এবার মালয়েশিয়ানরা খাবে পঞ্চগড়ের আলু

রংপুর বিভাগ

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় থেকেঃ এবার বন্ধু দেশ মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে পঞ্চগড়ে উৎপাদিত আলু। শুধু মালয়েশিয়ায় নয়; পার্শ্ববর্তি দেশ নেপাল, ভূটানসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পঞ্চগড়ে উৎপাদিত আলু রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর এতে আলোর মুখ দেখছে কৃষকরা। ব্যস্ততা বেড়েছে বিএডিসির চুক্তিবদ্ধ আলু চাষী ও শ্রমিকদের মধ্যেও। রপ্তানির জন্য আলু প্রক্রিয়াজাত করার নানা ধাপে নতুন করে বেশ কিছু শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।

জমি থেকে আলু সংগ্রহের পর আলু বাছাই, গ্রেডিং, ওজন, প্যাকিং, ট্রাকে লোডসহ নানা কাজে ব্যস্ত জেলার আলু শ্রমিকেরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় পঞ্চগড়ে এবার আলুর বাম্পার ফলনে জেলার বাজারে আলুর দাম কিছুটা পড়ে যায়। কিন্তু বিদেশে রপ্তানি শুরু হওয়ার পর আবার বাজার ঘুরে দাড়িয়েছে। এতে হতাশ আলু চাষীরা আশার আলো খুঁজে পেয়েছেন।

জেলা বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে ২৮ মেট্রিক টন ডায়মন্ড জাতের আলু রপ্তানির মধ্যে দিয়ে পঞ্চগড় জেলার আলু রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কেএস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং মালয়েশিয়ার আমদানীকারক প্রতিষ্ঠান সিনহুয়া ট্রেডিং কর্পোরেশনের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পঞ্চগড় জেলার উৎপাদিত আলু রপ্তানি করা হচ্ছে। সাড়ে ৮ কেজির প্রতি প্যাকেট আলু পঞ্চগড় থেকে কন্টেইনারে করে প্রথমে যাবে চট্টগ্রাম বন্দরে। পরে তা কার্গো জাহাজে করে পৌছাবে মালয়েশিয়ায়। এ বছর পঞ্চগড় থেকে ডায়মন্ড জাতের হালকা হলুদ রঙের আলু মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করা হচ্ছে। প্রতি আলুর সাইজ ৯০ থেকে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত।

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ৯ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে কার্ডিনাল, ডায়মন্ড, গ্রানুলা, টিপিএস, কারেছ, এস্টারিসসহ ২০টির বেশি জাতের আলুর চাষ হয়েছে। এবার জেলায় মোট আলু উৎপাদিত হয়েছে ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে জেলায় বিএডিসির চুক্তিবদ্ধ চাষীরা প্রর্দশনী প্লট সহ ৩০০ একর জমিতে আলুর চাষ করেছে। এর মধ্যে ২০ একর জমিতে রপ্তানি যোগ্য ডায়মন্ড জাতের আলুর চাষ হয়েছে। এছাড়া আরো ৩০ হেক্টর জমিতে রপ্তানি যোগ্য অন্যান্য জাতের আলুর চাষ হয়েছে।

জেলার সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের তহশীলদার পাড়ার বিএডিসির চুক্তিবদ্ধ আলু চাষী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন জানান, এবার ১১ একর জমিতে ডায়মন্ড জাতের আলুর চাষ করেছি। আমার উৎপাদিত আলুর মধ্যে সাড়ে ১৮ মেট্রিক টন আলু মালেশিয়ায় যাচ্ছে। এটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। প্রতি কেজি আলু ১৪ টাকা দরে নিচ্ছে তারা। টাকাও মিলছে নগদ।

তবে যদি আলুর দামটা যদি ১৮ থেকে ২০ টাকা হতো তাহলে আমরা আরো লাভবান হতে পারতাম। কারণ রপ্তানির জন্য বাছাই করা নির্ধারিত সাইজের আলু দিতে হচ্ছে। বাছাইয়ের পর বাকি আলু কম দামে বিক্রি করতে হবে। এছাড়া আলুর উৎপাদন খরচ আগের চাইতে অনেকাংশে বেড়ে গেছে। সরকার এ বিষয়ে একটু নজর দিলে আমাদের জন্য আরো ভালো হতো। আমরা আলু চাষে আরো আগ্রহী হতাম।

জেলার বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের কেরামত পাড়া এলাকার বিএডিসির চুক্তিবদ্ধ আলু চাষী বায়েজীদ বোস্তামী জানান, চলতি মৌসুমে ২৩ একর জমিতে ডায়মন্ড সহ কয়েকটি জাতের আলুর চাষ করেছি। আমার উৎপাদিত মোট আলুর মধ্যে ৩ মেট্রিক টন আলু দিয়েছি। বাকী আলু বিএডিসি কর্র্তৃপক্ষ তাদের ভিত্তিবীজ, মান ঘোষিত বীজ হিসেবে নিবে। অবশিষ্ট কিছু আলু সংরক্ষণ করব এবং বাকীগুলো বাজারে বিক্রি করবো।

আমদানীকারক প্রতিষ্ঠান ন্যানো এগ্রোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো ইকবাল হোসেন জানান, মালেশিয়া, নেপাল, ভূটান ও শ্রীলংকাসহ বিশে^র বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের আলুর বাজার রয়েছে। আমরা কেএস ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যেমে মালয়েশিয়াতে আলু রপ্তানী করছি। ইতোমধ্যে পঞ্চগড় থেকে ২৮ মেট্রিক টন আলু আমরা কিনেছি। নতুন অর্ডার পেলে সেখান থেকে আরো আলু কেনা হবে।

তিনি আরো জানান, চলতি মৌসুমে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০০ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছে। আরো বেশ কিছু আলু অন্য কোম্পানির মাধ্যমে যাচ্ছে।

পঞ্চগড় জেলা বিএডিসি হিমাগারের উপ-পরিচালক (টিসি) আব্দুল হাই সজিব জানান, মানসম্পন্ন বীজ আলু উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণ জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) পঞ্চগড় জোনের আওতায় চুক্তিবদ্ধ আলু চাষীদের মাধ্যেমে উৎপাদিত আলু মালয়েশিয়ায় রপ্তানী হচ্ছে। এবার জেলায় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে এখানকার আলু। পঞ্চগড়ের মাটি বেলে দোআঁশ হওয়ায় আলু চাষে খুবই উপযোগী।

এছাড়া আলু শীত প্রধান ফসল হওয়ায় এ অঞ্চলে বেশি শীতের কারণে আলুর বাম্পার ফলন হয়। এবার চাহিদায় তুলনায় বেশি আলু উৎপাদিত হওয়ায় চাষিরা নায্যমূল্যে থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় এখানকার আলু বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। গুনে মানে রংয়ে পঞ্চগড়ের আলু উন্নত হওয়ায় রপ্তানীকারক ও আমদানীকারকরা

এ জেলার আলু রপ্তানীতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা পঞ্চগড়ের উৎপাদিত আলুর আগাম চাহিদা দিয়ে রেখেছেন। এ বছর পঞ্চগড় বিএডিসি হিমাগারের ৫০০ মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আরু রপ্তানী শুরু হয়েছে। আগামীতে রপ্তানীকারকদের চাহিদার প্রেক্ষিতে এ লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য