এর মাধ্যমে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৮৯৬ জন পণ্য পরিবহন করেছে। আর টনের হিসেবে পণ্য পরিবহন হয়েছে মাত্র ৮০ টনের কিছু বেশি। তাতে আয় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫২ হাজার ৩১০ টাকা। তবে সাড়া না পেলেও পার্সেল-১ ও ২ ট্রেন দুটি নিয়মিত ৬ থেকে ১২ রেক অর্থাৎ ৬টি কোচ নিয়ে পথিমধ্যে বেশ কয়েকটি যাত্রাবিরতি দেয়। যেগুলো চট্টগ্রাম থেকে সরিষাবাড়ীতে কৃষি ও বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে। ট্রেনগুলোর মধ্যে ঢাকা-সিলেট রুটের পার্সেল ট্রেনটি ঢাকা থেকে বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে সিলেট পৌঁছে রাত ২টা ৩০ মিনিটে। তাছাড়া সিলেট থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে ওই ট্রেন সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা পৌঁছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-সরিষাবাড়ী রুটে পার্সেল ট্রেনটি বেলা ৩টায় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে ভোর ৪টায় সরিষাবাড়ী পৌঁছে এবং ফিরতি পথে ট্রেনটি ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে সরিষাবাড়ী থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামে পৌঁছায়। তাছাড়া সপ্তাহে শনি, সোম, ও বুধবার খুলনা-চিলাহাটি রুটের পার্সেল ট্রেনটি খুলনা থেকে বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিটে চিলাহাটি পৌঁছায় এবং একই রুটে সপ্তাহে তিনদিন রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার চিলাহাটি থেকে পার্সেল ট্রেনটি বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিটে খুলনা পৌঁছবে।

অন্যদিকে সপ্তাহে ৩ দিন শনিবার, সোমবার ও বুধবার বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন-ঢাকা রুটে একটি পার্সেল ট্রেন চলবে। বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন থেকে ট্রেনটি নির্ধারিত দিনে বেলা ১টায় ছেড়ে দিবাগত রাত ৩টায় ঢাকায় পৌঁছবে। একই রুটে সপ্তাহে ৩ দিন রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে রাত ৮টা ৩০ মিনিটে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশনে পৌঁছাবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সরিষাবাড়ী ও চট্টগ্রাম-সিলেটের মধ্যে পরিবাহিত পার্সেল পণ্য ভৈরববাজার ও আখাউড়া স্টেশনে ল্যাগেজ ভ্যান সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে দেশের যে কোনো গন্তব্যে পাঠানো হবে। খুলনা-ঢাকা রুটের পণ্য পরিবাহিত লাগেজ ভ্যান ঈশ্বরদী স্টেশনে বিয়োজন করে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ট্রেনে সংযোজন-বিয়োজন করা হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত রুট ছাড়াও দেশের অন্যান্য যে কোনো গন্তব্যে পণ্য পাঠানোর জন্য রেলওয়ে সার্বিক সেবা প্রদান করছে।

সূত্র আরো জানায়, বিশেষ পার্সেল ট্রেনে কৃষিজাত পণ্য যেমন শাকসবজি, দেশীয় ফলমূলসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যাদি পরিবহনের ক্ষেত্রে মূল ভাড়ার ওপর ২৫ শতাংশ ছাড় দেয়া হবে। তাছাড়া অন্যান্য সব ধরনের চার্জ করোনাকালীন সংকটের কারণে সাময়িক সময়ের জন্য মওকুফ করা হয়েছে। পণ্য পরিবহনের স্বার্থে যে কোনো প্রয়োজনে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তাকে ফোকাল পারসন নিয়োগ দিয়েছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ। সেখানে কৃষক বা ব্যবসায়ীরা ফোন দিয়ে পণ্য পরিবহনের বুকিং দিতে পারবে। মূলত করোনাকালীন বিধিনিষেধের মধ্যে জীবন ও জীবিকা চালু রাখতে কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্য সহজে পরিবহন করতে পারে, সেজন্যই বাংলাদেশ রেলওয়ে বিশেষ পার্সেল ট্রেন চালু করেছে। রেলওয়ে অতীতে বিভিন্ন দুর্যোগকালে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন, ক্যাটল ট্রেনসহ পার্সেল ট্রেন পরিচালনা করেছে। স্বাভাবিক সময়ের মতো প্রতিদিন ৬-৭টি জ্বালানি, সার, খাদ্যশস্য ও আমদানি-রফতানিবাহী কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা করছে। কিন্তু দেশের দুর্যোগপূর্ণ সময়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি এবং ভোক্তাদের চাহিদার সংকট মেটাতেই পার্সেল স্পেশাল চালু করা হয়েছে। কিন্তু সার্ভিসগুলো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বিধিনিষেধের মধ্যে কৃষক ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনের স্বার্থে খুব কম খরচে রেলওয়ে পার্সেল ট্রেন সার্ভিস চালু করেছে। সড়কপথের যানবাহনের তুলনায় রেলপথে পণ্য পরিবহন খরচ কয়েক গুণ কম। কিন্তু তারপরও কাক্সিক্ষত সেবাগ্রহীতা পাওয়া যাচ্ছে না। রেলওয়ে তারপরও কৃষক ও কৃষির স্বার্থে পার্সেল ট্রেন সার্ভিস চালু রেখেছে। আশা করা যায় আগামীতে পার্সেল ট্রেনে সাধারণ মানুষের উৎপাদিত পণ্য কম খরচে ও সহজে পরিবহন করবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য