তেঁতুলিয়ার রুমা সুঁই-সুতোর স্বপ্ন বুনেছেন নকশি কাঁথায়

তেঁতুলিয়ার রুমা সুঁই-সুতোর স্বপ্ন বুনেছেন নকশি কাঁথায়

রংপুর বিভাগ

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় থেকেঃ করোনা মহামারী দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে অভিশাপের কারণ হলেও কিছু মানুষের জন্য এসেছে আর্শীবাদ হয়ে। বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন সময় আর দশজন নারীর মতো অলস বসে না থেকে সময়কে কাজে লাগিয়ে অনেকে হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত। অনেকে হয়েছেন উদ্যোক্তাও। এমনই একজন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নকশী আপু। তিনি একজন তরুণ উদ্যোক্তা। না, তাঁর আসল নাম নকশী আপু নয়; তাঁর কাজের কারণে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন এই নামেই। তার আসল নাম সাগরিকা চৌধুরী রুমা। কেউ ডাকেন রুমা চৌধুরী বলে আবার কেউবা সাগরিকা চৌধুরী বলেও।

স্বামীর চাকুরীর সুবাদে বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন তেঁতুলিয়ার উপজেলার তিরনইহাট ইউনিয়নে। তাঁর স্বামী হারুন উর রশিদ ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। স্বামী আর দুই বছরের ছেলে সাদাফকে নিয়ে তাদের সুখের সংসার। কিন্তু এই সুখ তার বেশি দিন আগে হয়নি। তিনি তার কাজের দক্ষতায় মাত্র এক বছরের মধ্যেই পাকাপোক্ত করেছেন নিজের অবস্থান। তেঁতুলিয়া তথা পঞ্চগড়ের জেলার মানুষরা তো বটে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেশ-বিদেশের মানুষরাও এখন রুমাকে চেনে। এখন অনেকে অনলাইনে অর্ডার দেন নকশি কাঁথার জন্য। পেয়েও যান সময়মত। অনলাইনের পণ্য ক্রয় করে অনেক গ্রাহক প্রতারিত হলেও রুমার ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। অনলাইনে প্রথমবারের মত অর্ডার দেয়ার পর সঠিক পণ্যটি হাতে পেয়ে পরের বার কোন চিন্তা না করেই পুনরায় অর্ডার দেন।

কাজের পরিচিতি ও অনলাইন মার্কেটে নিজের পণ্য তুলে ধরতে তিনি যুক্ত হয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ওমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম ‘উই’ গ্রুপ ও তার নিজস্ব পেইজ ‘সাগরিকা চৌধুরী রুমা’য়। গ্রুপে যুক্ত হয়ে তৈরি হয় নতুন অনুপ্রেরণা। ফেসবুক গ্রুপ ও অনলাইনে শেয়ারের পর থেকেই আসতে থাকে ক্রেতাদের অর্ডার। তখন বড় কাঁথার সাথে বেবিদেরও কাঁথা সেলাই কাজ। একটি বড় কাথার কাজ শেষ করতে সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত। কাজ শেষ হলে সেটির ছবি ফেসবুকের গ্রুপে আপলোড করলেই সাথে সাথে অর্ডার চলে আসে। কাথা বিক্রয়ের টাকা দিয়ে আবারও নতুন করে কাপড়-সুতা কিনে শুরু হয় পরের কাথার কাজ।

তেঁতুলিয়ার রুমা সুঁই-সুতোর স্বপ্ন বুনেছেন নকশি কাঁথায়

তিরনইহাটের বাড়িতে গল্প হয় রুমার সাথে। তিনি জানান, তার বাবার বাসা তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরেই। আর স্বামীর বাসা পার্শ্ববর্তি কালান্দিগঞ্জে। বিয়ে হয়েছে চার বছর আগে। সংসার সামলানোর পাশাপাশি সেই থেকে চালিয়ে নিচ্ছেন পড়ালেখাটাও। এবার তিনি পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। স্কুল জীবন থেকেই তিনি স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন সুঁই-সুতোয়। বাবা ইকবাল হোসেন চৌধুরী ছিলেন একজন নামকরা আর্টিস্ট। তখন থেকে আঁকিবুকির অভ্যাস গড়ে উঠে। বিয়ের পর যখন সন্তান গর্ভে আসল তখন আগত সন্তানের জন্য পুরনো কাপড় দিয়ে কাঁথা তৈরীর কাজ শুরু করেন তিনি।

রুমার ভাষায়-বাবু জন্ম নিল। তার জন্মের আগেই তার জন্য নকশি কাঁথা তৈরী করেছি নিজ হাতে। নিজের জামাগুলোতে নকশার কাজ করতাম। শুরু হলো করোনা মহামারী। সন্তানকে সময় দেয়ার পাশাপাশি দিনভর রান্নাবান্না আর ঘরকুটোর কাজ করে খুব বোরিং সময় কাটাতাম। ফেসবুকে আর কতটা সময় দেয়া যায়। পাশের আপাদের উৎসাহে সিদ্ধান্ত নিলাম নিজে নিজে নকশি কাঁথার কাজ শুরু করবো। কিন্তু বাধ সাধল বাবুর বাবা। তার কথা তোমার কাজ করার দরকার কি? সংসারের সব খরচ তো আমিই যোগান দিচ্ছি। তুমি বাবু আর সংসার সামলাও। কিন্তু আমার জেদাজেদিতে রাজী হলো সে। গত বছরের ১৮ জুলাই থেকে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করলাম নকশি কাঁথার কাজ। কাজের শুরুটা মাত্র ৭ হাজার টাকা দিয়ে। অনলাইন মার্কেট থেকে সংগ্রহ করলাম কাঁথার কাপড়, সুঁই সুতা, ফ্রেম এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি। প্রতিষ্ঠানের নাম দিলাম এস আর হ্যান্ডিওয়ার্ক। বছর না পেরোতেই কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের মধ্য দিয়ে কাজ করায় শুধু নকশি কাঁথায় সেলস্ পেরিয়েছে লাখ টাকা। এই হাউস থেকে শুধু নকশি কাঁথা নয়; পাশাপাশি শিশুদের নিপা, ন্যাপী, বেবী ড্রেস, নকশি বিছানার চাদর ও দেশি শাড়ি কারুকাজ করে বিক্রয় করা হচ্ছে।

