Dinajpur -18-05-14জিন্নাত হোসেনঃ বরাবরের ন্যায় এবারো এসএসসিতে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে সেরা ১০ স্কুলের তালিকায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। এবারের প্রকাশিত এসএসসির ফলাফলে এ তথ্য জানা গেছে। এবছর স্কুলটি থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৫৩ ও বাণিজ্য বিভাগ থেকে ১৭ মোট ৭০ জন পরীক্ষার্থী সকলেই জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং ৬৬ জন গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ আমজাদ হোসেন পেশায় তিনি চিকিৎসক। ৮০ দশকে চাকুরীজীবনের শুরুর দিকে স্ত্রী, দুই সন্তানসহ বাস করতেন ঢাকায়। বেতন পেতেন ৭ হাজার টাকা। দুই ছেলে-মেয়ে পড়ত ইংরেজী মাধ্যমের একটি স্কুলে। ওদের টিউশন ফি লাগতো ৪ হাজার টাকা। সংসার চালাতে গ্রামে বাবার কাছে হাত পাততে হয়েছে বার বার। লজ্জায় একসময় মনে সংকল্প জাগে। সুযোগ পেলে নিজের গ্রামে একটি উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন, যেখানে পাড়াগায়ের শিশুরা তুলনামুলক কম খরচে লেখাপড়ার সুযোগ পাবে।

অর্থপেডিক সার্জন অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আমজাদ হোসেনের সেই সংকল্প বাস্তবে রুপ নেয় ২০০০ সালে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় নিজের এলাকা ঘুঘরাতলী মোড়ে ১ একর জমি কেনেন। মা আমেনা খাতুন ও বাবা বাকী মন্ডলের নাম অনুসারে প্রতিষ্ঠা করেন এবি ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ। জানালেন এবি ফাউন্ডেশনের পরিচালক (শিক্ষা) অধ্যাপক মোঃ শামসুল হক।

এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বাইরে কোচিং করার প্রয়োজন হয় না। ছেলে-মেয়েদের হোস্টেলে রেখে বাড়তি চিন্তা করতে হয় না অভিভাবকদের । যাত্রা শুরুর ১৩ বছরের মাথায় স্কুলটি দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের শ্রেষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ার গৌরব অর্জণ করেছে। সাফল্যের ধারবাহিকতায় এ বছর বোর্ডের ৪র্থ স্থান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
_DSC1490 copy
দিনাজপুর থেকে পার্বতীপুর উপজেলার সড়ক দিয়ে ১৪ কিঃ মিঃ গেলে পাওয়া যাবে চিরিরবন্দর উপজেলার ঘুঘরাতলী মোড়। রাস্তার দক্ষিন পার্শ্বে চোখে পড়বে আমেনা- বাকী রেসিডেন্সিয়ার মডেল স্কুল এন্ড কলেজের ক্যাম্পাস। স্কুলে ঢুকতেই দেখা যায় প্রধান ফটক সংলগ্ন ৪তলা মেয়েদের হোষ্টেল। নিচে এবি ফাউন্ডেশনের কার্যালয়। এখান থেকে সামনে দুই সারি দেবদারু গাছের মাঝ দিয়ে ছোট পথ। পথের বাঁ পার্শ্বে প্রশস্ত মাঠে শিশুদের বিনোদনের জন্য দোলনা, স্লিপার, ঢেকি ছাড়াও খেলাধুলার নানান সামগ্রী। এর লাগোওয়া স্কুলের ক্যাম্পাস। গাছের ছায়ার নিচে ইটের দেয়ালের উপর টিনের  ছাউনি দিয়ে ঘেরা ৫টি বড় ভবন। পুর্ব দিকে ভবনের স্কুলের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের বসার কক্ষ ছাড়াও প্রশিক্ষণ কক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব। দক্ষিণে বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার এবং স্কুল মিলনায়তন।

এরপাশেই ছেলে ও মেয়েদের পৃথক খাবারের ঘর। পশ্চিমের ভবনে ৮টি এবং উত্তর দিকের ভবনে ৫টি শ্রেণী কক্ষ ছাড়াও শিশুদের জন্য একটি বিনোদন কক্ষ। স্কুল ক্যাম্পাসের দক্ষিণ দিকে খেলার মাঠ। মাঠের পশ্চিমে লিচুর বাগান। এর পশ্চিমে আরও দুটি খেলার মাঠ। মাঠের পুর্ব দিকে ছয় তলা বিশিষ্ট ছেলেদের  আবাসিক হোষ্টেল। দক্ষিণ প্রান্তে শিক্ষকদের আবাস।