রুমা আরও জানান, কাজ শুরু করার পর তেমন একটা পরিচিতি না থাকায় অবস্থা ভাল ছিল না। অনলাইনে যুক্ত হওয়ার পর প্রডাক্টের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রথমে আমার বাবার বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ির নিজস্ব নারীদের কাজে লাগাই। তাদের সামান্য পারিশ্রমিকও দেয়ার চেষ্টা করি। চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ায় বাড়াতে থাকি আমার ব্যবসার পরিধিও। গ্রামের শিক্ষিত মেয়েদের পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের সুঁই-সুতার উপর আগ্রহ তৈরী করি। এছাড়া গ্রামের আত্মীয়-স্বজন গৃহবধূরা কাজের ফাঁকে আমাকে সময় দিতে থাকে। আমিও সাধ্যমত তাদের পারিশ্রমিক দেয়ার চেষ্টা করি। চেষ্টা করছি উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় নারীদের নিয়ে গ্রুপ তৈরী করে তাদের প্রশিক্ষণ দেব। নিজের কাজের ফাঁকে তারা আমার কাজে সময় দিয়ে বাড়তি কিছু টাকা রোজগার করবে। এখন পর্যন্ত কাজের সাথে সহযোদ্ধা হয়েছেন প্রায় ২০ জন নারী। আমার কাজে সহযোগিতা করা ছাড়াও তারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করছে।

তেঁতুলিয়ার রুমা সুঁই-সুতোর স্বপ্ন বুনেছেন নকশি কাঁথায়

রুমা বলেন, আমি বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ার তিরনই এ থাকি। মানে একবারে বর্ডার এলাকায়। আমাদের এখানে কোন কুরিয়ার সার্ভিস নেই। কুরিয়ার করতে হলে আমাকে ৫২ কিলোমিটার দূরে পঞ্চগড়ে যেতে হয়। উই গ্রুপে আমি জয়েন করি বছরের ২ জুলাই। যখনি উই গ্রুপে যাই নতুন করে অনুপ্রেরণা পাই। উই আর ডি এস বির নির্দেশনা মেনে চলেছি বলেই, আজ আমি এই অবস্থানে আসতে পেরেছি। সবটাই উই এর অবদান। তাড়াছা নকশিকাঁথার কাজ করি বলে নিজের এলাকায় আমার একটা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। এর থেকে বড় পাওয়া হতে পারেনা, সত্যিই সবার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের আমি বলবো, কাজ শুরু করার পর কখনও সেলের কথা চিন্তা করবেন না। নিজের পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং তৈরি করবেন। সেল এমনিতেই হবে। মনে করবেন, কয়েকজনের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হলো, তারা তখন আপনার থেকে না কিনলেও পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুসারে আপনার কাছ থেকে কিনতে পারে। তাই সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কোন কাজ কঠিন নয়। প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন করা উচিত। পরে করবো বলে কোন কাজ ফেলে রাখা ঠিক না। সেই কাজ আর সম্পূর্ণ হয় না। কাজের গতি থেমে যায়। তাই কাজ ফেলে না রেখে কাজের গতি ধরে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলে আর কোন কাজ কঠিন মনে হবে না। নিজের কাজ গুলোও সহজ মনে হবে।

ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানিয়ে রুমা বলেন, এসব কাজের জন্য শুরুতেই বেশ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। যা আমার ছিল না। একটি কাঁথা তৈরী করে বিক্রির পর আরেকটি কাঁথা তৈরী করতে হয়। এজন্য জনবলও কম লাগে। বেশি পুঁজি হলে একসাথে অনেক কাঁথার কাজ করা যায়। অনেকের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ হয়। ইচ্ছে আছে তেঁতুলিয়া উপজেলার পিছিয়ে পড়া নারী ও শিক্ষিত বেকার মেয়েদের গ্রুপ তৈরী করে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো। আর এসকল গ্রুপের সদস্যরা গড়ে উঠবে একেক জন সুই সুতার কারিগর হিসেবে। উপজেলার বিশাল এক জনগোষ্ঠি জড়িত থাকবে এই পেশায়। আর এখানকার উৎপাদিত নকশি কাথা ও অন্যান্য পণ্য দেশের গন্ডি ছেড়ে চলে যাবে বিদেশের মাটিতে। আমার এই স্বপ্ন বুনন তো আর এমনি এমনি হয়ে উঠবে না। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া এ ধরণের কাজের চুড়ান্ত শেখরে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য