আমেনা-বাকী স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ মিজানুর রহমান পুরো স্কূল ক্যাম্পাস ঘুরে দেখান এবং তিনি বলেন অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আমজাদ হোসেনের কেনা ১ একর জমির উপরে ২০০১সালের ৫ জুলাই স্কুলটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে চালু হয় নার্সারী থেকে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত পরের বছর ৬ষ্ঠ এবং ২০০৪ সালে ৮ম শ্রেণী চালু হয়। ২০০৯ সালে চালু হয় এসএসসি। টানা ৩ বছর তৃতীয় শ্রেষ্ট স্কুল হওয়ার পর গত বছর স্কুলটি দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের শ্রেষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ার গৌরব অর্জণ করে। এরই সাফল্যের ধারবাহিকতায় এ বছর স্কুলটি বোর্ডের ৪র্থ স্থান হওয়ার গৌরব অর্জণ করে। এবছর ৭০জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে তার মধ্যে ৬৬ জনেই গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।  বর্তমানে স্কুলের জমির পরিমাণ ৮ একর। দুই পালায় প্লে থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৬শত ৫৪ জন। ১৮ জন নারীসহ শিক্ষক সংখ্যা ৫৬ জন। সম্প্রতি একাদশ শ্রেণী খোলার অনুমতি পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

নিয়মের মধ্যে ১৬৪ জন মেয়ে ও ২৯৫ জন ছেলে আবাসিক হোষ্টেলে থেকে পড়াশুনা করে। মেয়েদের জন্য ৪জন নারী শিক্ষক ছাড়াও ১জন আয়া সার্বক্ষনিক দায়িত্বপালন   করেন। ছেলেদের দেখভাল করেন ২২ জন শিক্ষক। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য লেখপড়ার পাশাপাশী খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চা বাধ্যতামুলক। ধর্ম পালনের জন্য হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পৃথক নামায ও উপাসনার স্থান।

স্কুলের পড়ালেখা-থাকা খাওয়া, খেলাধুলা- সবকিছুই নিয়মের মধ্যে। এই নিয়ম ভঙ্গ করার কোন সুযোগ নেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আয়া, কুপ, দারোয়ান-কারোরই নিয়মের বাইরে যাওয়ার উপায় নেই বলল এবারের কৃতি ছাত্রী সোনিয়া সুরভী।

ভোর পৌনে ৫টায় আবাসিক শিক্ষার্থীদের ঘুম থেকে উঠা বাধ্যতামুলক। এরপর নামাজ, প্রার্থনা ও শারিরীক ব্যায়াম শেষে সকালের নাস্তা। নাস্তায় থাকে পায়েস, নুডুলস, চিড়ার বিরিয়ানী, চা-টোষ্ট, সেমাই মুড়ি, পাউরুটি- দুধসহ নানা খাবার। নাস্তা শেষে শ্রেণী কক্ষে গিয়ে লেখাপড়া। সকাল ৮টায় ফিরতে হয় হোষ্টেলে বই রেখে পুনরায় ডাইনিংএ ভাত খাওয়া। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত স্কুলের কোচিং ক্লাস। ক্লাশ শেষে হোস্টেলে ফিরে আবার  পৌনে ১১টায় এসেম্বলিতে যোগ দেয়া। বেলা ১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ক্লাশ। ২টার মধ্যে খেয়ে নিতে হয় দুপুরের খাবার। বিকেল ৪টায় স্কুল ছুটির পর শিক্ষার্থীরা কেউ মাঠে খেলে, কেউ কম্পিউটার ল্যাবে, কেউবা নাচ-গান, আবৃত্তিতে অংশ নেয়।

এবারে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতি শিক্ষার্থী রুপ্তা রাণী সরকার, মরিয়ম খাতুন, মাহাবুবা নাসরিন, মেহেদী কাজী ও তন্ময় খাদাঞ্চি জানালো ৫ম, ৮ম ও ১০ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বিকেলে মাঠে যায়না। বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কোচিং ক্লাশে যায় । ক্লাশ শেষে আবাসিক শিক্ষার্থীরা হোস্টেলে এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা বাসায় চলে যায়। রাত সাড়ে ১০টায় মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ঘুমাতে যাওয়া বাধ্যতামুলক।
কৃতি শিক্ষার্থীরা জানালেন সাফল্যের নৈপথ্যে আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের কঠোর অনুশাসন শিক্ষা প্রতিষ্টানটিকে এ পর্যায়ে এনে দিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য